kalerkantho


ব্লু বেল্ট আকুল

মার্শাল আর্টের প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে তাঁর। এক ধরনের আকুলতা অনুভব করে নিজেকে জড়িয়েছেন কারাতে ও জুডো খেলায়। তিনি মুহাম্মদ আকুল শেখ। তাঁর কথা লিখেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। ছবি তুলেছেন রাফিজ ইমতিয়াজ

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ব্লু বেল্ট আকুল

জাতীয় কারাতে প্রতিযোগিতার খেলা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে লড়ছেন মুহাম্মদ আকুল শেখ। কিক-ব্যাক করতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। উরুতে টান পড়ল তাঁর। ঠিকমতো হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে ওঠল। থেরাপি হিসেবে টানা কয়েক দিন বরফ দিতে হলো। কিন্তু তিনি তো হলে থাকেন। বরফ জোগাড় বেশ ঝামেলা। একটা বুদ্ধি করলেন। প্রতিদিন হলের দোকানিকে ডিপ ফ্রিজে এক প্যাকেট দুধ রেখে দিতে বলতেন। সেই দুধ বরফ হয়ে ওঠলে, তা দিয়েই চালাতেন থেরাপির কাজ!

আকুলের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলায়। ছোটবেলায় খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখে, মার্শাল আর্ট শেখার আগ্রহ জন্মাল। কিন্তু গ্রামে শেখা সম্ভব হয়নি বলে আগ্রহটাকে দমিয়ে রাখলেন। স্কুল ও কলেজের পাঠ শেষ করে ভর্তি হলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। একদিন চোখে পড়ল, সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামের সামনে অনেকেই কারাতে করছে। পুরানো ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তখন। ভর্তি হলেন সেখানে। কিন্তু প্র্যাকটিসে বাধা হয়ে দাঁড়াল পড়াশোনার চাপ ও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি।

দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হলেন। বিজয় একাত্তর হলে উঠে এক বন্ধুকে দেখলেন মার্শাল আর্ট করতে। জানলেন, কেন্দ্রীয় মাঠে কারাতে ও জুডো শেখানো হয়। এবারও দেরি করেননি। ভর্তি হয়ে টানা দুই বছর প্র্যাকটিস করলেন। তারপর বিভাগীয় পড়াশোনায় বাড়তি মনোযোগ দিতে নিলেন এক বছরের বিরতি। অবশ্য এ সময়টায় শিখে নিয়েছেন ওয়েব ডিজাইন ও বেসিক ফটোগ্রাফি। তারপর আবার ফিরেছেন নিজের স্বপ্নের ময়দানে। শুরু করেছেন প্র্যাকটিস। পাঁচটি বেল্ট পরীক্ষা দিয়ে এখন ব্লু বেল্টে আছেন। আর দুটি বেল্ট পরীক্ষা দিলেই পাবেন অনেক আকাঙ্ক্ষার ব্ল্যাক বেল্ট।

মার্শাল আর্ট শিখেই ক্ষ্যান্ত নন আকুল। খেলছেনও। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ত হল প্রতিযোগিতায় জুডোতে জিতেছেন স্বর্ণপদক। এ বছরের প্রতিযোগিতায় জিতেছেন রৌপ্য। এই দুই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলেছেন ন্যাশনাল গেমসে। অন্যদিকে ছবি নিয়ে আগ্রহীদের একটা ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়েছেন। সেখান থেকে শুরু করেছেন ইভেন্ট ফটোগ্রাফি। সংগঠন করতেও তাঁর ভালো লাগে। নিজের এলাকাভিত্তিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের সভাপতি তিনি। এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উত্সাহ জোগান। বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগতদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুডো কারাতে ক্লাবের তিনি সাধারণ সম্পাদক। ব্যাচের ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলেন টানা তিন বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের পরীক্ষা শেষ করে এখন আছেন রেজাল্টের অপেক্ষায়। তবে শেষ সেমিস্টারের আগ পর্যন্ত রেজাল্ট ছিল ৩.৭১। এত কিছু করে রেজাল্ট ভালো রাখার কারণ নিয়মানুবর্তিতা। বলছিলেন, ‘সকাল ৬টায় উঠে প্র্যাকটিসে যেতাম। ফিরতাম ৮টায়। এসে পড়তে বসতাম। তখনো রুমমেটরা ঘুমুচ্ছে। ফলে আমার দিন হতো বেশ বড়। আর রাতে যেহেতু আগেভাগেই ঘুমোই, তাই কাজ করার সুযোগ পাই বেশি।’

উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন আকুল। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার তিনি বিশেষ অনুরাগী। উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই রবি ঠাকুরের সব উপন্যাস পড়ে ফেলেছেন। সিনেমাও দেখেন প্রচুর। বিশেষ করে তামিল সিনেমার তিনি একনিষ্ঠ ভক্ত। অন্য সব সিনেমাও দেখেন।

ভ্রমণ তাঁর প্যাশন। দেশের ৪০টা জেলা এ পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর ঘোরাটা একটু ভিন্নতর। কোনো বন্ধুর সঙ্গে তাঁর এলাকায় গিয়ে, বেশ কয়েক দিন থেকে, পুরো জেলা ঘুরে দেখেন।

ভবিষ্যতে জুডো নিয়ে জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার ইচ্ছা আছে তাঁর। তা ছাড়া সরকারি চাকরির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।

 



মন্তব্য