kalerkantho


ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে

‘সৌহার্দ্য’ নামের একটি সংগঠন ঢাকার পথশিশুদের ইফতার, ঈদের খাবার ও পোশাক বিলিয়ে যাচ্ছে। এবার এক লাখ ৪০ হাজার টাকার দ্রব্য ও পোশাক বিলিয়েছেন তাঁরা। জামিল মাহমুদকে সেই গল্পই নিজের মুখে বললেন সমন্বয়কারী জুবায়ের খান। ছবি তুলেছেন নাদিম চৌধুরী

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে, বান্ধবীকে নিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে অথবা ফাঁকা ক্যাম্পাসে বসে ঈদের খুশি কাটাই অনেকে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই এমন অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছেন, যাঁরা নিজেদের ঈদ অপরের জন্য উৎসর্গ করেন। পথশিশুদের ঈদের পোশাক বিতরণ করেন, অসহায়কে ইফতারি উপহার দেন, ঈদের খাবারও জোগাড় করেন চেয়ে-চিন্তে। এসব মানুষের মহৎ উদ্যোগগুলো নিয়ে বরাবরের মতো এবারের ঈদ আয়োজন

প্রতিদিন ক্লাস শেষে অথবা ক্লাসের বিরতিতে ঢাকার ধানমণ্ডি লেকে আড্ডা জমাই আমরা। আমি জুবায়ের খান, বন্ধু—বি এম মারজান, মামুন অর রশীদ, সালাহ উদ্দিন, ফারহানা নাজনীন, প্রশান্ত কুমার শীল ও শ্রাবণী রায় এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। সবাই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ডিআইইউ) পড়ি। পড়ার বিষয় সিএসই (কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং)। এখন আমরা অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রী। এই আড্ডার শুরু থেকেই দেখেছি, যখন গল্প করছি, কোনো না কোনো ছেলে অথবা মেয়ে কিছু সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে আছে—‘ভাইয়া, দুইডা ট্যাকা দিবেন? কিছু কিন্না খামু।’ কারো খালি গা, কারো গায়ে শতচ্ছিন্ন পোশাক। কারো পায়েই জুতা-স্যান্ডেল নেই। যতই বলি এখন নয়, পরে আসো—ওরা যায় না। কেউ কেউ আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। তখন সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে যায়। বুঝতে পারি, পেটে তার দানাপানি কিছুই পড়েনি। কোনো কোনো সময় কারো সঙ্গে গল্প করে আমাদেরই কোনো বন্ধু। ঈদের আগে আগে রোজার সময় আমরা জিজ্ঞেসও করেছি, ঈদে কী কিনছ? ‘খাওনেরই ট্যাকা নাই, আবার জামাকাপড় কিনমু!’ এই উত্তর শুনেই আমাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়। অথচ ধানমণ্ডি এলাকা শপিং মলে ভর্তি। হাজার হাজার ব্যাগ নিয়ে ছুটে চলা মানুষ দেখি আশপাশে। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই এই বয়সের ছেলে-মেয়েরা আছে। এই ছিন্নমূল অসহায় শিশুদের জন্য কি তাঁদের কিছু করতে মন চায় না? এমন অনেক প্রশ্ন আসে আমাদের মনে, আলাপও করি। তাদের পরিবারের গল্পগুলো আমাদের কষ্ট দেয়। কারো বাবা নেই। কারো মা নেই। কেউ কেউ মাকে সারা দিনেও দেখে না। রাতে অনেক বাড়িতে কাজ সেরে তিনি ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরেন। এই শিশুরাই, তাদের অন্তত একটি দিনের খুশিই আমাদের এক করে দিল। শুরুটি করেছিলাম আজ থেকে তিন বছর আগে। সেই দিনটির কথা আজও ভুলিনি—২০১৫ সালের ৬ জুলাই। তখনো রমজানই ছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে ৫০টি পথে বড় হওয়া শিশুর মধ্যে ফ্রক-প্যান্ট ইত্যাদি বিতরণ করেছিলাম। এরপর ১৭ জুন ফেসবুকে একটি পেজ চালু করলাম। সেটির নাম দিলাম ‘সৌহার্দ্য’। আমাদের স্লোগান—‘ভালোবেসে পাশে দাঁড়াই’। সেখানে ঈদের পোশাক বিতরণের খবর লিখে ছবিগুলো পোস্ট দিলাম। বন্ধু থেকে বন্ধুর পোস্টে ছবিগুলো শেয়ার হতে লাগল। ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার মধ্যেই সৌহার্দ্যের কথা ছড়িয়ে গেল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে, বিদেশ থেকেও অনেকে আমাদের ছবিতে লাইক দিলেন, কমেন্ট করলেন। ছবিগুলো নিজেদের টাইমলাইনে শেয়ার দিলেন। অনেকে জানালেন আমাদের সহযোগিতা করবেন, অনেকে সদস্য হিসেবেই কাজ করতে আগ্রহী হলেন। ফলে দিন দিন সৌহার্দ্যের কর্মী বাড়ছে। এখন আমরা আছি মোট ৫০ জন।

তিন বছর ধরে নিয়মিতই আমাদের ঈদের পোশাক বিতরণ কর্মসূচি চলছে। নিজেদের মা-বাবা, চাচা-খালু, পাড়ার পরিচিতজন, বন্ধু ইত্যাদি যার কাছেই সম্ভব আমরা আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত বাড়াই। আমাদের মোটেও লজ্জা নেই। আমরা তো নিজের জন্য কিছু চাইছি না, মানুষের উপকার করব বলে মানুষের পাশে মানুষকে দাঁড়াতে বলছি। ফলে সাহায্যের পরিমাণও দিন দিন বেড়েছে। যেমন—২০১৬ সালে আমরা মোট ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলাম। সেই টাকায় ৮০টি শিশুর মুখে ঈদের হাসি ফুটিয়েছি। পাশাপাশি তাদের ঈদের দিন খাওয়ার জন্য দিয়েছি সেমাই, নুডলস। মেয়েরা ঈদের সময় মেহেদি দিতে খুব ভালোবাসে বলে তাদের মেহেদিও দিয়েছি। গত বছর ৭০ হাজার টাকা জমেছে সৌহার্দ্যের ঈদ ফান্ডে। সেই টাকায়ও ঈদের পোশাক ও উপকরণ বিলানো হয়েছে। আর এ বছর আমরা এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছি। এবার বিরাট আকারে—প্রায় ২০০ ছেলে-মেয়েকে ঈদের খুশিতে ভাসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে আমাদের। প্রতিবারের মতো ঢাকার রায়ের বাজার বস্তি, আশপাশের দরিদ্র মানুষের এলাকা ও ধানমণ্ডি লেকে গিয়ে আমরা পোশাক বিতরণের আগে সত্যিকারের গরিব ছেলে-মেয়েদের খুঁজে বের করে তালিকা করেছি। অন্য সব জায়গার মতো এবারও ধানমণ্ডি লেক থেকে ৩৫টি শিশুর পোশাকের মাপ সংগ্রহ করেছি। ১ জুন নিউ মার্কেটসহ আশপাশের মার্কেট থেকে শার্ট-প্যান্ট, টি-শার্ট, গেঞ্জি, মেয়েদের জন্য সালোয়ার-কামিজ, মেহেদি কেনা হয়েছে।

একটি টাকাও হিসাবের বাইরে খরচ করার কোনো জো নেই। আমরা সব হিসাবের তালিকা সংগ্রহে রাখি। সেমাই, নুডলসের পাশাপাশি ইফতারসামগ্রীও কিনেছি। আমাদের এই বিরাট কর্মযজ্ঞ রোজার তিন-চার মাস আগে থেকেই শুরু করতে হয়। আশপাশের বস্তি এলাকাগুলো, রাজপথে ঢু মারতে হয়, ছিন্নমূল শিশুদের আবাস, তাদের নাম-ঠিকানা টুকে রাখতে হয়। দোকানে দোকানে পোশাকের খবর নেওয়ার জন্য দৌড়াতে হয়। তবে সবচেয়ে কষ্ট হয় টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে। একের পর এক পোস্টে শেয়ার দিতে হয়। আমরা লিখি—‘একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য একজন অভিভাবক খুঁজছি। যার কিছু টাকার বিনিময়ে ঈদের হাসি ফুটবে একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মাঝে। সঙ্গে সেই অভিভাবক পাবেন শিশুটির হাসিমাখা ছবি, তার পূর্ণ তথ্য, তাকে লেখা শিশুটির চিঠি, তিনি তার সঙ্গে দেখাও করতে পারবেন। তা ছাড়া তিনি আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হবেন, আমাদের নানা খবরের আপডেট পাবেন।’ এত কষ্টের পর যখন একটি শিশুর মুখে ঈদের হাসি দেখতে পাই, আমরা সব কষ্ট ভুলে যাই। যেমন এবারের ঈদে পোশাক পেয়েছে আলো আক্তার। ঈদের জামা পেয়ে লাজুক মেয়েটি কথাই বলতে পারছিল না। শুধু বলল, ‘আমার তো বাপ নাই, মার সঙ্গে পলিথিনের ছাপরার ঘরে থাকি। ঈদের জামা পাই না। আমাগো জুবায়ের ভাই ও তার বন্ধুরা জামা দিয়েছে।’ আমার সঙ্গে অনেকে আছে। তাদেরই একজন তানিমুল ইসলাম। ওর ডাকনাম ফুয়াদ। দুই বছর ধরে সৌহার্দ্যের সঙ্গী তিনি। কেন আছেন—এই প্রশ্নটি যখন করি, অন্য সবার মতো তাঁর মুখেও একই উত্তর পাই—‘ওদের মাঝে ঈদের খুশি বিলিয়ে দিতে পারি বলে। এই কাজগুলো করে খুব খুশি হই, ভালো লাগে।’ বিপাশা আজিজ বললেন, ‘ওরা যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। তারা এতিম সন্তান, কারো মা-বাবা কেউই নেই। ঈদের পোশাক দেওয়ার মতো বা চাওয়ার মতো মানুষ নেই বলে পুরনো পোশাক পরেই তারা ঘুরে বেড়ায়। নতুন জামা পেয়ে তারা খুশিতে ফেটে পড়ে। এই হাসি তাদের জীবনটাকে আরো রঙিন করে, তারা সামনের দিকে এগিয়ে চলে।’ এবার আমরা একা নই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আনোয়ার খান নার্সিং কলেজ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা সিটি কলেজ ও বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ রাইফেলস কলেজের ১১০ জন শিক্ষার্থী সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা আমাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শরিক হয়েছেন, আর্থিক অনুদান দিয়েছেন, সংগ্রহ অভিযান থেকে শুরু করে সব কিছুতেই ছিলেন। আমরা বিভিন্ন ইভেন্ট ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াই। তাছাড়াও পথশিশুদের শিক্ষার আলো দেই। আমাদের ওয়েবসাইট লিংক—www.souhardo.org। যে কোনো সহযোগিতা বা প্রয়োজনে ফোন করতে পারেন—০১৭২৫২৫৮৩২৪।

 



মন্তব্য