kalerkantho


প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৭

তিন সেরার গল্প

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ভালো ফলে উত্সাহ জোগাতে ২০০৫ সালে প্রবর্তন করা হয় প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুলাই বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে ১৬৩ মেধাবী শিক্ষার্থীকে এ পদকে ভূষিত করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প শোনাচ্ছেন মেহেদী হাসান গালিব

২৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



পরিশ্রমই প্রাপ্তির রহস্য

মেহেদী হাসান

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

দক্ষ প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন ছোটবেলায়। ছিল বাবার উত্সাহ। চাচা খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর আব্দুল কুদ্দুস ছিলেন অনুপ্রেরণা। কাজেই স্বপ্নপূরণের পথ খুঁজে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসির পাঠ চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু করেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগে। বলছিলাম মেহেদী হাসানের কথা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির পরীক্ষায় চূড়ান্ত ফলাফলে নিজেকে সেরা প্রমাণ করে অর্জন করেছেন ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৭’।

মেহেদীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগ ২০০৯-এর শিক্ষার্থী, তাঁরই মামাতো বোন সুমাইয়া সাদিকা তুলী। এই বড় বোনের পাশাপাশি সঙ্গী হয়েছিল শিক্ষকদের নানা পরামর্শ ও উপদেশ। প্রথম সেমিস্টারের ফলাফলে নিজের নামটি সবার ওপরে দেখে এক ধরনের বিশেষ শক্তি অনুভব করেছিলেন তিনি। অর্জিত স্থানটি ধরে রাখতে তাই আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম ও নিয়মিত পড়াশোনায় নিজেকে মগ্ন করেছেন। আর এই পরিশ্রম ও নিয়মিত পড়াশোনার ফলেই প্রতিটি পরীক্ষায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখতে সক্ষম হন মেহেদী। ক্যাম্পাসে, অবসর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালো লাগে তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়রদের পড়া দেখিয়ে দিতে আনন্দ হয় খুব। এখন তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি করছেন। ভবিষ্যতে পিএইচডি সম্পন্ন করে গবেষণা ও শিক্ষকতায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন দেখেন।

 

ভালো করার জেদ

মো. রাহাত আলী

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

রাহাতের মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল সেজো ভাই মো. ফরহাদ আহমেদ মোল্লার হাত ধরে, দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ভর্তি করানোর পর ফরহাদ বাসায় এসে ভাইকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, রোল যেন ১ থাকে। সেজো ভাইকে খুব সমীহ করেন রাহাত। ভাইয়ের কথা মানতে শুরু করে দিয়েছিলেন নিয়মিত পড়াশোনা। সেই কথা রাখতে পেরেছিলেন তিনি। মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে শুরু হয় তাঁর কলেজজীবন। এ পর্যায়েও নিয়মিত পড়াশোনায় কোনো ফাঁকিবাজি ছিল না তাঁর। তবে এইচএসসিতে পান জিপিএ ৪.৯০। এ ফল মানতে পারছিলেন না তিনি। এ সময় পাশে দাঁড়িয়ে, পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দেন মেজো ভাই মো. ফারুক আহমেদ। ভাইয়ের উত্সাহ ও অনুপ্রেরণায় নিজেকে সামলে নেন রাহাত। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও হোঁচট খেতে হয় তাঁকে। তবু স্বপ্ন ছাড়া কি বাঁচা সম্ভব? তাই নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন তিনি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে শুরু হয় তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। এখানে প্রথম সেমিস্টারে অর্জন করেন দ্বিতীয় স্থান। এই ফল যেমন আত্মবিশ্বাসে যোগ করে এক নতুন মাত্রা, তেমনি ভবিষ্যতে আরো ভালো করার জেদ জেঁকে বসে তাঁর মনে। সেই জেদের শক্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সময়ে সব পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন তিনি। রাহাত এখন মাস্টার্সে পড়ছেন। এরই অংশ হিসেবে গবেষণা করছেন নিউক্লিয়ার ফিজিকসেও। ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানের একজন ভালো গবেষক হতে চান তিনি। গবেষণার সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা রাখেন।

বাবার পায়ে পায়ে

এস এম নাহিদুল ইসলাম

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

বাবা মো. আতিয়ার রহমান ছিলেন খুলনা জেলার গুটুদিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সেই স্কুলেই শিক্ষাজীবন শুরু নাহিদের। বাবার পেশা ও শিক্ষকতাজীবন দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁর শিশুমানসকে। তাই ছোটবেলায়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বড় হয়ে শিক্ষক হবেন। সেই স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই আজ তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন। কর্মরত আছেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্সের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে নিজেকে সেরা প্রমাণ করে জিতে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু হয়েছিল কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে। এখানে প্রথম দিকে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হলেও পড়াশোনার সঙ্গে আপস করেননি। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ক্লাস করে, এরপর দুপুরের খাবার খেয়ে কখনো বা বিকেল ৪টা আবার কখনো রাত ৮টা পর্যন্ত সময় কাটিয়েছেন লাইব্রেরিতে। এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রথম সেমিস্টারে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। সফলতার এই সূত্র ধরে বিবিএতে নিজ অনুষদের সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯৮ এবং এমবিএতে সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯২ অর্জন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল নাহিদের। তাঁর বিশ্বাস, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারা এবং সব কিছুর ভালো দিক গ্রহণ করার গুণটিও থাকা চাই।



মন্তব্য