kalerkantho


রিমঝিমের ‘বর্ণখেলা’

২৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



রিমঝিমের ‘বর্ণখেলা’

রুবাইয়া রওশন রিমঝিমের ‘ওগমেন্টেড রিয়ালিটি’ পাঠ্য বইয়ে যুক্ত হয়েছে। তাঁর বর্ণখেলা অ্যাপসটি চালু করে ছবির ওপর স্মার্টফোন রাখলে ছবিটি বাস্তবের মতো দেখায়। এই উদ্ভাবনের গল্প শোনাচ্ছেন ওমর শাহেদ এবং ইয়াকুব ভূঁইয়া রাকিব। ছবি তুলেছেন হাবিবুর রহমান

‘ওগমেন্টেড রিয়ালিটি’ হলো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো ছবিকে বাস্তবের মতো বড় আকারে দেখা সম্ভব হয়। গরুর ছবি বইয়ের পাতায় আছে, প্রযুক্তিটি মোবাইল অ্যাপসে যুক্ত করে অ্যাপসটি চালু করে ছবিটির ওপর মোবাইল রাখলে ছবিটি অনেকটাই আসল হিসেবে বড় আকারে ভেসে উঠবে। ফলে অনেক ভালোভাবে শিশুরাসহ যে কেউ ছবির প্রাণী, বস্তুকে বুঝতে পারবে। খুশির খবর হলো, আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রযুক্তিটি গ্রহণ করেছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির বইতে ‘ওগমেন্টেড রিয়ালিটি’র ব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন থেকে এনসিটিবির ওয়েবসাইটের বইগুলোর পিডিএফ নামিয়ে বা আসল বইয়ের যেকোনো ছবির ওপর অ্যাপসটি চালু করে মোবাইল ফোন রাখলে শিশুদের এসব বইয়ের ছবিগুলো আসল প্রাণী, বস্তুর মতো করে দেখানো সম্ভব হবে। ফলে তাদের পাঠ আরো অনেক বেশি কার্যকর ও জীবন্ত হবে। শিক্ষাক্রমে ওগমেন্টেড রিয়ালিটির এই ব্যবহারে সহযোগিতা করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ বা ‘এটুআই’ প্রকল্প। এই প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক হলেন রুবাইয়া রওশন রিমঝিম।

তিনি ঢাকার ‘ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (সিএসই) ছাত্রী। ২০১৩ সালের শুরুতে প্রযুক্তিটির প্রতি তাঁর আগ্রহের শুরু। তিনি বললেন, ‘আমরা কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করি বলে সব সময় সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগুলোর খোঁজ রাখতে হয়, জানতে ও শিখতে হয়। তখনই গুগল প্লাস, মাইক্রোসফট হলোলেন্স ইত্যাদি বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে পৌঁছতে শুরু করে। এগুলোর মাধ্যমে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, ওগমেন্টেড রিয়ালিটির ব্যবহার শুরু।

তখন থেকে আমি ত্রিমাত্রিক এই প্রযুক্তিতে ঝুঁকেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা, ইন্টারনেট ঘেঁটে এই সম্পর্কে যা-ই পেয়েছি; পড়তে ও জানতে শুরু করেছি। অবাক হয়েছি—উন্নত দেশগুলোয় ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষণ দক্ষতাকে আরো কার্যকর করতে শিশু শ্রেণি থেকে চিকিত্সাবিদ্যার উচ্চ স্তরের লেখাপড়ায়ও ওগমেন্টেড রিয়ালিটির প্রচুর ব্যবহার হয়। ফলে আমারও ইচ্ছা হলো—বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকনির্ভর, মুখস্থবিদ্যার শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হোক। তাহলে শিশুরা আরো অনেক আগ্রহ নিয়ে বইগুলো পড়বে, তাদের জ্ঞানের পরিধিও খুব সমৃদ্ধ হবে।’ তাই লেখাপড়ার মধ্যেই এ বিষয়ে কাজ করা যাবে এমন একটি কোর্স ‘মেশিন লার্নিং’ বেছে নিলেন তিনি। কোর্স শেষে প্রকল্পও উপস্থাপন করলেন। সেখানে গিয়ে ছোটদের জ্যামিতিতে ওগমেন্টেড রিয়ালিটির প্রয়োগের জন্য ছোট্ট অ্যাপসও বানালেন। সেটির ডিজাইন করে নাম দিলেন—‘এআর কিডস’। উদ্ভাবনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল, আরো ব্যাপক পরিসরে ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তবজগতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আসা। তাঁর প্রচেষ্টাকে কোর্স শিক্ষক মিনহাজুল আলম খুব পছন্দ করলেন। প্রিয় ছাত্রীকে তিনি প্রকল্পটি নিয়ে আরো বেশি কাজ করতে উত্সাহ দিলেন। রিমঝিমের কাজ শুরু হলো।

এই বছরটি তাঁর সাফল্যের বছর। তাঁর মাধ্যমে ওগমেন্টেড রিয়ালিটি আমাদের দেশে আইসিআইভির (ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইনফরমেটিকস, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ভিশন) পঞ্চম আসরে ‘লোকাল কনফারেন্স পেপার’ হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হলো। তাতে শিক্ষাক্ষেত্রে ও পড়তে বা বানান করতে বিশেষ অসুবিধা বা অক্ষমতা রোগের উপশমে প্রযুক্তিটির ব্যবহারের কথা বললেন তিনি। সে বছরের ‘ডিজিটাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফর উইমেনে’ তাঁর তৈরি মোবাইল অ্যাপসটি প্রথম রানার্স-আপের পুরস্কার জিতল। এর পর ইউআইটিএস ‘আই-ইইই’ শাখা আয়োজিত আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রগ্রামিং প্রতিযোগিতায় এটি সেরা মোবাইল অ্যাপসের পুরস্কার জিতল। সব আসরেই অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এর প্রয়োগের ধারণা আশাবাদী করে তুলল। ফলে বেসরকারি কয়েকটি অ্যাপস নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে এই প্রযুক্তি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখাল। বাণিজ্যিক মূল্য আছে এই সিদ্ধান্ত থেকে রিমঝিমকে তাঁর আইডিয়াটি বিক্রি করে দেওয়ারও প্রস্তাব করা হলো। তবে আগে থেকে আইডিয়া চুরি হবে ভেবে কোথাও পুরো অ্যাপসের নির্মাণ প্রক্রিয়া তিনি উপস্থাপন করেননি। দেশের মানুষের উপকার হবে ভেবে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের প্রভাষক আল ইমতিয়াজ রওশনকে পরামর্শ দিলেন, ‘তোমার এই প্রকল্পের ধারণা প্রধানমন্ত্রীর এটুআইতে জমা দাও।’ ২০১৬ সালের অ্যাকসেস টু ইনফরেশন (এটুআই) প্রতিযোগিতায় পুরো দেশের প্রায় তিন হাজার প্রকল্পের মধ্যে ‘ওগমেন্টেড রিয়ালিটি’ বাছাই করা সেরা প্রকল্পের অন্যতম হিসেবে পুরস্কার পেল ও ‘এটুআই’র সহযোগিতায় পাঠ্যপুস্তকে ওগমেন্টেড রিয়ালিটির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা শুরু হলো। সেখানে কারিগরি বিভাগের প্রধান ছিলেন কল্পকৌশলের (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সাবেক ও বর্তমান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন) ওগমেন্টেড রিয়ালিটি শাখার প্রশিক্ষক ও ইউআইটিএসের সিএসই বিভাগের প্রভাষক এন এস এম রেজাউর রহমান। তাঁদের মাধ্যমে অ্যাপসের ডিজাইন করা হলো। অ্যাপস তৈরি করে এটির মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর প্রতিক্রিয়া জানা—সব কিছু মিলিয়ে দেড় বছর লাগল। পরে পূর্ণাঙ্গ অ্যাপস তৈরি করা হলো। নাম রাখা হলো ‘বর্ণখেলা’।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে ‘বর্ণখেলা’ পরামর্শের জন্য প্রেরণ করা হলো। তিনি ও তাঁর স্ত্রী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক বর্ণখেলার খুব প্রশংসা করলেন।

রওশনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বললেন, ‘পাঠ্য বইয়ে এই সর্বাধুনিক ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির সংযোজন আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রযুক্তির মাধ্যমে সুস্থ বিনোদন প্রদান করবে। তাদের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পথ তৈরি করবে।’ তিনিই অ্যাপসের উদ্বোধন করেছেন।

সেই অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম সভাপতি ছিলেন, ‘এটুআই’র নীতিবিষয়ক পরামর্শক আনীর চৌধুরী, উদ্ভাবন বিভাগের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন।

এটি গুগল প্লে স্টোরে ‘ইড়ত্হড়শযবষধ’ রওশন নামে আছে। পরিচয় লেখা আছে ‘এডুকেশনাল’ অ্যাপস। চাইলে ডাউনলোড করতে পারেন।

বর্ণখেলার এ সাফল্য রিমঝিমকে এত উদ্দীপ্ত করেছে যে তিনি মানুষ ও কম্পিউটারের মিথস্ত্রিয়া নিয়ে উচ্চতর লেখাপড়া ও গবেষণা করতে চান। সে জন্য প্রয়োজনে বিদেশেও যাবেন। ফিরে এসে এই দেশের কম্পিউটার শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করবেন।



মন্তব্য