kalerkantho


ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স স্টুডেন্ট সামিট

ড্রোগোনের ড্রোন

কখনো কখনো এমন বিপর্যয় আসে, অসংখ্য তাজা প্রাণ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জাগে। তাঁদের বাঁচাতে হিমশিম খেতে হয় উদ্ধারকারীদের; এমনকি তাঁদেরও প্রাণ পড়ে যায় ঝুঁকির মুখে। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো যন্ত্র বাড়িয়ে দেয় বন্ধুর হাত, কেমন হয়? তেমনই একটি ড্রোন ও সেটির উদ্ভাবকদের কথা জানাচ্ছেন মেহেদী হাসান গালিব

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ড্রোগোনের ড্রোন

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর এনএসবিএম গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স স্টুডেন্ট সামিট’ বা ‘আইট্রিপল-ই এসএস ১২’। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে বিশ্বব্যাপী পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক চমত্কার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল এই  প্রতিযোগিতা। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘এম্প্যাথি টু ইঞ্জিনিয়ারিং : সলিউশনস ফর ম্যাক্রো ইস্যুস’। মেকার ফেয়ার, জুনিয়র আইনস্টাইন ও ভার্চুয়াল ট্রাক—এই তিনটি পর্বে সাজানো হয়েছিল পুরো প্রতিযোগিতা।

‘মেকার ফেয়ার’ বিভাগে এশিয়ার আট দেশের শিক্ষার্থীদের ৫০টি দল বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রদর্শন করেছে। বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিল রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দুই সদস্যবিশিষ্ট দল—‘ড্রোগোন’। দলের সদস্য দেওয়ান তৌহিদ রহমান ও সালেহ মোহাম্মদ শাহরিয়ার—দুজনই  ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁরা এমন একটি ড্রোন উপস্থাপন করেছেন, যেটি প্রতিকূল পরিবেশে ও উদ্ধারকাজে মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করতে সক্ষম। ফাইনাল রাউন্ডে বিচারকদের নির্বাচনে পঞ্চম স্থান অধিকার করে নেয় ড্রোগোন উদ্ভাবিত এই ড্রোনটি।

ড্রোন তৈরির গল্পটি শুরু হয় সেমিস্টার প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে। তৌহিদ ও সালেহ শুরুতে ভেবেছিলেন, এমন একটি রোভার বানাবেন, যেটি উঁচু-নিচু যেকোনো রাস্তায় চলতে পারবে। পরে তাঁদের মাথায় আসে, চলমান কোনো বৈশ্বিক সমস্যায় মানুষের উপকারে আসতে পারে—এমন কিছু বানাতে পারলে মন্দ হয় না! ঠিক তখনই তাঁদের মনে পড়ে যায়, ২০১০ সালে আমেরিকার কানেক্টিকাটের একটি পাওয়ার প্লান্ট বিস্ফোরণের কথা। সেই বিস্ফোরণটির কারণে পুরো এলাকা তখন বিষাক্ত গ্যাসে ছেয়ে গিয়েছিল; ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল উদ্ধার অভিযান। তাঁরা ভাবতে থাকেন, এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযানের শুরুতে মানুষ না পাঠিয়েও আটকে পড়া মানুষের অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার কোনো বুদ্ধি করা যায় কি না। এই ভাবনাগুলো জড়ো করে তাঁরা বানিয়ে ফেলেন এমন একটি ড্রোন, যেটি এরিয়াল ভিউয়ের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশ কিংবা দুর্ঘটনার স্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা দিতে সক্ষম।

ড্রোনটিতে মোট পাঁচটি সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে—এমকিউ-৩, এমকিউ-৪, এমকিউ-৫, এমকিউ-৬ ও এমকিউ-৮। এ ছাড়া রয়েছে রিমোটের মাধ্যমে পরিচালিত একটি রোবটিক হ্যান্ড। এটি কোনো স্থানের ছবি তুলে ও সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করে আগে থেকেই মানুষকে সতর্ক করে দিতে পারবে। এ ছাড়া যেখানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো বিপজ্জনক, এমন সব জায়গায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠাতে ব্যবহার করা যাবে ড্রোনটি। চারটি মোটরযুক্ত এই ড্রোন সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি ওজনের বস্তু উত্তোলন করতে সক্ষম। তবে মোটরের সংখ্যা বাড়িয়ে এটির উত্তোলনক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া এটির সাহায্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থলের প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট জানা যাবে।

ড্রোন বানাতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ রহমান জানান, ‘এসব কাজে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। এর সবটাই বহন করতে হয়েছে আমাদের নিজেদের। এ ক্ষেত্রে ফান্ডের ব্যবস্থা থাকলে আরো ভালো কিছু করা সম্ভব হতো।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনেক উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এই দুই তরুণ উদ্ভাবক। এর মধ্যে ড্রোনটি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে সাহস জুগিয়েছিলেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক ও তাঁদের প্রজেক্ট সুপারভাইজর তাসনিম বিনতে শওকত।

নিজেদের তৈরি ড্রোনটি আরো উন্নত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে এখন কাজ করে যাচ্ছেন তৌহিদ ও সালেহ। লিপো ব্যাটারির পরিবর্তে সোলার পাওয়ার ব্যবহার করে এটিকে পরিবেশবান্ধব করে তোলারও ইচ্ছা আছে তাঁদের। স্বপ্ন দেখেন, একদিন এসব উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ; বিশ্বের বুকে পাবে আরো শক্তিশালী এক পরিচয়।

 

 



মন্তব্য