kalerkantho

স্বপ্ন পুড়ে ছাই

২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আরো অনেকের সঙ্গে নিহত হয়েছেন কাওসার আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার জন্য একটি ফার্মেসি চালাতেন দুই সন্তানের জনক, কঠোর পরিশ্রমী এই তরুণ। অকালপ্রয়াণে তাঁর পরিবারের পাশে সহপাঠীদের দাঁড়ানোর কথা জানাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বপ্ন

পুড়ে ছাই

নিভে গেছে আগুন, রয়ে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন। ছবি : শেখ হাসান

“মারা যাওয়ার সপ্তাহখানেক আগ থেকেই পরিচিত ও কাছের মানুষদের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিচ্ছিল সে। কোনো কারণ ছাড়াই বলত, ‘আমাকে মাফ করে দিয়েন’। কিন্তু এটা যে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার জন্য বিদায় নেওয়া হচ্ছে, সেটা তো বুঝিনি।”—বলছিলেন ইমাম সালমান। কাওসারের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিনি। ইমাম আরো বলছিলেন, ‘২০১৬ সালের এপ্রিলে আমরা প্রথম ক্লাসে পাশাপাশি সিটে বসেছিলাম, আর শেষবার বসা হলো ২০ ফেব্রুয়ারি। এদিন একসঙ্গে পরীক্ষা দিলাম। তারপর একসঙ্গে ক্যাম্পাসেই আরো কিছুক্ষণ কাটাব ভেবেছিলাম। কিন্তু ওর কী একটা কাজ থাকায় আগেভাগেই ভাড়ায় চালিত মোটরবাইকে চলে গেল। এমনিতে ডিপার্টমেন্ট থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে সে রিকশা নিত, আমি হলে চলে যেতাম—এটাই আমাদের সব সময়ের রুটিন। আমরা সব সময়ই যোগাযোগের মধ্যে থাকতাম। মেসেঞ্জারে কথা হতো, ফোন করতাম। সব কিছু শেয়ার করতাম। গত মার্চে ওর সন্তানরা পৃথিবীর আলো দেখেছে। বিয়ে-বাচ্চা—এসব নিয়ে খুব কম মানুষের সঙ্গেই আলাপ করত। লজ্জা পেত। অনার্স শেষ করার আগেই বাচ্চার বাবা হয়ে গেছে—কোন সহপাঠী কিভাবে নেয়, এ নিয়ে একটু অস্বস্তিও ছিল ওর। আমি সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। আগুন তো সাড়ে ১০টায় লেগেছিল, আমাদের শেষ কথা হয় ১০টা ০৯ মিনিটে। এরপর ফেসবুক মেসেঞ্জারে আমি ওকে মেসেজ দিলাম। কোনো রিপ্লাই পেলাম না। ও আর কখনোই রিপ্লাই দেবে না, তাই না?’

জুয়েলের কোলে কাওসারের সন্তান

আরেক বন্ধু ইয়াসিন আরাফাতকে প্রায়ই চকবাজারে নিয়ে যেতেন কাওসার। ইয়াসিন ওকে পড়া বুঝিয়ে দিতেন। কাওসারের ফার্মেসি ‘মদিনা মেডিক্যাল হলে’ই পড়তেন দুজন। রাত ১২টা-সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পড়তেন। মাঝখানে বিরতি নিয়ে পাশের একটা হোটেলে খেতেন। আগুন লাগার পর যে হোটেলটির সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে, সেটার কথাই বলছি। ইয়াসিন জানালেন, ‘২০ তারিখ পরীক্ষা দিয়ে আমি, কাওসার আর ইমাম মিলে চারুকলায় গিয়েছিলাম। ছবি তুলেছিলাম। কে জানত, এটা আমাদের শেষ ছবি হবে!’

আগুন লাগার রাতেও কাওসারের ওখানে পড়তে যাওয়ার কথা ছিল ইয়াসিনের। টিউশনি শেষ করে ফিরতে দেরি হওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। কিন্তু এই না যাওয়া নিয়ে কেমন পুড়ছিলেন ইয়াসিন? বললেন, “রাতে ঘুমাতে গিয়ে কেমন যেন লাগছিল আমার। বোধ হয় স্বপ্নেও দেখেছিলাম, কাওসার অভিমান করে আমাকে বলছে, ‘আর আমাকে পড়াতে হবে না তোমার, আমি অন্য কারো কাছ থেকে পড়া বুঝে নেব!’ একটা অস্বস্তি নিয়ে সকালে জেগেই শুনলাম, কাওসার আর নেই।”

কোনো এক ভ্রমণে, নৌপথে কাওসার আহমেদ

সহপাঠী নিশাত জানালেন, “কাওসার অঙ্ক ভয় পেত। ২৪ তারিখ অ্যাকাউন্টিং পরীক্ষা ছিল। আমার কাছে টেনশনের কথা জানাচ্ছিল। আমি মজা করে বলেছিলাম, ‘আরে, তুমি হাফেজ মানুষ, ফুঁ দিলেই অঙ্ক পেরে যাবে’।”

২৪ তারিখ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২২তম ব্যাচের আয়োজনে মিলাদ মাহফিল হয়েছিল কাওসারের জন্য। বিশাল হলরুমে শ পাঁচেক শিক্ষার্থী নীরবে বসে কথা শুনছিলেন। সেখানে বন্ধু জিহাদ বললেন, ‘কাওসারের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর আমি নিজেকে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে আবিষ্কার করেছিলাম। কেমন করে ওই পর্যন্ত গিয়েছি, জানি না। মর্গে ঢুকতে পারিনি। তবে পোড়া লাশের গন্ধ আর বীভত্স পরিবেশেও টানা ৩০ মিনিট মর্গে থেকে কাওসারের লাশ শনাক্ত করে যথার্থ শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন আমাদের সুমন দাস স্যার ও এথিকা ম্যাডাম। আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বিভাগের চেয়ারপারসন আক্কাস আলী বলেন, ‘কাওসার আমাদের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিল। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। আর এটুকু নিশ্চয়তা দিচ্ছি, কাওসারের দুই সন্তানের সবটুকু ভার আমরা গ্রহণ করব। বাবার ছায়া তো ফেরত দিতে পারব না, তবে বাবার না থাকা যেন ওদের কোনো আর্থিক সংকটে না ফেলে—সেই ব্যবস্থা করব।’

কাওসারের বিভাগ থেকে ওর ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাঁর দুই সন্তান ও স্ত্রীর জন্য টাকা তুলছেন। এর দায়িত্বে থাকা তাহমিদ বললেন, “আমরা নিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও এলামনাই ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি সব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাওসারের পরিবারকে একটা ভালো অঙ্কের সহায়তা করার চেষ্টা করব। যেন ভবিষ্যত্ জীবনে অন্তত টাকার কষ্ট থেকে তাঁরা কিছুটা মুক্তি পায়। টাকা জমলে আমরা কাওসারের স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র বা ফিক্সড ডিপোজিট করব, নয়তো পোস্ট অফিসে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে রেখে দেব। নমিনি হবে তাঁর দুই সন্তান। আমরা ছাড়াও, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ এবং টিএসসির বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কাওসারের পরিবারের জন্য টাকা তুলছে।”

জীবনের শেষ দিন ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে

দুই.

“প্রথমে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ গ্রুপ থেকেই জেনেছিলাম, আমাদের ক্যাম্পাসের ছোট ভাই কাওসার চকবাজারের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তাঁর দুটি সন্তান আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের অন্য ছোট ভাই-বোনরা তাঁর সন্তানদের জন্য টাকা তুলছেন। আমার কেমন অস্থির লাগল! নিজের সন্তানের দিকে তাকাচ্ছিলাম বারবার। আর শিউরে উঠছিলাম। ওদের জন্য কিছু করার একটা তাড়না আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছিল না। তাই রাত ৪টায়ই আমি কাওসারের পরিবারের ফোন নম্বর জোগাড় করি। তারপর সকালে উঠেই কাওসারের স্ত্রীকে ফোন করে বলি, ‘আমি আপনার দুই সন্তানের দায়িত্ব নিতে চাই।’ ওঁর স্ত্রী বলছিলেন, ‘দুই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত কাওসার। সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’ এরপর আমি কাওসারের কুমিল্লার বাড়িতে গিয়ে ওঁর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করি। তাঁদের কথা দিই, আজ থেকে শিশু দুটির সব দায়িত্ব আমার। ওদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সব খরচ আমি দেব।”—কাওসার আহমেদের যমজ দুই সন্তান আব্দুল্লাহ ও মেহজাবিনের দায়িত্ব নেওয়ার পর কথাগুলো বলছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান জুয়েল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তিনি।

 

মন্তব্য