kalerkantho


নাহিনের অবাক দুনিয়া

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নাহিনের অবাক দুনিয়া

ছবি: খায়রুল আলম

তার আঁকা ছবি দেখে প্রথিতযশা শিল্পীর মন্তব্য, এর ছবি দিয়েই তো সলো এক্সিবিশন করা যায়। ক্লাসিক্যাল নাচেও পারঙ্গম। আবৃত্তিতেও পটু। সপ্তম শ্রেণির জাওয়াত মো. নাহিনের গল্প শোনাচ্ছেন ফয়সল আবদুল্লাহ

 

২০০৭ সালের কথা। টুকটুক পায়ে মঞ্চে উঠেছে একটা ছেলে। বয়স মোটে তিন। মুখে আধো বোল। দর্শক সারিতে উত্সুক মা। ভয় পাচ্ছেন খুব। হাজারপাঁচেক দর্শক তো হবেই। এত লোক দেখে ভয় পেয়ে না আবার কান্নাকাটি জুড়ে দেয় ছেলেটা। ওমা! কী সুন্দর ‘মা গো ভাবনা কেন’ গানের তালে তালে নেচে ফেলল। একি কাণ্ড! সামনের সারিতে থাকা প্রতিমন্ত্রী (সাবেক) উঠে দাঁড়ালেন! এইটুকু ছেলের এমন নাচ দেখে কি আর মুগ্ধতা সামলানো যায়? উঠে গিয়ে সোজা কোলে তুলে নিলেন ছোট্ট নাহিনকে। অনুপ্রেরণার শুরু তখন থেকেই।

তিন বছর বয়সে তার হাতের তুলিটাও গেয়ে ওঠে তাথৈ। রঙেরা যেন হেসেখেলে গান গায় হাতে। শিল্পী মায়ের দেখাদেখি নাহিনও আঁকতে বসে যায় জলরঙে। খুব দ্রুত ধরে ফেলে আলো-ছায়ার কারসাজি আর বড় শিল্পীর মতো আঁকার টেকনিক। কোন রঙের সঙ্গে কোনটা মেশালে কী হবে, কোনটা হবে ছায়া আর কোনটা আলোর রং—এসবও বোঝে দারুণ। “একদিন ঢাকা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ ড. গোবিন্দ রায় তার আঁকা ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘ও এত ভালো আঁকে! ওর ছবি দিয়েই তো সলো এক্সিবিশন করা যায়।” চারুকলার শিক্ষক শিল্পী কামাল উদ্দিনও প্রশংসা করে বলেছিলেন, ওর কল্পনাশক্তি ভালো।” কথাগুলো জানালেন নাহিনের মা। মাঝেমধ্যে সুযোগ পেলেই তিনি ছেলেকে নিয়ে যান ছবি আঁকার ওয়ার্কশপে।

এমনিতে চুপচাপই থাকে নাহিন। অনুরোধ করলাম আবৃত্তি শোনাতে। বদলে গেল গলা। অপরিচিত পরিবেশেও যথেষ্ট সাবলীল, গলা একটুও কাঁপল না তার। জানা গেল, বাংলায় যেমন, ইংরেজি আবৃত্তিতেও তেমন দক্ষ। আর এ কৃতিত্বের দাবিদার একজনই—মা। তিনিই নাহিনকে শিখিয়েছেন আবৃত্তির অ আ ক খ।

আপাতত পছন্দের আবৃত্তিকার শিমুল মোস্তফার স্টাইলটা রপ্ত করার চেষ্টায় আছে। তবে নাচে গড়ে তুলেছে স্বকীয়তা। তাণ্ডবের পাশাপাশি লোকনৃত্যেও সাবলীল। তার নাচ দেখে খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী ও নাহিনের নাচের গুরু শিবলী মোহাম্মদ বলেছিলেন, ‘ওর মধ্যে যেটা দেখলাম, আমার কাছে মনে হলো ওটাই সঠিক। ওকে আমি কিছু চাপিয়ে দেব না।’ এখন বলতে গেলে বিটিভি, এটিএন বাংলার মতো বড় বড় চ্যানেলে নিয়মিত নাচের অনুষ্ঠানও করছে ও। নাচ ও আবৃত্তিতে একগাদা পুরস্কার পেলেও নাহিনের চিন্তা-ভাবনা বরাবরই চারুকারুতে। খুব বেশি প্রতিযোগিতায় অংশ না নিলেও গোটা পঞ্চাশেক পুরস্কার তো আছেই। তবে পুরস্কার নিয়ে মোটেও মাথাব্যথা নেই তার। কী আঁকতে ভালো লাগে? অনেকক্ষণ ভেবে বলল, ‘দুঃখী মানুষের কষ্ট আর প্রকৃতি।’

মাধ্যম হিসেবে জলরং সবার ওপরে থাকলেও মাঝেমধ্যে প্যাস্টেল আর অ্যাক্রিলিকেও হাত দেয়। মায়ের সঙ্গে বসেই চলে প্র্যাকটিস। ভুলভাল হলে শুধরে নিতে পারে। শেষের আগে ছোট্ট করে বলে রাখি, ২০১৫ সালে ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় একবছর হ্যালো বিডিতে খুদে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছে নাহিন।

 

নাহিনের অর্জন

২০১৪ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় নাচে মার্কস অলরাউন্ডার প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ হয়। ২০১৭ সালে জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতায় ছবি আঁকা, নাচ ও আবৃত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম। একই বছর জাতীয় সংস্কৃতি সপ্তাহেও নাচ ও আবৃত্তিতে প্রথম। ২০১৭ সালে সিঙ্গার আয়োজিত ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় প্রথম। ২০১৮ সালের জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডে নাচ ও আবৃত্তিতে প্রথম। জাতীয় সংস্কৃতি সপ্তাহে নাচ ও আবৃত্তিতে প্রথম রাউন্ডে প্রথম।

 



মন্তব্য