kalerkantho


চৌকস

বিশ্বনাগরিক হতে চাই

বিতর্ক করছে ছোটবেলা থেকেই। আবৃত্তি ও উপস্থিত বক্তৃতায় তার জুড়ি মেলা ভার। বিতর্ক, বিজ্ঞান প্রজেক্ট, মুন, আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার রয়েছে সমান তালে। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাহিন ইমতিয়াজ ভূঞার গল্পটা জানাচ্ছেন অনয় আহম্মেদ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বনাগরিক হতে চাই

সময়টা ২০১৩ সাল। বিএনসিসিতে উপস্থিত বক্তৃতার প্রতিযোগিতা চলছিল। বিষয় ‘যুবসমাজের অবক্ষয়ের জন্য মাদকই দায়ী।’ সেখানে প্রতিযোগী হিসেবে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জাহিনও ছিল। বিএনসিসির বিভিন্ন কলেজের ক্যাডেটরা একে একে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। তখন বিএনসিসি ঢাকা ফ্লোটিলার তত্কালীন কমান্ডিং অফিসার বলেন, ‘তুমি তো অনেক ছোট, তুমি কী পারবে এ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে?’ মনে মনে একটু ভয় ছিল, এত বড় বড় ভাইয়াদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। পরে যদি বক্তৃতা ভালো না হয়। কিন্তু না! শেষমেশ ভয় কাটিয়ে মঞ্চে উঠেই গেল। মঞ্চে উঠে যুবসমাজের অবক্ষয়ের জন্য মাদকই দায়ী বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া শুরু। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। কিছুক্ষণ পর হাততালির শব্দ ভেসে আসতেই জাহিনের মনের সব ভয় কেটে যায়। সেই তালিগুলোই জীবনের শক্তি হিসেবে মনে করে জাহিন।

ছোটবেলা থেকেই তার বাসায় পত্রিকা থাকত। জাহিনের বাবা তাকে নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা পড়তে বলতেন। এটা করে বিভিন্ন বিষয়ে বেশ ভালো একটা জানাশোনা হয়ে যায় তার। ২০১০ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে বার্ষিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উদ্যাপন উপলক্ষে একটি প্রজেক্ট বানায় সে। প্রজেক্টটির নাম হাইব্রিড পাওয়ার প্লান্ট। স্কুলের অধ্যক্ষ তার প্রজেক্টটি দেখে বেশ প্রশংসা করেন এবং সঙ্গে দশম শ্রেণির দুজনকে দিয়ে তাদের প্রজেক্টের একটি দল করে দেন। ছোট্ট জাহিন তাদের দলনেতা ছিল। প্রজেক্টটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে প্রদর্শন করে তারা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। তারপর সপ্তম শ্রেণিতে উঠে স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেই পুরস্কার পায়। ২০১৪ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিতর্কে পুরস্কার লাভ করে। তার পর থেকেই বিতর্কের প্রতি একটা টান কাজ করে। জাহিন বলে, ‘যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সত্য ও সুন্দর বেরিয়ে আসে। আর যুক্তি-তর্কের চর্চা বিতর্কের মাধ্যমেই সম্ভব।’ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় মাঝেমধ্যে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও হয়। যেমন—২০১৬ সালে বিটিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে ভেবেছিল তারা বোধ হয় হেরেই গিয়েছে। শেষ মোমেন্টে বিজয়ী হিসেবে তাদের নাম ঘোষণা করা হলো। বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা শুনে শক খেয়ে যায় সে। তারপর উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু সেমিফাইনালে গিয়ে আর জিততে পারেনি।

জাহিন ২০১৫ সালে তার স্কুলের বিএনসিসির প্লাটুন ইনচার্জ ও ক্যাডেট সার্জন ছিল। ২০১৭ সালে এএসডিসি জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ মডেল ইউনাইটেড নেশনসে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্ট্রাল ক্লাব প্রিফেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

কথা প্রসঙ্গে একটি মজার ঘটনা জানাল জাহিন, ‘একদিন নিজের ট্রফি ক্যাবিনেটটি দেখার জন্য খুললাম। তবে দেখে কেমন যেন মন ভরল না। মনে হলো আরো কিছু পুরস্কার ক্যাবিনেটে যোগ করতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, পরের দিন শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজে তৃতীয় এসএজিসি সায়েন্স ফেস্টের উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। কোনো কিছু না ভেবেই পরের দিন চলে গেলাম প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। ভাগ্যে বিষয় জুটল উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ। ব্যস, উঠে দাঁড়িয়ে বলা শুরু করলাম, আর দর্শক সারি থেকে তালি দেওয়া শুরু হলো। পরের দিন ফলাফল জানানো হলো। আমি প্রথম হয়েছি। পুরস্কার প্রদান করলেন প্রিয়

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার।’

প্রথমবার বাংলাদেশ মডেল ইউনাইটেড নেশনসে অংশগ্রহণ করেই বেস্ট ডেলিগেটের খেতাব পায়। জাহিনের দাদাও তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করে তোলেন। ‘আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি, দাদা তখন বাসায় ম্যাপ নিয়ে আসেন। তিনি আমাকে বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে বলেন এবং অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ কী—এগুলো বুঝিয়ে দিতেন। সেই থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নিয়ে আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার ইচ্ছা জাগে। তাই কলেজে উঠে যোগ দিই ‘মুন ক্লাবে’।

জাহিন ২০১৫ সালে বিএনসিসি থেকে নেপালে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। কিন্তু একটা অ্যাকসিডেন্টে তার পা ভেঙে যায়। তাই আর নেপালে যাওয়া হয়নি। অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। সময় পেলে সায়েন্স ফিকশন ও হরর বই পড়ে। জাহিনের প্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

বড় হয়ে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে চায়। ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার।



মন্তব্য