kalerkantho


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যোৎসব

মঞ্চের আকাশে বিচরণ

তিন দিন ধরে নাট্যোত্সবের আয়োজন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ। সেই উত্সব ঘিরে সংগঠনটির গল্প শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদুহ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মঞ্চের আকাশে বিচরণ

৯ সেপ্টেম্বর। ক্লাস শেষে টিএসসিতে এসে ঢুকতেই দেখি সামনে বিশাল এক তোরণ। জানলাম, তিন দিনের নাট্যোত্সব করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ। প্রতিদিন একটি করে নাটক প্রদর্শিত হবে। প্রথম দিন সংসদটির প্রথম প্রযোজনা—‘কাকচরিত্র’। বাকি দুই দিন একে একে নাটক পরিবেশন করবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের দুটি নাট্যদল। বেশ আগ্রহ নিয়ে ঢুকে পড়লাম টিএসসি মিলনায়তনে। মঞ্চে নাটকের জন্য সেট তৈরি। তবে তার আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তারপর বেজে উঠল থার্ড বেল। এবার জমিয়ে বসার পালা। ভারতীয় নাট্যকার মনোজ মিত্রের ‘কাকচরিত্র’ নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুভ্রা গোস্বামী। মানুষের মতো কথা বলতে পারা একটি কাকের গল্প এটি। সমাজ-সংসার নিয়ে লিখে বেশ খ্যাতি কামানো এক নাট্যকারকে মানুষের আসল রূপ জানিয়ে দেয় সেই কাক। নাট্যকারটি যাদের মহামানব ভেবে মহিমান্বিত করতে চেয়েছিল, সেই ভণ্ডদেরও চিনিয়ে দেয় কর্কশকণ্ঠী পাখি।

নাটকটি দেখে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি হলো। কেননা জানতে পারলাম, এটির কোনো চরিত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের কোনো শিক্ষার্থী অভিনয় করেননি। আমার আগ্রহ জাগল নাট্য সংসদ নিয়ে। যোগাযোগ করলাম সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে হলে হলে নাট্যোত্সবের আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তখন সিদ্ধান্ত হয়, তাতে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগের ছাত্ররা নির্দেশনা দেবেন এবং অভিনয় করবেন হলের ছেলেরা। সেবার নির্দেশনায় ছিলেন বিভাগটির ছাত্র সানোয়ারুল হক। উত্সবের পর থিয়েটারে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন অনেকেই। তা ছাড়া সানোয়ার, জুনিয়র সবুজসহ কয়েকজন খেয়াল করেছিলেন, টিএসসিতে অন্যান্য থিয়েটারের সদস্যরা রিহার্সাল করলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নাট্যদল নেই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী নাটকে ইচ্ছুক, তাঁরা বেশ দূরের থিয়েটারগুলোতে গিয়ে ভর্তি হচ্ছেন, রিহার্সাল করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন কোনো সংগঠন থাকলে এঁদের সবার বেশ সুবিধা হয়। তাই শুরুতে আগ্রহী কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে হাজির হন তখনকার উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের কাছে। তাঁর অনুপ্রেরণায় পথচলা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদের। মডারেটরের দায়িত্ব নেন বর্তমানে বিভাগটির চেয়ারপারসন আহমেদুল কবির।

সংগঠনটির জন্য কোনো কক্ষ তখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। সভা করতে হতো সিনেট ভবনের সিঁড়িতে কিংবা টিএসসির মাঠে। এরই মধ্যে গত বছরের শুরুতে সদস্য আহ্বান করা হয়। তাতে খুব একটা সাড়া পাওয়া না যাওয়ায় উদ্যোক্তারা ঠিক করেন, সে বছরের সেপ্টেম্বরে করবেন দুই দিন ধরে নাট্যোত্সব। এভাবেই যাত্রা শুরু এ উত্সবের। গতবার নাটক পরিবেশনা করেছিল নাট্যকলা বিভাগ ও ওপেন স্পেস থিয়েটার। বেশ সাড়া পড়েছিল। আর তাতেই সংগঠনটির প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাই তাঁরা সাহস পান নিজেদের কাজ শুরু করার। অক্টোবর মাস থেকেই রিহার্সাল শুরু করেছিলেন নাটকটির; আর প্রথম প্রদর্শনী করেছিলেন ডিসেম্বরে, টিএসসিতে। সে মাসেরই ৩ তারিখে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রামে পাড়ি জমিয়েছিলেন ‘কাকচরিত্র’ নিয়ে। কুড়িয়েছেন প্রশংসা। এরপর তাঁরা প্রস্তুত করেন আরেকটি নাটক—‘নিখোঁজ সংবাদ’। এই আত্মবিশ্বাস পুঁজি করে এবার তিন দিন ধরে নাট্যোত্সব আয়োজনের সাহস দেখিয়েছে সংগঠনটি। এরই মধ্যে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পরিচালনা করেছে তিন দিনের একটি ওয়ার্কশপ। এতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামীম হাসান। 

সবুজ জানালেন, এ আয়োজনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁরা। আরো জানান, ‘থিয়েটারকে শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই আমরা।’ সভাপতি সানোয়ার বলেন, ‘মূলত নাট্যকলা বিভাগের বাইরে যাঁরা থিয়েটারে আগ্রহী, তাঁদের একটি প্ল্যাটফর্ম করে দেওয়ার জন্যই আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ। এখানে যেকোনো বিভাগের শিক্ষার্থীকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়।’ অন্যদিকে নাট্য সংসদের ওয়ার্কশপ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, ‘মূলত তিনটি বিষয়ে আমি এই ওয়ার্কশপ করিয়েছি—অভিনয়ের ক্ষেত্র, কণ্ঠ ও দেহকে আরো বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রকাশ করার উপায় এবং ঘটনাকে ধারণ করার কলা।’

উত্সবের দ্বিতীয় দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যদল পরিবেশনা করে সেলিম আল দীন রচিত বিখ্যাত নাটক—‘কীত্তনখোলা’। এটির নির্দেশনা দেন আহসান হাবীব। তৃতীয় দিনে ছিল ভারতের আনন্দন থিয়েটারের নাটক—‘টেলিস্কোপ’। এ এক পাগল মেয়ের গল্প, যে বাবার কাছ থেকে আকাশ দেখা শিখেছিল। জীবন তার সব কিছু কেড়ে নিলেও আকাশ দেখা কাড়তে পারেনি। আর এই আকাশ দেখার বাধা শুধু একটি টেলিস্কোপ।

সফল এ আয়োজন শেষে এ সংগঠন মঞ্চের আকাশে বিচরণের স্বপ্ন অসংখ্য শিক্ষার্থীর মনে জাগিয়ে তুলতে পারবে—এমনটা আমরা আশা করতেই পারি।



মন্তব্য