kalerkantho


‘নিজের দেশকে সবার সামনে তুলে ধরা সত্যিই অসাধারণ’

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘নিজের দেশকে সবার সামনে তুলে ধরা সত্যিই অসাধারণ’

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

জুলাইয়ে ইরানের তেহরানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জ মেডেল পেয়েছে এসএফএক্স গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ও লেভেল পরীক্ষা দেওয়া অদ্বিতীয় নাগ। আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের এটিই প্রথম কোনো পদক। অলিম্পিয়াডসহ তেহরান ভ্রমণের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে অদ্বিতীয় নাগ

 

জাতীয় পর্যায়ে সিলেক্ট হওয়ার পর আমরা সাভারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজিতে তিন দিনের একটি আবাসিক ক্যাম্পে যাই। ওখানে প্রথমে ২০ থেকে আটজন সিলেক্ট করা হয়। তারপর আট থেকে চারজনকে নির্বাচিত করা হয়। আমি, প্রকৃতি প্রযুক্তি,

মো. বায়েজিদ মিয়া ও তামজিদ হোসেন তানিম—এই চারজন সিলেক্ট হই। ইরানের তেহরানে আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার জন্য জুলাই মাসের ১৫ তারিখ রাতে আমরা বিমানে চড়ি। সঙ্গে অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা তিনজন জুরি বা বিচারকও ছিলেন। ওই দিনই ওখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি।

এয়ারপোর্টে নামার পর আমাদের ইরানি গাইডের সঙ্গে দেখা হলো। তার নাম আমির। প্রায় ছয় ফুট লম্বা আমির আমাদের তেহরান শহরে নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি প্রগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। প্রতিযোগীরা নিজের দেশের পতাকা নিয়ে স্টেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা লাল-সবুজ টি-শার্ট গায়ে পতাকা হাতে স্টেজের সামনে গিয়েছি। তখন আমার খুব গর্ব হচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে ফুটবল খেলা দেখতে বসলাম। ওই দিন ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ। আমাদের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার টিম ছিল। অন্যদিকে ফ্রান্সের কোনো টিম ছিল না। তাই সবাই বলছিল ক্রোয়েশিয়া জিতবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ক্রোয়েশিয়া হারল। খেলা দেখার সময় বিভিন্ন টিমের সঙ্গে পরিচয় হয়। কানাডার প্রতিযোগীরা প্রথম এসে আমাদের সঙ্গে পরিচিত হলো। এক এক করে অনেক দেশের টিমের সঙ্গে কথা হয়। বন্ধুত্ব হয়। আমরা তাদের সঙ্গে গল্প করি, তাদের দেশের পড়াশোনা সম্পর্কে জানি। ওরাও আমাদের পড়াশোনা সম্পর্কে জানে।

রাত থেকেই আমাদের জুরিরা আলাদা থাকতে শুরু করেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে আর কথা হয় না। তিন দিন কোনো রকম যোগাযোগ ছাড়া থেকেছি।

১৬ তারিখে আমাদের বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল সায়েদাবাদ নামের একটি জায়গায়। ওখানে একটি প্যালেস ছিল। পাহাড়ের ওপর। তারপর বিভিন্ন জাদুঘরে গেলাম। ইরানে অনেক ট্রাফিক জ্যাম হয়। আমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় রাস্তা ফাঁকা করে রাখা হয়েছিল। বাসের মধ্যে গান-বাজনা আনন্দ-ফুর্তি হলো।

তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে ৭টায় আমাদের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। সেদিন ব্যাবহারিক পরীক্ষা ছিল। আগের রাতে হোটেলরুমে বসে আমরা চারজন পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করি। পরীক্ষার সময় আমাদের নতুন ধরনের ক্যালকুলেটর দেওয়া হয়েছিল, এ ধরনের ক্যালকুলেটরের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম না। পরীক্ষার ফাঁকে একজন বন্ধুর কাছে ক্যালকুলেটরটি কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা শিখে ফেললাম। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি; প্ল্যান্ট অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও সিস্টেম্যাটিক্স; বিবর্তন, ইকোলজি ও প্রাণীর আচরণ এবং এনিম্যাল অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও সিস্টেম্যাটিক্স—এই চারটি বিষয়ে দেড় করে মোট ৬ ঘণ্টা পরীক্ষা হয়। চারটা পরীক্ষার পর সবাই ক্লান্ত হয়ে যায়। আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিই, সেখানে কালচারাল নাইট হয়। কালচারাল নাইটে খেলাধুলার ব্যবস্থাও ছিল। আমরাও খেলাধুলা করেছি। ইরানি গায়ক ও জনপ্রিয় ব্যান্ডদল গান পরিবেশন করেছিল। সুন্দর একটি ইভেন্ট ছিল। তার পরের দিন ছিল আমাদের ব্রেক। তাই বন্ধুরাসহ শপিং মলে গিয়েছিলাম। রাস্তার দোকান ঘুরে দেখলাম। ১৯ তারিখে আবার একটি পরীক্ষা হলো। লিখিত পরীক্ষা। নেওয়া হয় অনলাইনে। সেদিন রাতেও আরেকটি কালচারাল নাইট হয় ওই ইউনিভার্সিটিতে।

কালচারাল নাইটে স্টল বসেছিল। আমাদের কুপন দেওয়া হয়েছিল ইরানি জিনিসপত্র কেনার জন্য। বিভিন্ন জিনিস কিনেছিলাম। তাদের জাতীয় জাদুঘরেও ঘুরেছিলাম। ষষ্ঠ দিনে আমাদের ইরানি বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি বিষয় ভালো লেগেছে যে ওখানে যেকোনো খাবার কেনার আগে তা খেয়ে টেস্ট করে দেখা যায়। আমিও ওদের অনেক খাবার টেস্ট করেছিলাম। দামাদামি করে জিনিসপত্র কিনেছি। ওখানকার মিষ্টি ও বাদাম কিনেছি। সেখানে ঘুরে আরেকটি বিষয় বুঝেছি, ইরানের মানুষ কাবাব খুব পছন্দ করে।

আমরা এক টিম আরেক টিমকে ছোট ছোট গিফট দিই। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগীরা আমাদের জন্য ছোট ছোট কোয়েলাপুতুল এনেছিল। স্লোভেনিয়ানরা আমাদের জন্য এনেছিল ব্যাজ। আমরা বাংলাদেশের স্ট্যাম্প গিফট দিয়েছি। থাইল্যান্ড হাতির ছোট ছোট মূর্তি দেয়।

ওখানে বেলজিয়াম টিমের একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আমার। সে জন্মগতভাবে ছিল ফরাসি। জানলাম, ফরাসিদের রুটি খুব পছন্দ। রুটিকে ওরা বাগেট বলে। বন্ধুর কাছে আরেকটি মজার ঘটনা শুনেছি, তারা নাকি পিত্জায় সস দেয় না। অলিভ অয়েল দিয়ে খায়। আবার আরেক বন্ধু ছিল স্লোভেনিয়ার। তার নাম ক্লেমেন। অলিম্পিয়াডে সে-ই আমার প্রথম বিদেশি বন্ধু। তাদের ভাষায় বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে।

২২ তারিখে আমাদের রেজাল্ট। সেদিন সকালে ব্রেকফাস্টে সবাই চুপচাপ। আমাদের একটি হোটেলে বিকেল ৩টায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে সব দেশের প্রতিনিধিরা সারি ধরে বসে গেছে। আমরা এক কোণে বসেছিলাম। ভাবছিলাম, আমাদের মেডেল আসবে কি না! তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মেডেলের জন্য একজনের পর একজন ডেকেই যাচ্ছে। ব্রোঞ্জ থেকেই ডাকা শুরু হয়। একপর্যায়ে বেশ কয়েকটি নাম ডাকা হয়ে যায়। আমরা চারজন তখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েই বসে আছি। আমাদের জুরিরাও বেশ নিরাশ ছিলেন। তার পরও আমাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন, ‘একটা সার্টিফিকেট হলেও তো বাসায় নিয়ে যাবা।’ আমার ঠিক মনে আছে, কানাডার পরে হঠাৎ আমাদের কানে এলো ‘বাংলাদেশ’। আমরা চারজন চিত্কার করে উঠলাম। ভাবতে থাকলাম, চারজনের মধ্যে কে হতে পারে। হঠাৎ আমার নাম ডাকা হলো। ওখানে বেঞ্চের সামনে পতাকা রাখা ছিল। পতাকা নিয়ে দৌড়ে মঞ্চের সামনে গেলাম। ওখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা ছিল। সবাই বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। হাসতে হাসতে মঞ্চে গিয়ে মেডেল নিলাম। অবশ্য যারা পদক পায়নি, তাদেরও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল।

নিজের দেশকে সবার সামনে তুলে ধরা সত্যিই অসাধারণ। রাতে ডিনারে সবাই আমাকে কনগ্র্যাচুলেশন বলছে, কোলাকুলি করছে। ব্রাজিলের টিমকে বলেছিলাম, বাংলাদেশে তোমাদের অনেক ফ্যান আছে। আর্জেন্টিনার দলকেও বলেছিলাম দেশে তাদের জনপ্রিয়তার কথা।

প্রাইজ পাক আর না পাক, সবাই খুশি। ফেরার সময় অনেক কষ্ট লেগেছে। সাত দিনে যে এত নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে তাদের সঙ্গে জীবনে আর কখনো দেখা হবে কি না জানি না। অনেক রাত জেগেছিলাম। বন্ধুদের বিদায় দিয়েছিলাম। আর পরের দিন সকালেই আমাদের ফ্লাইট ছিল। আমাদের গাইড আমাদের উপহার দিয়েছিল, আমরাও দিয়েছিলাম। ফেরার সময় সবার জন্য মন খারাপ থাকলেও বাংলাদেশের নাম সবার কাছে প্রচার করতে পেরে খুব ভালো লাগছিল।

অনুলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

তেহরানে বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড দলের প্রতিযোগীরা

 



মন্তব্য