kalerkantho


বই নিকুঞ্জে ১২ প্রজাপতি

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বই নিকুঞ্জে ১২ প্রজাপতি

শিশু-কিশোরদের আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এই লাইব্রেরি অনেক কিছু করে

কোচিংয়ের ফাঁকা ঘরে ১২ বন্ধু মিলে শুরু করলেন একটি লাইব্রেরি। তাঁদের চাঁদায় এখনো চলে সেই পাঠাগার। মূলত শিশু-কিশোরদেরই বই পড়ান তাঁরা। করেন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। ভ্রাম্যমাণ বই বিতরণ কর্মসূচিও শুরু করেছেন। চট্টগ্রামের এই তরুণদের নিয়ে লিখেছেন রবিউল হোসাইন। ছবি তুলেছেন হাসান রুবেল

 

প্রথম সভাটি হয়েছিল ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন ছাত্র। তাঁদের মধ্যে ফয়সাল কবির, তানভীরুল ইসলাম, আবদুর রহমান, আবদুল করিম ও মাকসুদুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। আবদুর রব মহসিন কলেজ, সাইফুল ইসলাম ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ, মাহবুব কবির এমইএস কলেজ, কাজী রাফসান, আবু জাহেদ আইইউএসসি’র (ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগাং) ছাত্র। সালাউদ্দিন আহমেদ চাকরি করেন। তাঁদের নিয়ে চার বছর ধরে একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম বর্ষের ছাত্র তাওহীদ-আল-ইসলাম পাটওয়ারী। সবার সঙ্গে তিনি আলাপ করলেন। এরপর ঠিক হলো, প্রত্যেকে মাসে ১০০ টাকা করে চাঁদা দেবেন। সেই টাকায় কেনা হলো হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’, আনিসুল হকের ‘মা’, অ্যাডলফ হিটলারের ‘মাইন ক্যাম্ফ’, এ পি জে আব্দুল কালামের ‘উইংস অব ফায়ার’-এর অনুবাদ। শিশুদের জন্য কেনা হলো বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘সেরা ভূতের গল্প’ ও ‘খেলার ছলে বিজ্ঞান’। সেগুলো দিয়েই চালু হলো ‘প্রজাপতি বই নিকুঞ্জ’। প্রথমে এটি ছিল চট্টগ্রামের হালিশহরের এফ ব্লকে, বন্ধু সাইফুলের কোচিং সেন্টারের ছেড়ে দেওয়া একটি রুমে।

টানা দুই বছর এখানেই চলেছে লাইব্রেরি, কোনো ভাড়া দিতে হয়নি। পরিচিত ও আশপাশের এলাকার মানুষই প্রথম দিকে বই পড়তে আসতেন। সপ্তাহখানেকের জন্য তাঁরা বই ভাড়া নিয়ে যেতে পারতেন। সময়মতো ফেরত না দিলে তাঁকে ফোন করে ফেরত দেওয়ার তাগাদা দেওয়া হতো। ১২ বন্ধু মিলেই লাইব্রেরির দেখাশোনা করতেন। সারা দিন তাঁদের ক্লাস বা অন্য কাজ থাকত বলে ‘প্রজাপতি বই নিকুঞ্জ’ সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকত।

কিছুদিনের মধ্যে লাইব্রেরি গুছিয়ে শিশুদের মধ্যে একে পরিচিত করতে প্রচারণায় নামলেন তাঁরা। আশপাশের এলাকার অভিভাবকদের লাইব্রেরি সম্পর্কে জানালেন, স্কুলগুলোতে গেলেন, কোচিংগুলোতেও প্রচারণা চলল। ফলে অভিভাবকরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের বইয়ের ভুবনে আনতে শুরু করলেন। তাঁরাও বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে আসতে লাগল। আস্তে আস্তে বইয়ের সংখ্যাও বাড়তে লাগল। দ্বিতীয় মাসে সবার চাঁদার টাকায় তাঁরা নতুন আরো ১৬টি বই কিনলেন। কখনো কোনো পাঠক এসে কোনো বই খুঁজলে পরে সেটি কিনে নিয়েছেন, মাস শেষে সবাই মিলে টাকা দিয়ে আরো বই কিনেছেন। এভাবেই লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে।

বই কিনতে গিয়ে অনেক স্মৃতিও তাঁদের ঝুলিতে জমেছে। এক সন্ধ্যায় একজন এসে বললেন, কিছু বই বিক্রি করবেন। সেগুলো কেনার জন্য তাওহীদ ও সাইফুল হালিশহরের রামপুরে চলে গেলেন। দেখেশুনে বই কিনতে কিনতে রাত সাড়ে ১০টা বেজে গেল। প্রায় অচেনা এলাকা থেকে রওনা দিলেন দুজনে। এরপর তো আর পথ চিনতে পারেন না। বইয়ের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক ঘুরে রাস্তার মোড়ে এসে মানুষকে জিজ্ঞেস করে, গুগল ম্যাপে খুঁজে, বিশ্বরোড এসে পৌঁছলেন। রিকশায় চড়ে যখন তাঁরা লাইব্রেরিতে পৌঁছলেন, তখন রাত সাড়ে ১২টা। এভাবে এত কষ্ট করে গড়া এই লাইব্রেরিতে শিশু-কিশোরদের জন্য আছে প্রায় ২০০ বই, গল্প-উপন্যাস-কবিতা মিলিয়ে আছে এক হাজার ২০০-এরও বেশি বই। লাইব্রেরির নামও ছড়িয়েছে। আগে যাঁরা লাইব্রেরিতে এসে ‘এখন আর কেউ পড়ে নাকি, এখন তো ডিজিটাল যুগ; এসব কাণ্ড অল্প বয়সী ছেলেদের খেয়াল, কয়দিন পরে আর থাকবে না’—বলে হাসতেন, তাঁরাই এখন নিয়মিত পড়তে আসেন।

ফেসবুকে লাইব্রেরিটির কথা জেনে কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি জামাল উদ্দিন মিন্টুর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম চার আসনের এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার উপস্থিতিতে ১০০ বই উপহার দেওয়া হয়েছে। তাঁর সংগঠন সিএফএমএফ (কানাডিয়ান ফার্স্ট মাল্টিকালচারাল ফাউন্ডেশন) গরিব মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে, শিক্ষার আলো দেয়।

বইয়ের সংখ্যা ও পাঠক সদস্য বাড়তে থাকায় লাইব্রেরি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে হালিশহর এ-ব্লক, সাত নম্বর লেনের বাদামতলীতে চলে এলো। এখানে তিনটি রুমে আছে ‘প্রজাপতি বই নিকুঞ্জ’। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। বই পড়ার জন্য আছে বেঞ্চ, প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শিশুদের ছবি আঁকার ক্লাস হয়। তাদের আঁকা শেখানোর বিনিময়ে কিছু টাকা-পয়সা আসে, বাকি ভাড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা চাঁদা তুলে শোধ করেন।

আগের মতো এখানেও বসে বই পড়তে কোনো ফি দিতে হয় না। টালি খাতায় নাম, ফোন নম্বর লিখে পড়তে বসে যান বইপ্রেমীরা। চাইলে ২০০ টাকা দিয়ে লাইব্রেরি কার্ডও করতে পারেন। ফলে সপ্তাহখানেকের জন্য বই বাসায় নিয়ে যাওয়া যায়। নিয়মিত পাঠক হতে প্রাথমিকের ছেলে-মেয়েদের ১০ টাকা, মাধ্যমিকের ২০ টাকা, তারচেয়ে ওপরের ক্লাসের বা বেশি বয়সের মানুষের জন্য মাসিক ফি ৩০ টাকা। বাসায় নিয়ে বই নষ্ট করলে লাইব্রেরি কার্ড থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। লাইব্রেরিটি দেখাশোনা করেন সেই পুরনো ১২ বন্ধুই। প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার তাঁরা সভা করেন। তখন বই সংরক্ষণ, পাঠকের সুবিধা-অসুবিধা, জমা-খরচের হিসাব, অফিস ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজ ভাগ করে নেন। সারা মাস সেই কাজগুলো করেন।

তিন রুমের প্রজাপতি বই নিকুঞ্জের প্রথম রুমে তিনটি লম্বা টেবিল, তিনটি বেঞ্চ আছে। পেছনে বই রাখা আছে। পরের রুমের আলমারিতে শিশু-কিশোর গ্রন্থ, বড়দের গল্প-উপন্যাস আছে। কিছুদিন আগে তাঁরা আরো চারটি আলমারি বানিয়েছেন। সেগুলোও বই দিয়ে সাজিয়ে চালু করা হয়েছে। সর্বশেষ রুমে আর্ট স্কুল, শিশুদের খেলার জন্য শিশু কর্নার আছে। তাওহীদ বললেন, ‘আমাদের লাইব্রেরিতে এখন সপ্তাহে গড়ে ৬০ জন পাঠক আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেক শিশু-কিশোর পাঠকও আছে। তারা মা-বাবাকে নিয়ে আসে। এই লাইব্রেরিটি প্রধানত তাদের জন্যই। বই পড়া ছাড়াও তাদের মনোবিকাশে আমরা নানা কার্যক্রম করি।’ ২০১৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৩১০ জন শিশু-কিশোরকে নিয়ে ‘প্রজাপতি বই নিকুঞ্জ’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন করা হয়েছে। আগের বারের মতো এবারও প্রতিযোগী সংগ্রহ করতে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্কুলে তাঁরা প্রচারণা চালিয়েছেন। সে বারের মতোই হালিশহরের এ-ব্লকের বহুরূপী খেলার মাঠে তাঁদের প্রতিযোগিতাটি দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলেছে। চিত্রাঙ্কন,  আবৃত্তি ও স্কুলভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়েছে। এবার ৭২টি স্কুলের ৪০০ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে। তাওহীদ বলেন, ‘এবার আমাদের এক লাখ ২১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ৪০ হাজার টাকা  আমরা সদস্যরা চাঁদা তুলে দিয়েছি, ২৬ হাজার টাকা গণ্যমান্য অতিথিরা আর বাকিটা ফরম বিক্রি থেকে এসেছে। এই আয়োজনের পর শহরের তিনটি স্থানে ২০-২২ ফেব্রুয়ারি আমরা বইমেলা করেছি।’ এই গল্প করতে করতে তিনি একটি নতুন স্বপ্নের কথা শোনালেন, “শিশুরা তো একা একা আসতে পারে না। মা-বাবা বা অন্য কারো হাত ধরে বই পড়তে আসে। তারা যেন বাসায় বসে বই পড়তে পারে সে জন্য আমরা একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বানিয়েছি। এ জন্য ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমরা চাঁদা তুলে ৩৮ হাজার টাকা দিয়েছি। এ কে এইচ গ্রুপের চট্টগ্রাম জোনের প্রধান আবু ইউসুফ বাকি সাত হাজার টাকা দিয়েছেন। এই ভ্যানে এক হাজার বই থাকবে। সেগুলো হালিশহরের বিভিন্ন ব্লকের আবাসিক বাড়িগুলোতে গিয়ে সদস্য কার্ডধারী শিশুদের বাসায় বই পৌঁছে দেবে। এরই মধ্যে এ, বি ও আই ব্লকে আমরা বই বিতরণ শুরু করেছি। কিছুদিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ব্লকে কার্যক্রমটি শুরু করব। তবে আমাদের আরো অনেক বই প্রয়োজন। লাইব্রেরিতে মাত্র ২০০ বই আছে। সেগুলো ভ্যানে চলে গেলে লাইব্রেরি বই শূণ্য হয়ে যাবে। ফলে বই প্রয়োজন। আমাদের বই পাঠানোর ঠিকানা : প্রজাপতি বই নিকুঞ্জ, এ-ব্লক, সাত নম্বর লেন, বাদামতলী, হালিশহর, চট্টগ্রাম।’ প্রয়োজনে বই পাঠাতে পারেন—০১৬২০৯১৬৬৪৩ ও ০১৮৫৪৫৮৬৬৫২ নম্বরে ফোন করে।” আলমারি বইয়ে ভর্তি করতে হবে। কেন টিউশনি, পকেট খরচ থেকে লাইব্রেরি চালাচ্ছেন? তিনি বললেন, ‘ছয় বছর আগে একটি ১৪ বছরের কিশোরকে তার বন্ধুরা চুরির দায়ে মেরে ফেলেছে, এমন একটি ঘটনা শুনে আমি ও আমার বন্ধু বইয়ের আলো ছড়াবো বলে ভেবেছিলাম। আমরা চেয়েছি—এমন দৃশ্য আর ঘটবে না। পাড়ার মোড়ে আড্ডা না দিয়ে ওরা বই পড়বে, আলোকিত হবে।’



মন্তব্য