kalerkantho

পথের প্রহরী

রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্যরা। তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন নাঈম সিনহা

১০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে




পথের প্রহরী

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় শহীদ বীরবিক্রম রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মীম ও রাজীব। তখনই সড়কের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। নানা পক্ষ নানাভাবে রাস্তার শৃঙ্খলায় নামলে জট আরো বাড়ে। সেই গিঁট খুলতে ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় এক দল নীল-আকাশি পোশাকের কিশোর-কিশোরী। তারা সবাই বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য। ট্রাফিক সপ্তাহের সময় এবং এরপর বেশ কিছুদিন কাজ করে তারা। সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত রাস্তায় দেখা গিয়েছে এই স্কাউট সদস্যদের। স্কাউট সদস্যদের জোন লিডার প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তাঁর জোনের সদস্যদের ফোন দিয়ে নিশ্চিত হন, পরের দিন কে কে কাজে থাকতে পারবে। সবাই আগ্রহী হলে এক দিন এক দলকে সুযোগ দিলে পরের দিন আরেক দলকে সুযোগ দেওয়া হয়। মানুষকে নিয়মের মধ্যে আনা যে কতটা কঠিন তা তাদের দেখেই বোঝা গিয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে তারা রাস্তায় ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে। একে রেখে তাকে ধরছে। বুঝিয়ে বলছে এখানে পারাপার নিষেধ, জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করুন। কেউ হয়তো লুকোচুরি খেলতে গিয়ে স্কাউটদের হাতে ধরা পড়েছেন। বাধ্য হয়ে ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। কাউকে হয়তো উল্টো পথে আসার জন্য খুদে সদস্যরা ফেরত পাঠাচ্ছে। আর রোদে পুড়ে বেশ হাসিমুখেই কাজ করেছে স্কাউট সদস্যরা।

এমনই একজন শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি কলেজের সাদিয়া ফাইরুজ সুহা। অন্য স্কাউটদের মতোই সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ট্রাফিক শৃঙ্খলায় কাজ করেছে। তার দায়িত্ব ছিল ঢাকার সচিবালয়ের শিক্ষা ভবনসংলগ্ন হাইকোর্ট মোড়ে। যখন জানতে পারল ট্রাফিক পুলিশ সপ্তাহে স্কাউট সদস্যরা রাস্তায় থাকবে শৃঙ্খলা রক্ষায়, তখন আর বিলম্ব না করেই নেমে পড়ল। ভাবল মীম-রাজীবদের জন্য এটুকু করি।

তবে রাস্তায় নামার আগে তারা নিয়েছিল ব্রিফ। পুলিশের পক্ষ থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল ন্যূনতম শৃঙ্খলা আনতে কী কী করা হবে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলেছে সেশন। এরপরই রাস্তার পরীক্ষা। প্রথমে টানা সাত দিন এবং পরে আর ১০ দিন মিলিয়ে মোট ১৭ দিন রাস্তায় কাজ করেছে সুহা। এই অভিজ্ঞতা থেকে বলল, ‘আগে হয়তো ট্রাফিক আইনগুলো ভালো করে জানতাম না। ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতাম না। যত্রতত্র রাস্তা পার হয়ে যেতাম। এই সুযোগে নিয়মগুলো ঝাড়া মুখস্থ হয়ে গেল। এখন নিজে কোনো নিয়ম ভাঙার আগে তো দশবার ভাবব।’

রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে সুহার ট্রাফিক পুলিশদের সম্পর্কে ধারণা পাল্টে গেছে। বলল, ‘আগে আমার ট্রাফিক পুলিশদের একেবারেই পছন্দ ছিল না। তবে এখন আমি জানি, তাঁরা কতটা কষ্ট করে সারা দিন রাস্তায় পড়ে থাকেন। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিকমতো বাতলে দেন কোন দিকে যেতে হবে। আমি মাত্র ১৭ দিন কাজ করে অধৈর্য হয়ে গেছি, আর তাঁরা বছরের পর বছর এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এখন তাঁদের প্রতি অন্য রকম সম্মান অনুভব করি।’

রাস্তায় শৃঙ্খলা ভঙ্গ নিয়ে সুহার একটু অন্য রকম অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ‘যাঁরা শিক্ষিত, তাঁরাই বেশি আইন অমান্য করেন। রাস্তায় সাধারণ দিনমজুর বা নিম্নবিত্ত মানুষদের আমরা আইন মেনে জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে বললে তারা তা কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই মেনে নিত। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অনেকেই সেটি মানতে চাইতেন না। আমরা তাঁদের নানাভাবে বুঝিয়ে বলতাম। সেটিই বেশি খারাপ লেগেছে। এক দিন তো উল্টো পথে যাওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভাইয়ার বাইক থামানো হলে তিনি রীতিমতো চড়াও হন। পরে অবশ্য সবাই মিলে কথা বলার পর বিষয়টির সুরাহা হয়।’

সুহার আরেক সহযোগী ছিল নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সারা হোসাইন। সে বলল, ‘রাস্তায় সিগন্যাল বাতির ব্যবহার থাকলে শৃঙ্খলা আনা আরো সহজ হতো। আমার কাজ ছিল প্রতি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে জেব্রাক্রসিংয়ের আগেই দাঁড় করানো। তবে কখনো দেখা যেত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাই ভুল সিগন্যাল দিচ্ছেন। তাতে গাড়ি জেব্রাক্রসিংয়ের ওপর চলে আসছে। পথচারীদের রাস্তা পার হতে সমস্যা হচ্ছে। প্রথম দিকে ট্রাফিক পুলিশদেরও আমরা এই সমস্যাটার কথা বলেছি। কখনো কখনো যাত্রী বা চালকরা আমাদের ওপর রেগেও গেছেন। অনেকেই রাগ হয়ে বলছেন, দেখে নেব তোমরা কিভাবে দেশ ঠিক করো। আমরা ঠাণ্ডা মাথায় তাঁদের বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলেছি।

এস এম শামীম নামের এক স্কাউট সদস্যের দায়িত্ব ছিল হাইকোর্ট মাজার মোড়ে। সে একটি ভালো ও একটি মন্দ অভিজ্ঞতা শেয়ার করল। ‘আমরা একই জায়গায় একটানা প্রায় এক মাস ছিলাম। এক দিন নাম্বার প্লেট ছাড়া একটি গাড়ি আটকাই। গাড়িতে একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের লোগো লাগানো ছিল। ভেতরে থাকা ভদ্রমহিলা জানালেন গাড়িটি নতুন কিনেছেন। তাই কাগজ হয়নি, তিনি গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে আমরা গাড়িটি ছেড়ে দিই। এর পরে আরো দুদিন গাড়িটি আটকানো হলেও তারা নানা অজুহাত দেন। এরপর ভদ্রমহিলা এক দিন নিজেই পুলিশ বক্সে আসেন এবং বলেন তাঁর স্বামী সাংবাদিকতা করেন আর তিনি কলেজে পড়ান। তাঁর গাড়ি যেন না আটকানো হয়। তিনি গাড়িটি বিক্রি করে ফেলবেন, তাই রেজিস্ট্রেশন করছেন না।

আর ভালো লাগার গল্পটা হলো, ওই মোড়ে কাজ করতে করতে ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্টদের সঙ্গে আমাদের বেশ ভালো বোঝাপড়া হয়। সেখানে ট্রাফিক ইনস্ট্রাক্টর (টিআই) ছিলেন খালেক স্যার। এক দিন তিনি পুলিশ বক্সে এসে আমাকে বললেন, আমার তো রিটায়ারের দুই-তিন মাস বাকি, কিন্তু আমি তোমাদের মতো মানুষের সেবা করতে চাই। আমার জন্য কি কোনো সুযোগ আছে স্কাউটে। তোমাদের কাজ আমার সত্যিই ভালো লেগেছে। পরে জানালাম, হ্যাঁ আপনি গ্রুপ লিডার হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তাতে খালেক স্যারের মুখে একটা বিশাল হাসি খেলে গেল।’

হাইকোট মোড়ে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মো. রোকনুজ্জামান কিন্তু স্কাউটদের কাজে ভারি খুশি। বললেন, ‘স্কাউট সদস্যরা থাকায় আমরা বাড়তি সহযোগিতা পাই। আমাদের লোকবলের সমস্যা প্রকট। একটি সিগন্যালে সাধারণত চারজন কাজ করি, সেখানে অন্তত ছয়জন হলে ভালো হয়। দেখা যায়, চারজনের একজনকে যদি টয়লেটেও যেতে হয়, তখন ওই সিগন্যাল ফাঁকা থাকে। তিনজন মিলেই সামাল দিতে হয়। স্কাউটের বন্ধুরা থাকায় ওই কয়দিন রাস্তায় বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তারা লেইন ঠিক করত। গাড়িগুলোকে ঠিক জায়গায় থামাত। জেব্রাক্রসিং ব্যবহারে সবাইকে অনুপ্রাণিত করত। কেউ নিয়ম ভাঙলে তাদের সতর্ক করত। আমাদের পক্ষে এতগুলো দিকে খেয়াল রাখা সম্ভব ছিল না। বলা যায়, ওই কয়টা দিন বেশ স্বস্তিতেই ছিলাম।

পথচারীরাও কিন্তু স্কাউটদের এই দায়িত্ব পালনে খুশিই। শঙ্কর দাস পুরান ঢাকার মিটফোর্ডের কেমিক্যাল ব্যবসায়ী। প্রায়ই হাইকোর্ট মোড় হয়ে তিনি শাহবাগে কাজে আসেন। তিনি বললেন, ‘স্কাউটের সদস্যরা থাকায় তারা রিকশাগুলোকে  লেইন মেনে চলতে বাধ্য করেছে। এতে যানজট অনেকটা কমে গেছে। শৃঙ্খলা এসেছে রাস্তায়। রাস্তা পারপারের সময় সবাই জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করছে। একেবারেই ভিন্ন এক চিত্র।’

ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের আমান উল্লাহ নিক্সন কাজ করেছে পল্টন মোড়ের শৃঙ্খলায়। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই রাস্তার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগী হয় বলে জানালো। সে বলে, ‘সারা দিনের কাজের সম্মানী বাবদ আমাদের লাঞ্চ, কিছু শুকনা খাবার আর ২০০ টাকা সম্মানী দেওয়া হতো। কাজটা মন থেকে না করলে কিংবা ভালো না লাগলে এটা সম্ভব ছিল না। আমরা সামান্য সম্মানীর জন্য আসিনি। স্কাউট সব সময় সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করে। সেই জায়গা থেকে এসেছি। প্রতিদিন কেরানীগঞ্জ থেকে আসতাম। মূলত দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করেছি।’

ট্রাফিক পুলিশদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলল, ‘আমার নিজের কোনো ছাতা ছিল না। ট্রাফিক ভাইয়েরা তাঁদের ছাতা দিয়ে সাহায্য করতেন। ছায়ায় বিশ্রাম নিতে গেলে তাঁরা আমাদের জন্য চেয়ার ছেড়ে দিতেন। এটা আমাদের জন্য বেশ সম্মানের।’

যাত্রী-চালক-পথচারীদের নানা রকম কৌতূহল নিয়ে সে বলে, ‘ট্রাফিক সিগন্যালের চেয়ে মানুষের আমাদের প্রতি বেশি কৌতূহল ছিল। তারা আমাদের পছন্দও করত, গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তবে কেউ কেউ প্রশ্ন করে ঘাবড়ে দিতেন। বলতেন, আমাদের লাভ কী? জবাবে বুঝিয়ে বলতাম, মানুষের জন্য কাজ করার লাভ অঙ্কে গোনা যায় না। সব কিছু লাভের জন্য নয়। আরো বলতেন এই কাজে আমরা কেন, এটা তো পুলিশের কাজ। জবাবে বলেছি, আমরা পুলিশকে সহযোগিতা করছি।’

এদিকে স্কাউট সদস্য শাকিল আহমেদ জিয়া মনে করে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে ট্রাফিক পুলিশের জনবল বাড়াতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি আইন প্রয়োগ করতে হবে। মানুষের মধ্যে আইন মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। হঠাৎ করে বা মাঝে মাঝে আইন প্রয়োগ করলে হবে না। ট্রাফিক পুলিশদের জনগণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট থাকতে হবে, সিগন্যাল পয়েন্টের পুলিশ বক্সলোতে ট্রাফিক পুলিশদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। লেইন ও সিগন্যাল বাতির ব্যবহার ঠিক করতে হবে। জনগণকে জেব্রাক্রসিং, ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

 

মন্তব্য