kalerkantho


ভুলে ভরা গল্প

ভালোবাসা কিভাবে বিশ্বাসে গড়ায়, বিয়ে হয়; আবার ভেঙে যায় সেই গল্পই শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল-মামদূহ

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একই বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী তাঁরা, পড়েনও এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। জুঁই দ্বিতীয় বর্ষ, রফিক অনার্স ফাইনাল দিয়ে চাকরি করেন। পরিচিত বন্ধুদের দেখে ফেসবুকে বন্ধু হলেন তাঁরা। টুকটাক আলাপ চলতে লাগল। অনেকদিন আলাপের পর একদিন দেখা করতে চাইলেন রফিক। তবে মানুষটিকে বুঝে উঠতে পারেননি বলে রাজি হলেন না জুঁই। তার পরও রফিকের জোরাজুরিতে দেখা হলো মিনিট কয়েকের জন্য। চা খেয়ে, সামান্য হাই-হ্যালোর পরে যে যার মতো চলে গেলেন। তবে তার আগেই রফিক কথা আদায় করেছেন, সামনের শনিবার একসঙ্গে বেড়াবেন, খাবেন। ‘না’ করতে পারলেন না জুঁই। ব্যস্ততায় দেখা হলো না সেদিন। এরপর হঠাৎ একদিন জুঁইকে চমকে দিয়ে হলের গেটে চলে এলেন রফিক। ফোন পেয়ে নিচে নেমে দেখেন, ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, ‘অফিসে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখতে মন চাইল, চলে এলাম।’ অবাক হলেও জুঁই খুব খুশি হলেন। সেদিন বিকেলে তাঁকে আরো অবাক করে দিয়ে রফিক আবার এলেন। দুজনের কথা হলো। এর পর থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দেখা করতেন রফিক। সারা দিন ফোন করে লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়ার খবর নিতেন। ফলে বিশ্বাস জন্মাতে লাগল জুঁইয়ের মনে।

কয়েক দিন পরে হঠাৎ করেই ফেসবুকে দুজনের সম্পর্কের স্ট্যাস্টাস দিয়ে বসলেন রফিক। খুশি খুশি গলায় জুঁই জিজ্ঞেস করলেন, ‘সারা জীবন পাশে থাকবে?’ ‘নিশ্চয়ই’—রফিকের উত্তর। কালো, ছোটখাটো মেয়েটির মধ্যেও আশা জাগছে—‘সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, নিশ্চয়ই পাশে থাকবে।’ লেখাপড়া, পরীক্ষার চাপে হঠাৎ অসুস্থ প্রেমিকাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন তিনি। প্রেসার কমে যাওয়ায় অজ্ঞান প্রেমিকার পাশে বসে তাঁর সে কী কান্না। জলভরা চোখ খুলে ছেলেকে দেখে প্রেম আর বাঁধ মানল না মেয়েটির। সেই থেকে টানা দুই বছর ক্যাম্পাসের অলিগলি, রাজপথ আর চায়ের দোকানগুলোতে চুটিয়ে গল্প করেছেন তাঁরা, ভালোবাসার জাল বুনেছেন। মেয়েটির বাড়িতেও তত দিনে খবর পৌঁছে গেছে। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলেটিকে পছন্দ হয়েছে?’ ‘হ্যাঁ, মা।’ ‘তোকে বিয়ে করবে?’ জিজ্ঞাসার পর রফিকও রাজি। ‘তাহলে ক্যারিয়ার গড়ে তোরা বিয়ে করিস’—আশ্বস্ত মা বুদ্ধি দিলেন। সেটিই মেনে নিলেন রফিক। কিন্তু ছোটখাটো নানা অসুবিধার পর তাঁর মনে হলো—‘ইচ্ছা করেই হয়তো তাঁরা মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইছেন না।’ তত দিনে বোনকে তাঁদের পছন্দের পাত্রের হাতে তুলে দিতে চেষ্টা শুরু করলেন ভাইয়েরা। প্রেমের বিয়ে তাঁরা মানবেন না। বাড়িতে গেলে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবেন বলে ভয়ও পাচ্ছিলেন জুঁই। ছুটিতে হল বন্ধ হয়ে গেছে, বাড়ি যেতে হবে। চরম সংকটের সেই পরিস্থিতিতে দুজন রফিকের দুই বন্ধুকে সাক্ষী রেখে কোর্ট ম্যারেজ করলেন। আজও দিনটি মনে আছে জুঁইয়ের—২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর।

বিয়ে করে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলেন জুঁই। তবে তার পর থেকেই কর্তৃত্ব করতে শুরু করলেন স্বামী। যেকোনো কিছুতে জোর খাটাতে লাগলেন। ঝগড়া এত চরমে উঠল যে বিয়ে না করলেই ভালো হতো বলে মনে হলো দুজনের। মনোরোগবিদ্যা বিশেষজ্ঞের কাছেও গেলেন। বিয়েকে গুরুত্ব না দিয়ে বন্ধুত্বের দিকেই খেয়াল রাখুন—এই পরামর্শ মেনে ফিরে আসার পরও লেগে যেত কারণে-অকারণে। এত দিনের প্রেমিকা, স্ত্রীকে গায়ের রং, চেহারা, উচ্চতা নিয়েও বলতে ছাড়েননি রফিক। আরো আলগা হয়ে গেল বাঁধন।

ব্লক করা পুরনো বান্ধবীর দিকে ঝুঁকে পড়লেন স্বামী। স্ত্রী দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে তুমুল বাদানুবাদ করলেন।  এরপর নানা কারণে ধীরে ধীরে তাঁদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্বামীর যেকোনো কিছুই খারাপ চোখে দেখতে লাগলেন স্ত্রী। অবশেষে স্বামী জানালেন, ‘এই সম্পর্কের কোনো মানে নেই, শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো।’ তবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে চোখের পানিতে অন্তত একটিবারের জন্য হলেও দেখা করে বিষয়টি নিয়ে আলাপের জন্য বললেন স্ত্রী। তবে তাঁকে গলানো গেল না। হলের সামনে ঠায় দাঁড়িয়েও স্বামীকে বাইরে বের করতে পারলেন না। আস্তে আস্তে বিষয়টি অনেকের জানা হলো। ফলে মাসখানেক পর স্বামী নিজেই দেখা করে বললেন—‘তুমি সবার কাছে আমাকে অপমানিত করেছ, যেসব কথা শুনেছ, দেখেছ, সেগুলো বন্ধুত্ব বাদে আর কিছু নয়, কোনো পাপ করিনি। এসব না বুঝলে তো সংসার করা অসম্ভব।’ একেবারে ভেঙে পড়া মেয়ের অবস্থা জেনে মা বললেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি, ওর সঙ্গে আর থাকবি না।’ ফলে ফোন করা বন্ধ করে দিলেন তিনি। এবার বিপরীত দিক থেকে ফোন আসা শুরু হলো। তবে কয়েক দিন পর এক সিনিয়র বান্ধবী জানালেন, আরো একজনের সঙ্গে এরই মধ্যে সম্পর্কে জড়িয়েছে ও। স্ত্রীকে নিয়ে দোটানায় আছে। জুঁইয়ের এক ক্লাসমেটকে কয়েক দিন পর রফিক জানালেন, ‘আমাদের সম্পর্ক চুকে গেছে।’ ফলে ‘আর নয়’—সিদ্ধান্ত নিলেন জুঁই। বলেও দিলেন, ‘দোটানার কিছু নেই। ওকে নিয়েই থাকো। আমি চলে যাচ্ছি।’ ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর আরো বদলে গেলেন রফিক। স্ট্যাটাসের সঙ্গে মেলে না বলে স্ত্রীকে এড়াতে লাগলেন। ফলে ছাড়াছাড়ির সিদ্ধান্ত দ্রুত এগিয়ে এলো। জুঁইয়ের মাস্টার্স পরীক্ষা, থিসিস জমা দিয়ে এ বছরের ২৯ জানুয়ারি বিয়েবিচ্ছেদ হয়ে গেল। জুঁই এখন একটি অনলাইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ভালো চাকরির জন্য দাঁতে দাঁত চেপে পরীক্ষা দিচ্ছেন। কোনো পুরুষকেই তাঁর আর বিশ্বাস হয় না।

(এটি একটি সত্য কাহিনি, পাত্র-পাত্রী, বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম গোপন রইল)


মন্তব্য