kalerkantho


বিতর্কের বিত্ত

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আহমাদ রাশীক ফাইয়াজ বিত্ত। ১০ বছর ধরে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত আছেন। এই সময়ে ৪০টির মতো বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ছিলেন বিজয়ী দলের সদস্য। রানার-আপ হয়েছেন ১৮ বার। ২০ বার নির্বাচিত হয়েছেন শ্রেষ্ঠ বক্তা। বিতর্কপাগল এই তরুণের সঙ্গে কথা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বিতর্কের বিত্ত

২০১২ সালে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি আলী যাকেরের কাছ থেকে চ্যাম্পিয়নস দলের পুরস্কার নিচ্ছেন আহমাদ রাশীক ফাইয়াজ বিত্ত

বিত্তর আসার কথা আগারগাঁও থেকে। টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায় অপেক্ষা করছিলাম তাঁর জন্য। যখন এসে পৌঁছলেন, ঘড়িতে ৩টার মতো বাজে। গায়ে সাদা রঙের টি-শার্ট। পিঠে ঝোলা ব্যাগ। হাতেও শপিংব্যাগের মতো একটি ব্যাগ। চেয়ারের ওপর পিঠের ব্যাগটি রাখলেন। সেটি থেকে বের করলেন দুটি সোনালি রঙের ক্রেস্ট। একটি ‘চ্যাম্পিয়ন’, অন্যটি ‘শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক’-এর। এবারের পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সপ্তম আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়। তাতে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস হয়েছে বুয়েট নান্দনিক টিম। এই টিমের দলনেতা বিত্ত। পুরো প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকের পুরস্কারটিও উঠেছে তাঁর হাতে। তবুও মুখে হাসি নেই। কারণ কী? জানতে চাইলে কণ্ঠ ধরে আসে বিত্তর, ‘বিতার্কিক হিসেবে এটিই ছিল আমার শেষ প্রতিযোগিতা। ১০ বছরের বিতার্কিকজীবনের অবসান ঘটেছে এর মাধ্যমে। আর কোনো দিন বিতর্ক করব না—ভাবলেই কান্না পায়।’

তাঁর নাম আহমাদ রাশীক ফাইয়াজ বিত্ত। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। জীবনের শেষ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। নিজে হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা। এ যেন তাঁর জীবনের প্রথম প্রতিযোগিতারই প্রতিচ্ছবি। সেটি ২০০৮ সালের কথা। বিত্ত তখন আইডিয়াল স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ক্লাসে প্রথম হওয়া যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে গিয়েছিল তাঁর জন্য। পড়াশোনায় সবার সেরা হলেও ছিলেন খানিকটা অন্তর্মুখী। তাঁর বাবা এ কে এম আবদুর রাজ্জাক একদিন আইডিয়াল ডিবেটিং ক্লাবের একটি ফরম এনে দেন। তারপর বলেন, ‘এটি পূরণ করে জমা দিয়ে দাও।’ বিত্তকে সদস্য করে নিল ক্লাবটি। সেবারই প্রথম এ ক্লাব আয়োজন করেছিল আন্ত ক্লাস বিতর্ক প্রতিযোগিতা। জাহিদ ও মেহেদী নামের দুই সহপাঠীর সঙ্গে শ্রেণি প্রতিনিধি হিসেবে তাতে নাম লেখালেন বিত্ত। নাম লিখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আগে তো কখনো বিতর্ক করেননি! মনে এক ধরনের ভয় ও দ্বিধা কাজ করছিল। বাবা অভয় দিলেন। বাতলে দিলেন বিতর্কের কিছু কৌশল। আর তাতেই যেন ভর করে জীবনের প্রথম প্রতিযোগিতায় বাজিমাত করলেন বিত্ত। শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয়ে নিজ স্কুলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে গেলেন। সেবার মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্ত স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রানার্স-আপ হলো আইডিয়াল স্কুল। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি আয়োজিত আন্ত স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্কুলটি। সেরা বক্তার পুরস্কার গেল বিত্তেরই ঝুলিতে। সেই থেকে স্কুলের শিক্ষকরা দারুণ স্নেহ করতেন তাঁকে। বন্ধুরা ডাকতেন ‘বেস্ট স্পিকার’ বলে।

বিত্ত জানান, ‘আমি কিছুটা ঘরকুনো স্বভাবের ছিলাম। বিতর্ক আমাকে সামাজিকতা শিখিয়েছে। বিতর্ক করতে গিয়ে টের পেলাম, টপিকগুলো নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। তা ছাড়া প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে ঘায়েল করেও নির্মল আনন্দ মেলে। বলতে পারেন, তখন থেকেই বিতর্কের প্রেমে মজে গিয়েছি।’ ফলে পড়াশোনায় কিছুটা হলেও ছন্দপতন এলো। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম ছিলেন। নবম শ্রেণিতে হারালেন সেই স্থান। এ জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে কথা কম শুনতে হয়নি তাঁকে! মা বলতেন, ‘সারাক্ষণ শুধু বিতর্ক আর বিতর্ক। এ জন্যই তোর আজ এ অবস্থা!’ বিত্তর জেদ চেপে গিয়েছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বিতর্ক করেও যে ক্লাসে প্রথম হওয়া যায়—তা দেখিয়ে দিতে হবে।

দশম শ্রেণিতে আবার প্রথম হলেন। পাশাপাশি আইডিয়াল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। স্কুলে ‘অরিত্র’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো। সেটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১০ সালে বৈশাখী টিভি আয়োজিত পরিবেশ বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও হয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন। একই বছর বিটিভির জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় (স্কুল পর্যায়ে) সেমিফাইনালিস্ট হয়েছিল তাঁর দল।

এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন বিত্ত। কলেজে উঠেই বাংলার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ইংরেজি বিতর্ক শুরু করেন। নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের প্রধান টিম—‘নটর ডেম গোল্ডে’ও সুযোগ পেয়ে যান। পড়াশোনায় প্রথম সারিতে থাকার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অর্জন যাঁদের থাকে, সেই শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘অনারেবল মেনশন অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে নটর ডেম কলেজ। ২০১১ সালে সেই পুরস্কার পেয়েছেন বিত্ত। একই বছর বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন থেকে পেয়েছেন প্রেসিডেনশিয়াল অ্যাওয়ার্ড। নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের পক্ষ থেকে ‘ডিবেটার অব দ্য ইয়ার’ (২০১২-১৩) খেতাবেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। এরপর ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন বুয়েটে, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ভর্তির কিছুদিনের মধ্যে সুযোগ পেয়ে যান বুয়েট ডিবেট টিমে। ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ব্যস্ত কর্মসূচি থাকে। এর মধ্যে সুযোগ পেলেই অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। ২০১৭ সালে বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত ন্যাশনাল রোবটেক ফেস্টিভালে ন্যানোটেক এবং ডিজাইন অ্যান্ড সিমুলেশন ইভেন্টে বিজয়ী দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘বুয়েট মেকানিক্যাল ফেস্টিভাল ২০১৮’-এর মেকাথনে প্রথম রানার্স-আপ হয় বিত্তর দল। ‘ইন্টার ইউনিভার্সিটি পোস্টার কম্পিটিশন ২০১৮’তে হয় রানার্স-আপ। এ ছাড়া গত বছর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘এক আইডিয়াতে বাজিমাত’ শীর্ষক প্রতিযোগিতায় সারা দেশের ৪০০ টিমের মধ্যে দ্বিতীয় রানার্স-আপ হয় তাঁর দল।

দেশের বাইরেও সাফল্য আছে বিত্তর। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন অ্যাডজুডিকেটর হিসেবে। পরের বছর ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত একই প্রতিযোগিতায় বিতার্কিক হিসেবে করেন অংশগ্রহণ। আমরা অনেকেই জানি, ‘হাল্ট প্রাইজ’কে শিক্ষার্থীদের নোবেল পুরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সংগঠন ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ’ ও ‘হাল্ট প্রাইজ ফাউন্ডেশন’ প্রতিবছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিযোগীদের এমন একটি ব্যবসার আইডিয়া দিতে বলা হয়, সমাজ বদলাতে যেটি অবদান রাখতে পারবে। কয়েক ধাপে নির্বাচিত বিজয়ী দলকে নিজেদের পরিকল্পিত সামাজিক ব্যবসার আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ১৯ লাখ ডলার। ২০১৬ সালে বুয়েটে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার বাংলাদেশ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয় বিত্তর দল। পরের বছর চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত পর্বে বিশ্বের ৮০টি দেশের মধ্যে সেরা ছয়ে জায়গা করে নেন তাঁরা।

বুয়েটের ডিনস বৃত্তি ছাড়াও এসএসসি ও এইচএসসিতেও বোর্ড বৃত্তি পেয়েছিলেন বিত্ত। বিভাগীয় নবীনবরণ, র্যাগ ডে, ডান্স ফেস্টিভাল, মেকানিক্যাল ফেস্টসহ ক্যাম্পাসের যেকোনো আয়োজনে উপস্থাপনার দায়িত্বটি যেন অবধারিতরূপে তাঁর ঘাড়েই এসে পৌঁছে। বিত্ত তা হাসিমুখেই পালন করে যান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় এই তরুণ ২০১৫ সালে তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। এখন তাঁর কাঁধেই পরিবারের গুরুভার। পড়াশোনার পাশাপাশি সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গেই সামলাচ্ছেন তিনি। ভবিষ্যতে শিক্ষকতা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান এই তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থী।



মন্তব্য