kalerkantho


সাক্ষাৎকার

‘মানবিক হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য’

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘মানবিক হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য’

ছবি ফারহান তানভীর

দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ নটর ডেম কলেজ। কলেজটির সাফল্য ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিওর সঙ্গে কথা বলেছেন জুবায়ের আহম্মেদ

 

নটর ডেম কলেজ বাংলাদেশের সেরা কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর সেরা হয়ে ওঠার পেছনের কারণ কী?

নটর ডেম কলেজ ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা হলি ক্রস সম্প্রদায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। এখানে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠার শিক্ষা লাভ করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ অবধি আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পেরেছি। কলেজটিতে যে লেখাপড়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার মূল্যবোধও শিক্ষা দেওয়া হয়—জনগণের ভেতর সে আস্থাও তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনে যাতে দক্ষ ও মানবসম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে এবং শিক্ষার উচ্চতর ধাপে পৌঁছে যেন ভালো ফল করতে পারে এটাও আমাদের লক্ষ্য। আর এই আস্থাটুকু নটর ডেম কলেজ অর্জন করতে পেরেছে গত ৬৮ বছরে।

শিক্ষক, পাঠদান পদ্ধতির কতটা ডিজিটালাইজেশন হয়েছে?

সবার জন্যই মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ব্যবস্থা রয়েছে। ল্যাবগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করা হয়। আমরা সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম, বিভিন্ন সেমিনারেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকি।

আপনাদের কলেজের মূল বিশেষত্ব কী?

সার্বিকভাবে মানবিক হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের এখানে নিয়মিত ক্লাস হয়। এ ছাড়া দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষা দান, কুইজ, ল্যাব ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম (এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটি) অন্যান্য কলেজ থেকে আমাদের ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

আমরা নানা ধরনের কলেজের কথা শুনি। কোথাও হয়তো খুব কড়াকড়ি। কোথাও শিক্ষাপদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আাাছে। আপনার মতে, একটি আদর্শ কলেজের কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত?

একটি কলেজে যখন একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তখন তার বয়স হয় ১৬ বছর। এটা তাদের টিনএজ সময়। সমবয়সীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার একটা ইচ্ছা তাদের মধ্যে কাজ করে এবং অনেকটা স্বাধীনচেতা হয় তারা। কলেজে তাদের স্বাধীনতা দেওয়া হবে, সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে স্বাধীনতাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করে নিজেকে গঠনে কাজ করতে পারে। একটু ধৈর্য ধরে তাদের আদর-স্নেহ দিয়ে  কলেজজীবনটা পার করে দিতে হয়।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এখানে?

আমরা শ্রেণিভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকি। আমাদের কলেজে ২৪টি ক্লাব রয়েছে। একজন ছাত্র এক বা একাধিক ক্লাবে যুক্ত হতে পারে। ক্লাবের মাধ্যমে অনেক সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করে। এতে তারা দক্ষ, পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান হয়ে উঠে এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ হয়। মানবিকবোধের বিকাশ হয়, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। নিজেদের গুণাবলি ব্যবহার করে যথেষ্ট বিকাশ লাভ করতে পারে তারা।

উন্নত বিশ্বের কলেজগুলোর সঙ্গে আমাদের কলেজগুলোর পড়ালেখার পার্থক্য কী?

আমরা লক্ষ্য করেছি, আমাদের অনেক ছেলে বিদেশে পড়াশোনা করতে যায়। ওখানে তারা ভালো ফল করছে। কেউ বলে না যে কঠিন লাগে। আমাদের দেশ যেহেতু উন্নত নয়, সেহেতু আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাটাই পার্থক্য। অথচ আমাদের ছেলে-মেয়েরা খুব পরিশ্রমী। তারা লেখাপড়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করে। বিদেশে হয়তো এত বেশি পরিশ্রম করতে হয় না। যে দেশে যায় তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে; যেমন ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা কম, লাইব্রেরি সুবিধা, ইন্টারনেট সুবিধা অনেক বেশি। এদিকে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে আমি মনে করি, আমাদের কলেজের যেসব ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছে তারা যথেষ্ট ভালো করছে। আমেরিকা থেকে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাদাররা এসে আমাদের নটর ডেম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরাই প্রথম এখানে শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা যে নীতি ও দর্শন দিয়ে কলেজ শুরু করেছিলেন আমরা এখনো একই দর্শন দ্বারাই পরিচালিত। হলি ক্রস যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক সংঘ তারা সারা বিশ্বে একই নীতি, দর্শন নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকে। আমাদের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এসে আনন্দ নিয়ে শিক্ষালাভ করতে পারে। তাদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়; পাশাপাশি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়া হয়।

কলেজ ঘিরে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

নটর ডেম কলেজে বর্তমানে সাড়ে ছয় হাজার ছাত্র রয়েছে। আমাদের মান, ঐতিহ্য ও সুনাম অবশ্যই ধরে রাখতে চাই। এর জন্য শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা আগের তুলনা কমিয়ে এনেছি এবং আরো কমিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান সহজ হবে। আমাদের শৃঙ্খলার যে ঐতিহ্য রয়েছে তা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। কিভাবে ছাত্রদের আরো সুশৃঙ্খল করা যায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখব। অভিভাবকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ভালো করতে চাই। কলেজে একটি নতুন ভবন করা হচ্ছে, যেখানে ল্যাবসুবিধা আরো ভালো হবে। একটি বড় ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং প্রয়োজন। প্রতিবছর অন্তত দুটি করে ট্রেনিং যাতে হয়, সে ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষ করে সমসাময়িক বিষয়, শিক্ষাপদ্ধতির ওপর সেমিনার করব, যাতে মানসম্মত শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারি। ইনডোর গেমের ব্যবস্থা করব। এখানে শিক্ষা সমাপ্ত করে পরবর্তী ধাপে ছাত্ররা যেন যোগ্যতার প্রমাণ রেখে ভালো জায়গায় ভর্তি হতে পারে—এটাও আমাদের বড় লক্ষ্য।

যারা নটর ডেমে পড়ার সুযোগ পায়নি তাদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতেন?

যারা নটর ডেমে পড়ার সুযোগ পায়নি কিন্তু স্বপ্ন দেখেছে, তাদের ক্যাম্পাসে জায়গা করে দিতে পারিনি বলে দুঃখিত। তাদের জন্য আমাদের হৃদয়ে জায়গা আছে। আমাদের সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমে তাদের আমন্ত্রণ জানাই এবং এতে তারা অংশগ্রহণ করলে খুবই খুশি হব।


মন্তব্য