kalerkantho


ইউডার লাইফ সায়েন্স

ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) লাইফ সায়েন্স অনুষদে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে, কৃতী ছাত্র-ছাত্রীরা নানা দেশে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা করছেন। অনেক দেশের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন। অনেক শিক্ষাবৃত্তিও আছে। লিখেছেন রক্তিম রেজা

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘২০০২ সালের সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) লাইফ সায়েন্স অনুষদের শুরু। ফার্মাসি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও মলিকুলার মেডিসিন অ্যান্ড বায়োইনফরমেটিকস—এই তিনটি বিভাগ থেকে ৪০টি ব্যাচে তিন হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর করেছে। তাদের অনেকে ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছে। সাড়ে তিন শ গবেষক হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, এমআইটিসহ বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। অনুষদের ৬২ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী ফলাফলের ওপর শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছে।’ বললেন, লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন, বিখ্যাত গবেষক ড. মুহাম্মাদ রহমতুল্লাহ। গুগল স্কলারে তাঁর ১০ হাজারের বেশি সাইটেশন আছে। ফার্মাসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামসুল হক বললেন, “ট্যাবলেট, ক্যাপসুল তৈরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভেটেরিনারি ফার্মাসি, অলটারনেটিভ অ্যাডভান্স মেডিসিন, বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি, কম্পিটিশন বায়োটেকনোলজি কোর্সের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের সাবেক ছাত্র নুরন্নবী হার্ভার্ডে, জেহদীন যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ, শাহাদাত ব্রিটেনের নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। বিখ্যাত জার্নাল নেচার-এ তসলিমের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিন-চারজন সাবেক ছাত্র বতসোয়ানায় ওষুধ কম্পানি খুলেছে।” বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়্যারমান অধ্যাপক রওনাক জাহান বললেন, ‘আমাদের পাস করা ৩০০ ছাত্র-ছাত্রী বিদেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আরিফ দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা লাভ করে সে দেশ থেকে পিএইচডি করে হার্ভার্ড ও এমআইটিতে পোস্ট ডক্টরেট করছে। শফিউল আজম চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সে, ওয়াহিদ মোজাম্মেল জার্মানির উর্জবার্গ ইউনিভার্সিটিতে, আমিনুল নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব বার্জেনে পোস্ট ডক্টরাল করছে। ১৫-২০ জন সুইডেনের আপসালাহ ইউনিভার্সিটিতে, পাঁচ-ছয়জন সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে।’ অনুষদের ডিন জানালেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থী, অধ্যাপকদের ৫৫০-এর বেশি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁরা ৫০টি দেশের ২৫০টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। আর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রেকর্ড নেই।’ সহকারী অধ্যাপক সাইয়্যেদা সিরাজের ৬০টির বেশি প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা হয়েছে। ‘অ্যাবসট্রাকটিং বডি পাবমেট’-এ অনুষদের অধ্যাপক-শিক্ষার্থীদের ৭৩টি আর্টিক্যাল অ্যাবসট্রাকটেড হয়েছে। স্কোপাস তাদের ২৮২টি আর্টিক্যাল অ্যাবসট্রাকট করেছে। মানসম্পন্ন বলে এখানে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভারত শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভুটান, রাশিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়ামসহ নানা দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা এই অনুষদে পড়ছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ট্রান্সপোর্টেশন, থাইল্যান্ডের ওয়ালাইলাক, জাপানের টোকিও, টয়োমা ইউনিভার্সিটি, রাইকেন প্লান্ট সায়েন্স সেন্টার, কিও ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস, ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ, ইতালির ইউনিভার্সিটা পলিটেকনিকা দেলেমার্চ, যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি, কম্বোডিয়ার পুঁথিশাস্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে বড় মলিকুলার বায়োলজি প্রতিষ্ঠান প্রমেগার সঙ্গে লাইফ সায়েন্স অনুষদের যৌথ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও অনুষদে নানা বিষয়ে গবেষণা চলছে। মাটি থেকে আর্সেনিক, বোরন, ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থ উদ্ভিদের সাহায্যে অপসারণ (ফাইটরিমিডিয়েশন) নিয়ে গবেষণা করে তাঁরা দেখেছেন, ব্রাসিকোসিক পরিবারভুক্ত বৃক্ষ (ফুলকপি, বাঁধাকপি) মাটি থেকে আর্সেনিক গ্রহণ করে। আর্সেনিকযুক্ত এলাকার এসব সবজি খেলে শরীরে আর্সেনিক ঢোকে। সরিষার পাতায় আর্সেনিক থাকলেও বীজে থাকে না বলে এসব এলাকার মাটি থেকে আর্সেনিক অপসারণের জন্য সরিষা বোনা কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। তাঁরা আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব জানতে আর্সেনিকপ্রবণ বাগেরহাট ও আর্সেনিকবিহীন ফরিদপুরে জরিপ চালিয়ে দেখেছেন, বাগেরহাটে আর্সেনিকের প্রকোপে চার গর্ভবতীর একজনেরই গর্ভপাত হয়। জন্মের পরপরই নবজাতকের মৃত্যুও বেশি ঘটে, শিশুদের বিকাশ কম হয়। বাগেরহাটে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে ফরিদপুরের ছেলে-মেয়েদের চেয়ে বেশি সময় নেয়। আর্সেনিক বুদ্ধিমত্তা কমিয়ে দেয়। শরীরে অস্বাভাবিক মাত্রায় আর্সেনিক প্রবেশে ডায়াবেটিস হয়। এ রোগের ওষুধগুলোরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। দীর্ঘ মেয়াদে ওষুধ খেলে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। তারা অ্যান্টিডায়াবেটিক, অ্যানালজেসিক প্লান্ট নিয়ে গবেষণায় দেখেছেন, কলার খোসা রক্তে শর্করা কমায়। নানা অঞ্চলের কলার নানা গুণ। তাঁরা কলা ও আমের গুণ নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণার মাধ্যমে তাঁরা জেনেছেন, ধানের তুষের নির্যাস বার্ড ফ্লু ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। ক্রোমিয়াম গবেষণায় তাঁরা দেখেছেন, ঢাকার ট্যানারি এলাকার মাটিতে এটির উপস্থিতি অনেক। স্বাভাবিক মাটিতে ক্রোমিয়ামের অনুপাত ১০ লাখে ২০ শতাংশ হলেও হাজারীবাগের ট্যানারি এলাকায় এর অনুপাত এক হাজার ৯০০ শতাংশ। মাটি থেকে ফাইটরিমিডিয়েশন প্রক্রিয়ায় ক্রোমিয়াম অপসারণের জন্য তাঁরা ‘বড়-চুচা’ (বৈজ্ঞানিক নাম সাইপোরাস ইরইয়া) নামের দেশীয় গাছ বোনার কথা বলছেন। এতে খরচও কম হবে। দক্ষিণাঞ্চলের মাটিতে অতিরিক্ত ‘বোরন’-এর উপস্থিতি পাকস্থলী, মস্তিষ্কের নানা রোগের কারণ। সেখানে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বোরনের উপস্থিতি কমানোর জন্য তাঁরা গবেষণা করছেন। এক শর বেশি নৃগোষ্ঠীর ৭০টির চিরায়ত চিকিত্সাপদ্ধতি নিয়েও তাঁরা গবেষণা করছেন। ৬৪ জেলার এক হাজার ৪০০ ভেষজ উদ্ভিদের আঞ্চলিক, বৈজ্ঞানিক নাম, পরিবার, গাছের কোন অংশ কী চিকিত্সায় ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর তালিকা করেছেন। শরীর ভালো রাখতে চিরতা, নিমের মতো কার্যকর বৃক্ষের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করছেন। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা দেশের ৩৪ শতাংশ মানুষ ভাতের পাশাপাশি কী খান, তা-ও তাঁদের গবেষণায় আসছে। দুর্ভিক্ষে মানুষ কোন কোন গাছ খায়, জানছেন। এ গাছগুলো ক্ষুধা কমানোর পাশাপাশি রোগের প্রতিষেধক। এ বিষয়ে এখানেই প্রথম গবেষণা হচ্ছে। তবে তাঁরা দেখেছেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা ক্যান্সার, ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক, পলি হার্বাল, মসলার ঔষধি গুণ নিয়ে গবেষণা করছেন। মসলার ঔষধি গুণ নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। এমন ছয়টি গবেষণার পেটেন্টের জন্য ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ সরকারের কাছে আবেদন করেছে।

লাইফ সায়েন্স অনুষদে মজার গবেষণাও হয়েছে। স্বল্প সময়ে খাবারের মাধ্যমে মুরগির ওজন বাড়ানো, তিতির ও ঘুঘুর প্রজননে তাঁরা সাফল্য পেয়েছেন। ঢাকার দক্ষিণ কোনাবাড়ির ডোবাগুলোতে দেশি কইয়ের পোনা উত্পাদন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তাঁরা প্রায় পাঁচ লাখ দেশি কইয়ের পোনা অবমুক্ত করেছেন। চিতল গবেষণায় পুকুরের মধ্যে জালে চিতলের পোনা রাখতেন। পুরো পুকুরে তেলাপিয়ার পোনা ছেড়ে দিতেন। ফলে তেলাপিয়ার পোনা ও ডিম খেয়ে এক একটি চিতল প্রথমে বছরে গড়ে ১.৮ কেজি, পরের বছর তিন কেজির ওপর হতো। তেলাপিয়ার খাদ্য ছিল শুকনো গোবর। এখনো কোনাবাড়ির জেলেরা এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করেন।



মন্তব্য