kalerkantho


প্রেম গেল বই এলো

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রেম গেল বই এলো

বই পড়ার নেশা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি অন্যদের মধ্যে

‘মিঞা শোভনের পাঠশালা’ নামে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি চালু করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাজ্জাদুল ইসলাম মিঞা শোভন। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এটির সদস্য এক হাজার ৩০০’র বেশি। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। ছবি তুলেছেন ফারিয়া ফারজানা

 

ভালো নাম সাজ্জাদুল ইসলাম মিঞা হলেও এখন তাঁকে সবাই ‘মিঞা শোভন’ নামেই চেনেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির জনক। বইয়ের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসার শুরু হঠাৎ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির পরপরই একটি মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার বছর দুয়েক পর ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিডিং ক্লাব’-এর সদস্য হলেন। সেই সভাগুলোতে বই পড়ার উপকারিতা, ছাত্রের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ হতো। সেই থেকেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা। এদিকে নিশ্চিত জীবনের প্রত্যাশা করা প্রেমিকা তাঁর বই নিয়ে পড়ে থাকা মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি তাঁকে বারবার চাকরির প্রস্তুতি নিতে তাগাদা দিতে লাগলেন। তবে বইপ্রেমী শোভন সেদিকে যেতে চাইছিলেন না। ফলে একসময় দুজনের আড়ি হয়ে গেল। কিন্তু বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল।

২০১৫ সালে ঠিক করলেন, সারা বছরে ৫০০ বই পড়ে ফেলবেন। প্রতিটি বই পড়ার পর সেটির নম্বর ফেসবুকে পোস্ট করতেন। কত বই পড়া বাকি আছে, তা-ও জানাতেন। তখন দিনভর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বইয়ের ভেতরে ডুবে থাকতেন। স্বাভাবিকভাবেই সারা বছরে অত বই পড়তে পারেননি, তবে ১০০টি পড়ে ফেলে ছিলেন। বছর শেষে পেছন ফিরে হিসাব করলেন, কেন ৫০০ বই পড়া হলো না? কারণটিও বের করলেন, বই পড়ে সেটি সম্পর্কে আলোচনা করার তো তাঁর কেউ নেই। ফলে বইয়ের আড্ডা, বই পড়ার আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ফেসবুকে সেটি নিয়ে পোস্টও দিলেন। সাড়া পেলেন দুজনের। একজন তাঁর কলেজের বন্ধু, অন্যজন ফেসবুক ফ্রেন্ড। এভাবেই শুরু হলো ‘মিঞা শোভনের পাঠশালা’। সাজ্জাদের ডাক নাম ‘শোভন’ আর ‘মিঞা’ তাঁদের বংশের পদবি। সেই দুই বন্ধু তাঁর পাঠশালার প্রথম সদস্য হলেন। ফি দিয়েছিলেন ৫০০ টাকা করে। আরো কিছু টাকা জমিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে ১২টি বই তিনি কিনলেন। সে খবর ফেসবুকে পোস্ট করার পর আরো মানুষের সাড়া পেলেন। ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রেমের মৃত্যু দিবসে মিঞা শোভনের পাঠশালার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। তখন তাঁর সংগ্রহে সদস্য ৩০, বই ১০০। শুরু হলো পাঠশালার কার্যক্রম। এখন পাঠশালায় দুটি বিভাগ আছে—‘খেয়া’ ও ‘কিশতি’। সাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি থেকে শুরু করে নানা স্বাদের বই আছে খেয়া বিভাগে। প্রতিটি বইয়ের দাম ৩০০ বা তার কম। ৩০০ টাকার বিনিময়ে যেকোনো আগ্রহী কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী খেয়ার সদস্য হতে পারেন। প্রতিটি বই ১০ টাকা ফি দিয়ে পড়তে পারেন। এখন খেয়ার সদস্য এক হাজার ৩২৫ জন। বই আছে দেড় হাজারেরও বেশি। কিশতিতে দর্শন, অর্থনীতি প্রভৃতি মননশীল বই আছে। এখানে ৫০০ টাকার সমান দামের বই রেখেছেন মিঞা শোভন। এর সদস্য ফি ৫০০ টাকা। প্রতিটি বই পড়ার ফি ২০ টাকা। এখন এই বিভাগের সদস্য সংখ্যা ১৭।

কিভাবে একে ছড়িয়ে দিচ্ছেন—এ প্রশ্নের জবাবে মিঞা শোভন বললেন, ‘শুরুর দিকে সদস্যদের হলগুলোতে গিয়ে বই দিয়ে আসতাম। সদস্যদের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে তাঁদের বই পড়াতে আগ্রহী করে তুলতাম। এভাবে অনেক দিন চলেছে। এরপর বই নিয়ে বসা শুরু করলাম, যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক ছাত্র-ছাত্রীরাও এই পাঠশালার বইগুলো পড়তে পারেন। সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সিঁড়িতে শনি থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা আর টিএসসিতে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১০টি বই নিয়ে বসে পড়ি। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত থাকি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে। এভাবেই ২০১৬ সালের শুরু থেকে বছর শেষে হাজার ছাড়িয়ে গেছে আমার বইবন্ধু। আমার সদস্যদের মধ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদারও আছেন।’ তিনি আরো জানালেন, প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার সারা দিন বইয়ের ডালা নিয়ে থাকেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেও তিনি এই বই পড়ার কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে চান। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা? মিঞা শোভন জানালেন, সামনের বছরের মধ্যে পাঠশালার সদস্য সংখ্যা পাঁচ হাজার করে ফেলতে চান। বইয়ের রিভিউ, আলোচনা ইত্যাদি নিয়ে একটি ইউটিউব চ্যানেলও করার ইচ্ছা তাঁর।

 



মন্তব্য