kalerkantho


প্রিয় সাবজেক্ট

তোমার প্রিয় বিষয় কী? এই প্রশ্ন ছোটবেলা থেকে কমবেশি সবাই শুনে এসেছি। কেউ বলে রসায়ন, কারো আবার পছন্দ গণিতের ম্যাজিক, বাংলায়ও মজেছে অনেকে। তবে বিষয়ে অমিল থাকলেও প্রিয় বিষয়ে একটু বেশি জোর দেওয়ায় সবাই এক। আট স্কুল-কলেজের আট শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তাদের প্রিয় বিষয়ের গল্প শুনেছেন জুবায়ের আহম্মেদ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গণিতের এই বিশাল জগতের সন্ধান দেন বাবা

পার্থপ্রতিম দাশ প্রীতম

দ্বাদশ শ্রেণি, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।

 

গণিতকে বাইরে থেকে দেখলে খুব কঠিন ও দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু গণিতের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান করে যে আনন্দ লাভ করা যায়, তার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুরই তুলনা করা চলে না। আমাকে গণিতের এই বিশাল জগতের সন্ধান দেন বাবা। একেবারে ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। সূত্রগুলো কিভাবে এসেছে, কেন আমরা এগুলো ব্যবহার করি তা খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর উত্সাহে আমি ওপরের ক্লাসের গাণিতিক সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতাম। কখন যে গণিত আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়ে পরিণত হলো, তা টেরই পেলাম না। এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ১০০-তে ১০০ নম্বর পেয়েছিলাম। একটু বড় হয়ে যখন দেখলাম, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় গণিতের ব্যবহার অপরিহার্য, তখন ভালো লাগার পরিমাণটা অনেক বেড়ে গেল। বিশেষ করে প্রগ্রামিংয়ের জগতে প্রবেশের শুরুতেই গণিতের উপস্থিতি আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করায়, গণিতের মহাসাগর কতটা গভীর। গণিতে ভালো করার জন্য প্রতিটি অধ্যায়ের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে পড়ে নিই। সূত্রগুলোর প্রমাণের ওপর জোর দিই। জ্যামিতির ক্ষেত্রে আলাদা বই কিনে পড়ি। বাসায় আমি নিজে নিজে সূত্র বুক নামে গণিতের আলাদা একটি নোট বানিয়ে রেখেছি। ফলে এতে সহজেই চোখ বুলিয়ে নেওয়া যায়।

 

ডিকশনারিও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে

সাদিয়া আহম্মেদ

দ্বাদশ শ্রেণি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা।

কলেজে ওঠার পর মোট ১০টির বেশি পুরস্কার পেয়েছি শুধু ইংরেজিতে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে। ইংরেজিতে উপস্থিত বক্তব্যে এরই মধ্যে পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছি। আমি মনে করি, এর মূল কারণ শুধু টেক্সটবুক নয়, আমার বাইরের বই পড়ার অভ্যাস। ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সমৃদ্ধ শব্দকোষের অধিকারী হওয়া। নিয়মিত বই পড়া এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ ও আনন্দময় পদ্ধতি।

ডিকশনারিও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমার ইংরেজিতে প্রিয় বই ‘এ থাউজেন্ড স্প্লেন্ডিড সানস’। বিভিন্ন ধরনের ইংরেজি বই পড়ে শুধু ইংরেজি বলা নয়, লেখা ও পড়ার দক্ষতাও তৈরি হয়েছে। ইউটিউবে ভিডিও দেখেও ইংলিশ স্পিকিং স্কিল ঝালিয়ে নিয়েছি। আর বিশ্বাস করি, ইংরেজিতে প্রতিবার ৮০ শতাংশের ওপর নম্বর পাওয়ার রহস্য—আমার বেশি বেশি ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস। তা ছাড়া ইংলিশ মুভি ও টিভি সিরিজ ইংরেজিতে পারদর্শিতা অর্জনে সাহায্য করেছে। কেউ কেউ সময় নষ্ট হচ্ছে মনে করলেও এই বিনোদনগুলো ইংরেজি শিক্ষার চমৎকার উপায়। মা-বাবা আমার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে আমাকে পছন্দের বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের সাহায্য করেছেন।

 

বাংলাই প্রিয়

সালেহ মাহমুদ তানিম

একাদশ শ্রেণি, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা।

ছোটবেলায় বাংলাটাকে বিভীষিকার মতো লাগত। তখন বাংলা বলতেই বুঝতাম শুধু লেখা আর লেখা! তবে বাংলায় বরাবরই ভালো নম্বর পেতাম দেখে ফলাফলের দিন ততটা কষ্ট লাগত না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘রামের সুমতি’ বইটি পড়ে বাংলা সাহিত্যের প্রেমে পড়ি। তখন আমার কাছে বাংলার বিভীষিকাময় রূপটা কেটে গিয়ে এর স্নিগ্ধতা প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলার অসম্ভব ঐশ্বর্যশালী সাহিত্য আমাকে শিখিয়েছে পড়ালেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটা বিষয়কেও কিভাবে ভালোবাসা যায়। যখন বাংলার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাওয়া শুরু করি, তখন একে আরো ভালো করে জানার আগ্রহ জন্মায়। সেই থেকে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প ও কবিতার বই চিরসখারূপে আমার বালিশের পাশে, পড়ার টেবিলে, স্কুলব্যাগ—সব জায়গায় আবির্ভূত হতে শুরু করে। পরিমিত লেখার সঙ্গে মনকাড়া শব্দচয়ন এবং সঠিক বাক্যসংগতি বাংলা বিষয়ে ভালো নম্বর এনে দিতে যথেষ্ট। আমি বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, কবিতা পড়ার সময় অচেনা কোনো শব্দ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই তার অর্থ ও সঠিক উচ্চারণ জেনে নিই। এ ছাড়া কবিতা ও গল্পের কোনো অংশ খুব ভালো লাগলে তা টুকে রাখি খাতায়। নতুন নতুন শব্দ দেখলে অভিধান থেকে এর অর্থ মিলিয়ে নিই। তা ছাড়া বাসায় বেশ কয়েকটি বাংলা ব্যাকরণের বই তো আছেই।

 

ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ

আজমল ফুয়াদ আলম

ষষ্ঠ শ্রেণি, নেটপ্রো মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগুড়া।

আমার প্রিয় বিষয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বোর্ড বইয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ছিল না। তবু বিভিন্ন অনলাইন সাইট থেকে প্রযুক্তি বিষয়ে অনেক কিছু জেনে নিতাম। রোবটিকসের প্রতিও অনেক আগ্রহ। রোবট বানিয়ে চিলড্রেন সায়েন্স কংগ্রেস ২০১৬-তে জুনিয়র ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছিলাম। তার পর থেকেই আমার প্রগ্রামিংয়ের প্রতি অনেক আগ্রহ হয় এবং আমি সি++ প্রগ্রামিং তামিম শাহরিয়ার সুবিন স্যারের বই দেখে শিখতে শুরু করি এবং এখনো শিখছি। যার ফলে ওপরের ক্লাসের প্রগ্রামিং অধ্যায়ের পাঠ্য অংশগুলো এখনই রপ্ত করে ফেলেছি। আইসিটি চর্চা করার জন্য সব সময় ইন্টারনেটে আইসিটি নিয়ে বিভিন্ন আর্টিক্যাল পড়ি এবং পড়ালেখার পাশাপাশি যেটুকু সময় পাই, ওই সময় বিভিন্ন আইসিটি রিলেটেড প্রজেক্ট বানানোর চেষ্টা করি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে আইসিটি বোর্ড বই থেকেও অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আইসিটি সম্পর্কে বিভিন্ন জ্ঞান অর্জন আমাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করছে। সম্প্রতি বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৮-এ জুনিয়র বিভাগে প্রজেক্ট ‘বাইব্যায়’ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।

 

সাধারণ বিজ্ঞানই আমার প্রিয়

 

আবিব মুনতাসির

অষ্টম শ্রেণি, হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর।

বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি ঘাঁটা আমার অভ্যাস। নিজের বাসায় যখন সামান্য উপকরণ পাই, তখন বসে যাই পরীক্ষা করতে, অনেকটা মিনি ল্যাবের মতোই। বড় হয়ে যে গবেষক হতে চাই। তারপর বইয়ের তত্ত্বীয় অংশের সঙ্গে মিলিয়ে নিই। পাঠ্য বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের ব্যাবহারিক বোঝার চেষ্টা করি। ফলে পড়াটা তাড়াতাড়ি মাথায় গেঁথে যায়। বিজ্ঞানে মুখস্থের অতটা ঝামেলা নেই। আমার আবার মুখস্থ করাতে অনীহা। সাধারণ বিজ্ঞান বই থেকে অণু, পরমাণু, জীবকোষ নিয়ে পড়তে ভালো লাগে। বাসায় বিজ্ঞানের বিভিন্ন বইয়ের সংগ্রহ আছে। অবসর সময়ে বিজ্ঞানের নানা রহস্যময় বিষয় পড়ি। আর ইউটিউব থেকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন পরীক্ষণ দেখে নিই। এতে তত্ত্বীয় ও ব্যাবহারিক উভয় অংশই ভালোভাবে রপ্ত হয়। স্কুলের পরীক্ষাগুলোতেও সাধারণ বিজ্ঞানে ভালো নম্বর পেয়ে আসছি।

 

মৌলের নামগুলো মনে রাখতে তৈরি করেছি নানা ছন্দ

দিদারুল ইসলাম

একাদশ শ্রেণি, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া।

ছোটবেলা থেকেই নতুন মলাট দেওয়া সাধারণ বিজ্ঞান বইটার হিবিজিবি আঁকিবুঁকি আর বিক্রিয়ায় ভরা পৃষ্ঠাগুলোর প্রতি একটু অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করত। আমার কাছে রসায়ন মানে পরীক্ষার খাতায় একগাদা মার্কস নয়, বরং লেড পেনসিলের গ্রাফাইট আর স্কচটেপ থেকে গ্রাফিন হয়ে ওঠার মতো একেকটি উপাখ্যান। তাই মন থেকে সব সময়ই ভালো লাগার বিষয় রসায়ন। রসায়নের বিক্রিয়াগুলো বুঝে পড়তে বানিয়ে নিয়েছি বিক্রিয়া চার্ট। সুযোগ পেলেই চোখ বুলিয়ে নিই। অবশ্য রসায়নের বিক্রিয়াসহ যেকোনো অংশ মনে রাখতেই বারবার অনুশীলনের বিকল্প নেই।  

মৌলের নামগুলো মনে রাখতে তৈরি করেছি নানা ছন্দ। আর ছন্দে ছন্দে মৌলের নাম মনে রাখার কৌশলটা আমার বেলায় বেশ কার্যকর। অবশ্য কখনো কখনো রসায়নের কিছু কিছু বিষয় মুখস্থও করতে হয়।

 

হিসাববিজ্ঞান ভালো লাগে

ইরফানা আলম সামিয়া

দশম শ্রেণি, সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

ছোটবেলা থেকেই হিসাবনিকাশ বেশ পছন্দের। তাই তো নবম শ্রেণিতে ওঠে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগ বেছে নিই। হিসাববিজ্ঞানে সংগঠিত আর্থিক ঘটনার সামগ্রিক প্রভাব ও ফলাফল জানা যায়। হিসাববিজ্ঞানে অনেক সূত্র রয়েছে। সূত্র ছাড়া মুখস্থের ঝামেলা নেই বললেই চলে। আমার আবার মুখস্থ করতে ভালো লাগে না। সূত্রগুলো সহজে প্রতিদিন দেখার জন্য একটি সূত্রের ক্যালেন্ডার বানিয়েছি এবং পড়ার টেবিলের সামনে টানিয়ে রেখেছি। ফলে হিসাববিজ্ঞানের অঙ্ক করার সময় কোথাও সূত্র ভুলে গেলে একনজর দেখে নিই। অন্যান্য বিষয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে আমার আগ্রহ অনেক। কয়েকটি নোটখাতা বানিয়ে রেখেছি বিভিন্ন অধ্যায়ভিত্তিক অঙ্ক তোলার জন্য। আর ইন্টারনেট তো আছেই। ইউটিউবে বিভিন্ন অধ্যায়ের টিউটরিয়াল দেখি, তারপর নিজে অঙ্ক সলভ করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে করপোরেটে জব করতে চাই, তাই হিসাববিজ্ঞানটা বেশি ভালো লাগে।

 

জীববিজ্ঞানের পরীক্ষণগুলোর ভিডিও দেখি

নুজহাত সাবিহা পুষ্পিতা

দশম শ্রেণি, উইল্স লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।

আমার প্রিয় জীববিজ্ঞান। এটি বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক একটি শাখা। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও বিভিন্ন জীব সম্পর্কে জানার একটা আগ্রহ ছিল। আর এসব জীবের জীবনধারণ সম্পর্কে জানা যায় জীববিজ্ঞানেই। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাবহারিক পরীক্ষা করতে হয়। যা বইয়ে পড়েছি, তা পরীক্ষণের মাধ্যমে আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। জীববিজ্ঞানে অনেক কিছুই মুখস্থ করতে হয়। তাই অনেক কিছুই নোট করে রাখি, যাতে মুখস্থ করতে সুবিধা হয়। যেমন—বিভিন্ন জীবের বৈজ্ঞানিক নামগুলো ভালো করে নোট করে রেখেছি। বাসায় সময় পেলে জীববিজ্ঞানের পরীক্ষণগুলোর ভিডিও দেখি। স্কুলের বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা যায়, অন্যান্য বিষয়ে এ+ আসুক আর না আসুক, জীববিজ্ঞানে মিস হয় না। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছাটাও মনের মধ্যে জাগে। তাই জীববিজ্ঞানে সব সময় ভালো করার চেষ্টা করি। জীববিজ্ঞান পড়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাই।



মন্তব্য