kalerkantho

বনে-বিলে

লাউয়াছড়া, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল ও সুন্দরবন ঘুরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের পাঁচ গবেষক ও শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে করা সেই সফরের গল্প শোনাচ্ছেন আদীব মুমিন আরিফ

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোর্সটি ছিল তিন ক্রেডিটের, নাম ‘ট্রপিক্যাল ফিল্ড বায়োলজি’ (ক্রান্তীয় অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে জীববিদ্যা)। পুরোপুরি ব্যবহারিক কোর্সটিতে এ দেশের বিভিন্ন বন ঘুরলেন যুক্তরাষ্ট্রের তিন শিক্ষার্থী, ভারতের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতিবিষয়ক এক আলোকচিত্রী এবং বাংলাদেশের একজন ছাত্র। তাঁদের মধ্যে ক্যামল ডেসিসিসটো বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টিগ্রেটেড বায়োলজি’ বা ‘সমন্বিত জীববিদ্যা’ বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষে, মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের ডেল্টা স্টেট ইউনিভার্সিটির জীববিদ্যার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জেমস অ্যালেন ও ইউনিভার্সিটি অব মাইনের ‘ওয়াইল্ড লাইফ ইকোলজি’র তত্ত্বীয় বর্ষে পড়েন স্টিভ ভেইন। ভারত থেকে এসেছিলেন ঈশান রঘুনন্দন। তিনি বন্য প্রাণী বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী। তাঁর সঙ্গে তাঁর বাবা সাবেক যুগ্ম সচিব আর টি রঘুনন্দনও বাংলাদেশের প্রাণিবৈচিত্র্য দেখতে এসেছিলেন। দলটির একমাত্র বাংলাদেশি তানভীর আহমেদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র এবং ‘ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন বাংলাদেশ’-এর ‘স্লো লরিস রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন (লজ্জাবতী বানর গবেষণা ও সংরক্ষণ)’ প্রকল্পের সহকারী গবেষক। ক্যামল ও তানভীর এই গবেষণার জন্য ‘ফিল্ড প্রজেক্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামের আন্তর্জাতিক সংস্থার বৃত্তি পেয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। বাকিরা নিজ খরচে এসেছেন। দলের সমন্বয়কারী ছিলেন ডেল্টা স্টেট ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এইচ এম আলী রেজা। বাংলাদেশে তাঁদের সমন্বয়কারী ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান।

গবেষণাটি ছিল ১২ দিনের। গত বছরের ১১ থেকে ২২ ডিসেম্বর তাঁরা শিক্ষা সফর করেছেন সিলেটে ও সুন্দরবনে। ফিল্ড স্টাডির শুরুটি হয়েছিল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। ১১ ডিসেম্বর বিকেলের ম্লান আলোয় বনের পথে পা বাড়ালেন। বনে তখন পাখিদের কিচিরমিচিরে কান পাতা দায়। ওরা নীড়ে ফিরছে। সন্ধ্যায় কীট-পতঙ্গরা খাবারের খোঁজে বেরোতে শুরু করল। গাছের আড়ালে ডেকে উঠল লক্ষ্মী প্যাঁচা। গাঢ় অন্ধকার নেমে আসছে বনে। ক্যামেরা ও টর্চলাইট নিয়ে নিশাচর প্রাণীদের আবাস, তাদের জীবনযাপন দেখতে চললেন তাঁরা। কয়েক জায়গায় ক্যামেরা ট্র্যাপিং করলেন।

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত বনটি নিয়ে বলতে গিয়ে স্টিভ বললেন, “লাউয়াছড়ার প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য দেখার জন্য দুই দিন ছিলাম। খুব ভোরেই হনুমানের দল কচি পাতা খেতে বেরিয়ে পড়ে। দুপুর পর্যন্ত গাছে গাছে খাবারের খোঁজে ঘোরে। এরপর বিশ্রামে চলে যায়। বেলা বাড়তে থাকলে বানরের পালের আনাগোনা বাড়ে। হনুমানরা গাছের ওপরের দিকে থাকে, কচি পাতা খেয়ে বাঁচে। বানর থাকে মাঝারি উচ্চতায়। প্রায়ই খাবারের খোঁজে নিচের দিকের ডাল ও মাটিতে নেমে পড়ে। সব ধরনের পাতা ও গাছের ফল খেয়ে বাঁচে। আমাদের জীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রাণীদের বাসস্থান ও খাবারের এই ভিন্নতাকে ‘বাসস্থান বিভাজন’ বলা হয়। এভাবেই এক বনে নানা ধরনের প্রাণী পাশাপাশি বাস করে, পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকে।” তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘উল্টোলেজি বানরের দলপতির লেজ অন্যদের চেয়ে ওপরের দিকে বেশি বাঁকানো থাকে। ফলে সে পুরো দলের ওপর অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।’ ক্যামল ডেসিসটো জানালেন, ‘এখানে ঘুরে আমাদের মনে হয়েছে, বনটির ঘনত্ব মোটামুটি। বড় বড় গাছের নিচে ছোট ছোট গাছ জন্মে বেশ জঙ্গলের মতো তৈরি হয়েছে। প্রচুর ফলের গাছ আছে। এগুলোই এখানকার প্রাণী ও পাখিদের প্রধান খাবার। ডুমুরগাছ বেশি, বানর ও অনেক প্রজাতির পাখির ডুমুরের ফল প্রধান খাদ্য। বনে অনেক উঁচু-নিচু টিলা আছে। বনটিও অনেক বড়। ফলে নানা ধরনের প্রাণী এখানে বেঁচে আছে।’

কোনো খারাপ দিক চোখে পড়েছে—এই কথার উত্তরে ক্যামল জানালেন, ‘দুঃখজনক হলেও বনের মাঝ দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। রেলের শব্দে প্রাণীদের জীবনযাপন স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত হয়। এ ছাড়া রেললাইনের দুই ধারের বড় গাছগুলো কেটে ফেলায় গিবনের (উল্লুক) বাসস্থান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে তাঁরা দেখেছেন বন্য শূকর, শিয়ালের পাল ও বাকিং ডিয়ার খাবারের খোঁজে বেরিয়েছে।

১৩ ডিসেম্বর ওই দল চলে গেল বাইক্কা বিলে। ১০০ হেক্টরের বিলটি মত্স্যসম্পদের অভয়াশ্রম। আড়, কই, মেনি, ফলি, পাবদাসহ আরো অনেক দেশি মাছ এখানে বংশ বৃদ্ধি করে পুরো হাওরে ছড়িয়ে পড়ে। পাখিরা এসব মাছ খেয়ে বাঁচে। ঈশান রঘুনন্দন বললেন, ‘জলপিপি, ডাহুক, ছোট সরালি, বক, মাছরাঙাসহ নানা প্রজাতির হাঁস চোখে পড়েছে। আমরা জেনেছি, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাখি বাইক্কা বিলেই আছে। তবে কুড়া ইগল দেখাটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে এটি বিপন্ন। বিলটি মাছের পাশাপাশি পাখিদেরও অভয়ারণ্য। বিলটি আশপাশের মানুষের দ্বারা সামাজিকভাবে পরিচালিত হয়। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের সব নদী, খাল শুকিয়ে গেলেও এখানে পানি থাকে।’ তারপর তাঁরা গেলেন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। তানভীর বললেন, ‘আমাদের সব সংরক্ষিত বনের মধ্যে এখানেই লজ্জাবতী বানর বেশি আছে। এটি নিশাচর, রাতের আঁধারে চলাফেরা করে, খায়। খাদ্য বলতে পোকা-মাকড়, ফল, ঝিগাগাছের গাম। এ ছাড়া বড় বড় বাগডাশ, গন্ধগোকুল দেখেছি। বন হিসেবে এটি খুব ছোট হলেও গাছের ঘনত্ব অনেক বলে এটি জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ। তবে পর্যটকদের অতিরিক্ত চলাচলে বনের প্রাণী ও তাদের বাসস্থানের ক্ষতি হচ্ছে।’

তাঁদের শেষ গন্তব্য ছিল বিশ্বখ্যাত সুন্দরবন। ড. আলী রেজা বললেন, ‘যেকোনো গবেষকের জন্য সুন্দরবন অসাধারণ গবেষণাস্থল। তবে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন পয়েন্টে প্রাণীগুলোকে খাবার দিচ্ছেন বলে ওরা মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, লোকালয়ে খাবারের খোঁজে যাবে। গভীর অরণ্যে চলাচলের বিশেষ নিয়ম করে দেওয়া প্রয়োজন। বনের ভেতর দিয়ে কোনোভাবেই জাহাজ চলাফেরা করতে দেওয়া উচিত নয়। এতে বনের পরিবেশ নষ্ট হয়।’

ড. কামরুল হাসান জানালেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীসম্পদ নিয়ে বিদেশ থেকে আরো গবেষক আসবেন। এই দলটি এ দেশের নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা নিয়ে খুব খুশি। তাদের পরামর্শগুলো বিবেচনা করলে এই সম্পদের আরো উন্নয়ন হবে।’



মন্তব্য