kalerkantho


বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পথে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী সাকিব মাহমুদ বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ ভারতের খারদুংলা পাস জয় করেছেন। তিনি সেই ভ্রমণের গল্প শোনাচ্ছেন

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পথে

গুগলে জেনেছিলাম, সাগরপৃষ্ঠ থেকে ১৮ হাজার ফুট ওপরে ভারতের খারদুংলা পাস বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সড়ক। সেটি জয় করার জন্য ১৯ জুন চট্টগ্রাম হয়ে বিমানে দিল্লিতে এলাম। সেখান থেকে বাসে শিমলা। অভিযানের সঙ্গী ভারতীয় সাইক্লিস্ট চন্দন বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা হলো। সব গুছিয়ে ২৪ জুন শিমলা থেকে সাইকেলে ভ্রমণ শুরু করলাম। রাতে ‘থিউগে’ নামে একটি রেস্ট হাউসের বাইরে তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে হলো। ম্যাগি স্যুপ রান্না করে খেলাম। বেশির ভাগ দিনই এটি খেয়ে কাটাতে হয়েছে। পরদিন নারকাণ্ড পেরোলাম। তার পর থেকে নিচের দিকে সাইকেল চালাতে হলো। আমি নিচের দিকে দ্রুত সাইকেল চালাতে পারি। এর মধ্যে মোবাইলের নেটওয়ার্ক কমে যাচ্ছে। ২৬ ও ২৭ জুন প্রবল বৃষ্টি তাঁবু থেকে বেরোতেই দিল না। ২৮ জুন কুমারিসান হয়ে রামপুরা, ২৯ জুন জিওরি হয়ে ওয়াংড়ু। শেষ রুটটিতে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে বলে ওপরের দিকেই উঠতে হলো। পাশে স্যাটলুজ নদীর খরস্রোতা কালো জল বইছে। তবে নিচে নামতে হলো ভাঙা পথ পেরিয়ে। ৩০ জুন ওয়াড়ু থেকে লিকংপিউ। এর মধ্যে হঠাত্ চন্দন এসে বলল, সে যেতে পারবে না। এদিকে ওর ভরসায় স্টোভ, তাঁবু—কোনোটিই আনিনি। এখন খাব কী? থাকব কোথায়? পকেটে সম্বল মোটে ১৬ হাজার রুপি! ফলে হিমাচল প্রদেশের কিন্নর হয়ে কাজাংকিবের জেলার ১০ দিনের সফর পিছিয়ে দিয়ে উল্টো দিকে দেড় শ কিলোমিটার পেরিয়ে ফের শিমলায় আসতে হলো। মানালির রুট পারমিট নিলাম। শুরু হলো মূল অভিযান। মাঝে সাইকেলের ক্যারিয়ার ভেঙে চাকার ওপর বসে গেল। চন্দনের টুলকিট দিয়ে সাইকেল সারালাম। আমার টুলকিটও নেই! ও নিজের পথে চলে গেল। নিচের দিকে নামতে নামতে ৪০ কিলোমিটার নিচে খাবারের দোকান দেখলাম। তখন রিকংপিউতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে, কম খরচের হোটেলও খুঁজে পাচ্ছি না। একজন বলল, রামপুরায় কম দামের হোটেল আছে। সেখানে রাত কাটিয়ে ২ জুলাই মানালির পথ ধরলাম। শিমলা ও মানালির মাঝে প্রথম পড়ল জলরি পাস। চারদিকে বরফ ও পাথরে ছাওয়া এই পাসের অনেকটা পথ সাইকেল কাঁধে নিয়ে হেঁটে যেতে হলো। সেদিন ওপরের দিকে ২৬ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়েছে। ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে বনের পাশে তাঁবু গেড়েছি। খাড়া পথে সাইকেল চালিয়ে বানাজার হয়ে অটোটানেল পেরোলাম। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে কুল্লু শহরে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা। ৪ জুলাই মানালিতে পৌঁছলাম। এটি খুব সুন্দর পথ। মাঝে সাইকেল সারাইয়ের জন্য দোকানে থামতে হলো। রাতে ধর্মশালায় থাকলাম। দাঁতে প্রবল ব্যথা উঠল বলে ৫, ৬ ও ৭ জুলাই বেরোতে পারলাম না। ধর্মশালায়ই ৩০ রুপিতে চন্দনের অপেক্ষায় কাটল। সে এলো না। ৯ জুলাই মানালি লেহ রোডে সাইকেল চালালাম। ৫২ কিলোমিটার রোটাংপাসে চলতে গিয়ে গরমে হাত পুড়ে গেল। পুরোটা পথ অক্সিজেনের অভাবে খাবি খেয়েছি। ১০ জুলাই প্রবল কুয়াশায় কুকসারের দিকে চললাম। পরদিন মেঘের ভেতর দিয়ে সাইকেল চালাতে হলো। রাতে সাগরপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ৫৮ ফুট ওপরের রোটাং পাসে পৌঁছে দেখি, অনেকে বরফের মধ্যে খেলছে। কুকসার ব্রিজে চন্দনের সঙ্গে দেখা হলো। দুজনে ঠাণ্ডা পানির স্রোতের ভেতর দিয়ে কুকসার নদী পেরোলাম। রাতটি তাঁবুতে কাটালাম। ১১ জুলাই থেকে মরুভূমির ফলে সবুজের দেখা পাওয়া কমতে লাগল। থান্ডিতে হঠাত্ ব্রেক ফেল করে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম। ১৩ জুলাই প্রবল শীত ও বৃষ্টি মাথায় ১৬ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বারালাচালা পাসে পৌঁছলাম। এরপর হিমাচলের শেষ অংশে উঁচু পথে সাইকেলযাত্রা শুরু হলো। প্রথম পাঁচ কিলোমিটার যেতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। আশপাশে মরুভূমি। পরের পাঁচ কিলোমিটার দেড় ঘণ্টায় উঠলাম। পানি নেই, গরম বাড়ছে। শরীর চলছে না বলে মুখে চকোলেট পুরলাম। নাখিলা পাসে উঠে কিছুক্ষণ জিরানোর পর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি, এক দোকানে আমার সেবা-শুশ্রূষা চলছে। ঠিকঠাক হয়ে সাইকেল নিয়ে বেরোলাম। তবে পাং গ্রামেও মাথা ও হাতের ব্যথায় ঘুম হলো না। পরে প্রবল বাতাস উপেক্ষা করে ১৭ হাজার ৫৮২ ফুট উঁচুতে টাগলাংলা পাস পেরোলাম। ৩৫ কিলোমিটার নিচে রুমসের দিকে চললাম। এর পরই জম্মু-কাশ্মীরের লেহ লাদাখ। ৭ আগস্ট লেহ থেকে ৪০ কিলোমিটার ওপরের খারদুংলা পাসের পথে চললাম। প্রথম ২০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা বলে অসুবিধা হলো না। বাকি খাড়া, মাটি, পাথরের পথ ও নালা পেরোতে গিয়ে জান বেরিয়ে গেল। তবে এক হাজার ১৫৭ কিলোমিটার পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেখি, আমার মতো অনেক অভিযাত্রী সেলফি তোলায় ব্যস্ত! এই অভিযানে যাবার জন্য আমাকে সহযোগিতা করেছেন মুসা ভাই, ফয়সাল আহমেদ, শিহাব ও তানভীর শাওন।
অনুুলিখন : রবিউল হোসেইন



মন্তব্য