kalerkantho

আহারে জীবন

ক্যাম্পাসের বন্ধু, শিক্ষক, অসাধারণ পরিবেশ চিরকাল মনে থেকে যায়। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ‘১৩ ব্যাচ’ তাদের র‌্যাগ উৎসব সেভাবেই করল। তাতে সবার অংশগ্রহণ ছিল। র‌্যাগ ঘুরে লিখেছেন স্বপ্নীল মাহফুজ

২৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আহারে জীবন

কালচারাল নাইটে গাইছেন ‘কুয়েট ১৩ ব্যাচ’র ছাত্রীরা

কুয়েটে প্রথম ভর্তি হওয়ার দিনটিকে ‘এন্ট্রান্স ডে’ বলা হয়। ১৩ ব্যাচের ‘এন্ট্রান্স ডে’ ছিল ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল। চার বছর পর র‌্যাগ ডে উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিতে হয়। র‌্যাগের আয়োজন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তামজিদ রহমান অরণ্যর ফোনকলের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শরফুদ্দিন আহমেদ খান শোয়েবকে ফোন করে সব অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতিদের মিটিং ডাকলেন। অনেক আলোচনাও হলো। তারপর থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শোয়েব, রেজাউল হক শিমুল, যন্ত্রকৌশলের ফুয়াদ হাসান, আসিলুল কামাল ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (সিএসসি) অরণ্য কাজ শুরু করে দিলেন। খান জাহান আলী হলের ৩০১ নম্বর রুমে পুরো ব্যাচের ছাত্রদের গড়া ব্যান্ড ‘সিজি ফোর’ প্র্যাকটিস শুরু করে দিল। আস্তে আস্তে অনেকে এই প্রস্তুতিতে যুক্ত হলেন। ৩০১ নম্বর রুমটিকে র‌্যাগের কেন্দ্রীয় অফিস হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো। ১৩ ব্যাচের গ্রুপ পেজ খোলা হলো ফেসবুকে। সেখানে অনেক লাইক, কমেন্টের মাধ্যমে ভোটাভুটি শেষে র‌্যাগের স্লোগান ঠিক হলো—‘অদ্বৈত ১৩’। ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি র‌্যাগ পালন করা হবে। শেষ দিন ওপেন এয়ার কনসার্ট থাকবে। তবে তত দিনেও স্পন্সর জোগাড় হলো না। ব্যাচের অনেকে অনেক আইডিয়া, উদ্যোগ নিয়ে নানাভাবে চেষ্টা করেও টাকা জোগাড় করতে পারলেন না। হতাশায় ‘স্পন্সর নাই’ নামের গান লিখে ক্যাম্পাসের আড্ডায় গাওয়া শুরু হলো। সে গানের লাইনগুলো এখনো অনেকের মনে পড়ে—‘একটু এদিক-ওদিক ঘুরলাম আমরা/কারণ সিজি নাই/এদিক-ওদিক র‌্যাগের লাইগা ফাল পারি/কারণ স্পন্সর নাই।’ উপায় না পেয়ে সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে চাঁদা, টি-শার্ট বিক্রি, ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপন ইত্যাদির ভরসায় এগোনো শুরু হলো। তবে তাঁদের জন্য আশার খবর ছিল—কালের কণ্ঠ মিডিয়া পার্টনার হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। ‘র‌্যাগ লোডিং, অদ্বৈত ১৩ লোডিং’ নামের বিরাট লোগোর কাউন্ট ডাউন বোর্ড ক্যাম্পাসে জ্বলতে শুরু করল। রাতের আঁধারে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীরা ঝলমলে লোগোটি দেখে মুগ্ধ হন।

র‌্যাগে নাচ-গানের কালচারাল নাইট, গিটার বাদনের অ্যাকুস্টিক নাইটের রিহার্সাল শুরু হলো। সে আয়োজনে ৭০ জন অংশগ্রহণকারী নাম লেখালেন! অ্যাকুস্টিক নাইটে ২৫টি গান গাওয়া হবে। কিন্তু সব আয়োজনের জন্য প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ড. সোবহান মিয়ার সাহায্যে উপাচার্য ড. আলমগীরের অনুমতির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগ সাহায্য করল। তাঁদের নিয়ে ড. এম এ রশীদ হলের পাশে কুয়েটের প্রথম র‌্যাগ ওয়াল তৈরি করা হলো। সেখানে ১৩ ব্যাচের র‌্যাগের উৎসবের লোগোসহ গ্রাফিতি আঁকা হবে।

র‌্যাগের এই আয়োজনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শোয়েব ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (আইইএম) রুদ্রনীল সিংহ শুভ। তাঁরা পুরো খুলনা শহরে র‌্যাগের টি-শার্ট নিয়ে পোস্টারিং করেছেন, তাঁরা শহর ঘুরে ঘুরে টি-শার্ট বিক্রি করে র‌্যাগ খরচের বেশ খানিকটা জোগাড় করে দিলেন। তারপর ‘অদ্বৈত ১৩’ নামে র‌্যাগের ইউটিউব চ্যানেল খোলা হলো। যোগাযোগের পর মেকানিকস, আর্টসেল, চিরকুটও কনসার্টে গাইতে রাজি হলো।

১০ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো ব্যাচের কারোর দম ফেলার সময় নেই। কেউ র‌্যাগের দেয়াল রং করতে ব্যস্ত, কেউ ফ্ল্যাশ মবের মহড়ায়, কেউ নাচ-গানের প্রস্তুতিতে, কেউ স্টেজ সাজাতে। আলপনা আঁকায় মেয়েদের ছেলেরাও সাহায্য করছে। রাত ১২টায় কাউন্ট ডাউনের পর আকাশে ১৩টি আতশবাজি ফুটল। শুরু হলো র‌্যাগ উৎসব।

১১ ফেব্রুয়ারি আবীর মাখামাখিতে ১৩ ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের চেহারা পাল্টে  গেল! সবার সাদা টি-শার্টে বন্ধুরা স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা বাক্য লিখে দিলেন। একজনেরটিতে লেখা—‘খুব কষ্ট  পেয়েছি।’ তবে কী কষ্ট, কেন কষ্ট পেয়েছেন ব্যাখ্যা নেই! মোহাম্মদ মামুন, ফারিয়া আমিন ও তুষার মজুমদারের নেতৃত্বে ফ্ল্যাশ মব দেখে সবাই খুব খুশি হলেন। তারপর ১৮টি ট্রাকে চড়ে পুরো শহরে র‌্যাগের খুশি ছড়িয়ে দিতে বেরোলেন তাঁরা। এই অংশটি টাকার অভাবে বাদ পড়ত, কিন্তু জুনিয়ররা ছাড়ছিল না আর যন্ত্রকৌশলের অধ্যাপক গোলাম কাদের একটা ট্রাকর‌্যালি খুব করে চাইছিলেন। তিনি কম টাকায় ট্রাকগুলো ভাড়া করে দিলেন। ছেলে-মেয়েরা ট্রাকে ঘুরছেন, পুরো শহরের মানুষ দুই পাশে দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন। ক্যাম্পাসে ফিরে কালার ফেস্টে একজন অন্যজনকে ধরে ধরে রং মাখালেন। সেই সন্ধ্যায় ১৩ ব্যাচের সব গায়ক মঞ্চে উঠলেন। মাউথ অর্গান, বাঁশি, সেতার, কাহনের পাশাপাশি ড্রামস, পিয়ানো, গিটার সুরের মায়া ছড়িয়েছে। চেনা গান, নিজেদের গানও গেয়েছেন তাঁরা। গান শুনে মুগ্ধ তড়িৎ কৌশলের ১৫ ব্যাচের ছাত্রী সাপ্পানা সিদ্দিকা রোদেলা বলেই ফেললেন, ‘আত্মার সঙ্গে মিশে যাওয়া এক উৎসব দেখছি।’ রাতভর ৩০টি গান গাওয়ার পর চির বিদায়ের শেষ গান—‘ভালো আছি, ভালো থেকো’ শুনতে শুনতে মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা মেলালেন সবাই, অনেকের চোখে তখন পানি। 

পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙল অনেকের। তার পরও ক্যাম্পাসে এসে ঘুরে বেড়ালেন। বন্ধুদের সঙ্গে চার বছরের স্মৃতি বিনিময় হলো। সেই সন্ধ্যায় প্রেমিকাদের ‘কাপল ডান্স’, নৃত্যশিল্পীদের ক্লাসিক্যাল ডান্সসহ নানা ধরনের নাচ হলো। নাচতে পারেন না এমন অনেকেও মঞ্চে উঠে গেলেন! কয়েকটি নাটিকা হলো। সিএসসি ১৫ ব্যাচের সাদিয়া আফরীন বললেন, ‘ক্যাম্পাসে অনেক অনুষ্ঠান দেখেছি, কিন্তু এটিই সেরা।’ শেষ দিন সন্ধ্যায় মঞ্চে উঠল কুয়েটের ‘ভার্টিগো’, এরপর ‘কেজি’। ১৩ ব্যাচের সিজি ফোরের গায়করা গাইতে গাইতে নিজেরাও কেঁদে ফেললেন। মেকানিকস, আর্টসেলের পর ব্যান্ডদল চিরকুটের ‘আহা রে জীবন’ দিয়ে শেষ হলো মহাযজ্ঞ।



মন্তব্য