kalerkantho


পড়ালেখার পদ্ধতি বদলে দেবেন সুমন

তাঁর বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটি (বিএসসি) ২১টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান জনপ্রিয় করতে ২৩টি অনুষ্ঠান করেছে। সুমন সাহাকে নিয়ে লিখেছেন মাহবুবর রহমান সুমন। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পড়ালেখার পদ্ধতি বদলে দেবেন সুমন

তখন মা-বাবার সঙ্গে খুলনা শহরে থাকেন সুমন সাহা। পড়েন সরকারি সুন্দরবন কলেজে। ‘ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড’-এর কথা জেনে তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মশালা ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হলেন। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ নেই বলে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হতে হলো তাঁকে।

ঢাকায় এসে দেখলেন, ঢাকার মতো সুযোগ মফস্বলের ছেলে-মেয়েরা পায় না বলে পিছিয়ে পড়ে। তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে ‘জিরো টু ইনফিনিটি’, ‘বিজ্ঞান স্কুল’, ‘বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি’, ‘বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চে’ স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কাজ করলেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ালেন। তাঁর এসব কাজের কথা জেনে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘বাংলাদেশ রিসোর্স ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ব্রিট)’ তাঁকে ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিল। দেশের সব বিভাগেই তাঁরা গিয়েছেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রজেক্ট বানিয়ে দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারের গল্প বলেছেন। ওরা বিজ্ঞান কিভাবে আমাদের আমূল পাল্টে দিতে পারে জেনেছে। ২০১৫ সালে অনার্স পাসের পর নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নামলেন তিনি।

সুমন চাইলেন, বিজ্ঞানকে তৃণমূল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় করবেন। মডেল বানিয়ে তারা, সূর্যসহ বিজ্ঞানের নানা বিষয় শেখাবেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নিল ‘বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটি (বিএসসি)’। শুরুতে তাঁর সঙ্গী ছিলেন মোট পাঁচজন। আড়াই বছরের মাথায় এখন তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন ৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭১ জন ছাত্র-ছাত্রী। সারা দেশের ২১টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চার হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তাঁরা ২৩টি অনুষ্ঠান করেছেন। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরিশালসহ ১৭টি জেলায় গেছেন। সুমন বললেন, ‘খেয়াল করে দেখেছি, যেসব স্কুল-কলেজে অনুষ্ঠান হয়েছে, সেগুলোতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়েছে। আমরা শিখেছি, বিজ্ঞানভীতি কাটানোর জন্য তাদের কাছে বিষয়টি মজা করে তুলে ধরতে হবে।’ এ ছাড়া বিএসসির আয়োজনে ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩টি বৈজ্ঞানিক কর্মশালা হয়েছে। সেগুলোতে দুই হাজার ৭০০ ছেলে-মেয়ে কম্পিউটার প্রগ্রামিং, রোবটিক, ড্রোন তৈরিসহ হাতে-কলমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শিখেছেন। ফলে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সুমন ও তাঁর সংগঠনের সুনাম ছড়িয়েছে। গেল বছর ফেসবুক ও প্রিকেল্ট ফাউন্ডেশনের যৌথভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বিশ্বের সেরা ১০০ সংগঠনের তালিকায় শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করা একমাত্র বাংলাদেশি সংগঠন ছিল ‘বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটি’। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের একটি মোবাইল সাইট বানিয়ে দিয়েছে—http://bss.molo.site। এটি এখন উন্নত করার কাজ চলছে। তাতে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের কোর্সগুলো সম্পর্কে যেমন মজার তথ্য থাকবে, তেমনি তরুণদের চাকরি ও বৃত্তির খবর থাকবে। শুধু নিজের প্রতিষ্ঠান গড়েননি তিনি, নানা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে, বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভাবনাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। জাপানভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘সায়েন্স ফোরাম টোয়েন্টিওয়ান’-এর বাংলাদেশ মিশনের ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে ‘আমরা বিজ্ঞানের বই পড়ি’ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ২০১৬ সালে তাঁরা জাপানের অর্থায়নে পাঁচ বিভাগের আটটি সুবিধাবঞ্চিত স্কুলে কার্যক্রমটি করেছেন। এ বছর আরো বড় পরিসরে প্রত্যন্ত স্কুলগুলোতে কাজটি করছেন। এ বছরের মার্চে তিনি ইয়ুথ কার্নিভালের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে ‘ইয়ুথ কার্নিভাল ২০১৭’ পরিচালনা করেছেন। এটি ১৪ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত হয়েছিল। তাঁরা ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা করেছেন।

বই-খাতা, স্কুল ব্যাগের গতানুগতিক শিক্ষা কার্যক্রমকে আধুনিক করতে চান সুমন। সে জন্য তিনি শিক্ষা মডেল বানিয়েছেন। কী আছে তাতে—এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘আমার এ মডেলে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ ৯০ ডলার দামের একটি নোটপ্যাড দেবে। সেখানে তার ক্লাসের সব বইয়ের পিডিএফ, টিউটরিয়ালের ভিডিও থাকবে। তার মেধা যাছাইয়ের জন্য পরীক্ষার ভিডিও থাকবে। সেগুলো স্কুলের ডাটা বেসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে বলে ছাত্র-ছাত্রীরা কোন বিষয় কেমন শিখছে, তা আপনাতেই স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারবে। ওরা নিজেরাই নির্দিষ্ট সময়ে কাজগুলো শেষ করবে। ফলে প্রাইভেট পড়তে হবে না, নকলও করতে হবে না। তারা স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা ও শিক্ষকদের খুঁটিনাটি প্রশ্ন করতে আসবে। এতে তাদের সৃজনশীলতা বাড়বে, গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমবে।’ এ শিক্ষা ধারণাটি তিনি নরওয়েভিত্তিক ইয়ুথ সাসটেইনেবল ইমপ্যাক্টের (ইএসআই) ‘এন্টারপ্রেনার ২৫ আন্ডার ২৫’ নামের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জমা দেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ ঘোষিত আটটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সারা বিশ্বের ১৬ থেকে ২৫ বছরের তরুণদের অভিনব পরিকল্পনাগুলো নিয়ে তারা এই প্রতিযোগিতাটি করে। এ বছরের এপ্রিলে অসলোতে চূড়ান্ত আসরে ১৭০টি দেশের ১০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সেরা ২৫ জনের একজন হয়েছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এমবিএর ছাত্র সুমন। এই পুরস্কারজয়ী তিনি প্রথম বাঙালি। তাঁর অসাধারণ উদ্যোগ নিয়ে বলতে তিনি তাদের কনফারেন্সে গিয়েছেন। সেখানে ৩০টির বেশি দেশের আবেদন যাছাইয়ের পর আয়োজকরা সিদ্ধান্ত নেন, আগামী বছর থেকে আরো পাঁচ দেশে প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করা হবে। পুরস্কারজয়ী ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য তরুণদের সাহায্য করা হবে। কানাডা, চীন, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশেও সেটি আয়োজনের সুযোগ তৈরি পেয়েছে। সামনের বছর থেকে ওয়াইএসআই বাংলাদেশের (YSI Bangladesh)কার্যক্রম শুরু হবে, তিনি প্রকল্পটির প্রধান থাকবেন।



মন্তব্য