kalerkantho


একটু-আধটু সিনেমা

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



একটু-আধটু সিনেমা

ফেব্রুয়ারিতে চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ আয়োজন করেছিল দশম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব। ‘ফ্রেমে ফ্রেমে আগামীর স্বপ্ন’ স্লোগান নিয়ে দেশের ১১টি ভেন্যুতে ৫৪টি দেশের দুই শতাধিক সিনেমা দেখানো হয়েছিল।

উৎসবে ছিল খুদে নির্মাতাদের নিয়ে প্রতিযোগিতাও। সেখানকার বিজয়ীদের গল্প জানাচ্ছেন আর আহমেদ রাজু

 

সান-মাফির ‘দ্য পাপেট শো’

অবস্থান : প্রথম

লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=UZryLqotgT4

এস এম রিয়াদ সান ও নাহিদ পারভেজ মাফি। দুই বন্ধু। একসঙ্গে ঢাকা বিএএফ শাহীন কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে দশম শ্রেণিতে পড়ে। প্রায়ই তারা মজার মজার ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে দিত। বন্ধু-বান্ধবরা দেখে বাহবা দিত। গল্পের আসরে, আড্ডার মাঠে সান আর মাফির ছবি নিয়েই কথা হতো বেশি। এভাবেই একটা কিছু করার স্বপ্নে গজিয়ে ওঠে ডালপালা। তাদের প্রচেষ্টা দেখে সানের বড় ভাই রিফাতও মুগ্ধ।

তিনিই তাদের শেখালেন সিনেমা বানানোর টুকিটাকি। এরপর আরো জাঁকালোভাবে চলে চেষ্টা। অল্প কিছুদিনের মধ্যে শিখে নেয় ক্লোজ শট, লং শট, প্যানিং আর এডিটিংয়ের জাদু। একদিন ইন্টারনেটে সান জানতে পারে, চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ দশম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছে। শিশু নির্মাতাদের প্রতিযোগিতা হবে সেখানে। পরের দিন স্কুলে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে মাফির সঙ্গে আলোচনা করল সান। মাফি একমত। বাসায় ফেরার পথেই গল্প ঠিক করল। পরের দিন স্ক্রিপ্টও হয়ে গেল।

 

ছবির গল্প : শিক্ষাব্যবস্থায় লুকানো মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না। মুখস্থবিদ্যার প্রাধান্য এখনো বেশি। কে কত নম্বর পেল সেটাই বড়। ছবিতে সেটাই দেখানো হয়েছে।

শুটিং শুরুর আগে বন্ধুদের নিয়ে একটি টিম গঠন করল। আর্টিস্ট সিলেকশন করল। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষার বেশি দেরি নেই। সবাই মিলে ঠিক করল—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছবির কাজ শেষ করতে হবে।

বানাতে কোনো টাকা খরচ করতে হয়নি তাদের। তবে চিন্তা ছিল পরীক্ষা নিয়ে। তাতেও অবশ্য পরে ভালোভাবে উতরে যায় দুজন। বাসা থেকে একটু আমতা আমতা করা হয়েছিল ঠিকই। তবে একদম না করেনি। দিন-রাত পরিশ্রম করে বানানো ছবিটি ঢাকাসহ রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামের উৎসবে দেখানো হয়েছিল।

 

নাবিদ ও অপূর্বর ‘বাক্সবন্দি’

অবস্থান : দ্বিতীয়

লিংক : www.youtube.com/watch?v=S49G1pnJz48

নাবিদ হাসনাত ও শিফাতুল অপূর্ব ছোটবেলার বন্ধু। দুজনই একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তবে অপূর্ব পড়ে রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজে আর নাবিদ সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজে। দুজন এসএসসি পাস করেছে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে।

চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশের ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার জন্য তাদের স্কুলের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হচ্ছিল। নাবিদ তখন প্রথম উৎসবের কথা শোনে। ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে যায় তারা। এর আগে নাবিদ কখনো ছবি তৈরির কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। উৎসবে গিয়ে দেখে, তার সমবয়সী, এমনকি তার চেয়েও অনেক ছোট ছাত্র-ছাত্রীরা ছবি বানিয়ে এনেছে। তখন তার চিন্তা—আমিও তো বানাতে পারি! স্বপ্ন দেখা শুরু করে নাবিদ। তারপর শুরু করে টিম বানানোর কাজ।

পর পর দুইবার ফিল্ম বানিয়ে অফিশিয়াল সিলেকশন থেকেই বাদ পড়ল। মাঝেমধ্যে মনে হলো, এ কাজ তাকে দিয়ে হবে না; কিন্তু জেদ তার কাটে না।

নাবিদ বলল, আমরা ২০১৪ সালে যখন ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছিলাম, তখন ফেস্টিভাল থেকে আমি একটা জেদ ধরি। যেভাবেই হোক, আমাদের বানানো একটি ফিল্ম এই ফেস্টিভালে অবশ্যই দেখিয়ে ছাড়ব।

নাবিদের বন্ধু অপূর্ব ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে সিলেট আসে। তখন তারা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আবার ছবি তৈরির প্রস্তুতি নেয় এবং টিম গঠন করে। অপূর্বদের বাসায় শুটিং হয়। কিন্তু সেখানে খুঁটিনাটি কিছু ঝামেলার কারণে ছবির ৭০ ভাগ শুটিং হতেই বন্ধ করে দিতে হয় কাজ।

ঈদের পর নতুন করে প্রথম থেকে শুটিং শুরু হলো নাবিদের বাসায়। এর মধ্যে ছুটিও শেষ। এক দিন, দুই দিন করতে করতে এসে গেল পরীক্ষা। বাসা থেকে বলা হলো, ‘ছবিটবি বাদ দাও। ’ তবে এরই মধ্যে একটু-আধটু করে শেষ হয় ছবির কাজ।

 

ছবির গল্প : তিন বন্ধু মিলে বাসায় এলোমেলো খবরের কাগজ গোছাচ্ছে। গোছাতে গোছাতেই তাদের চোখে পড়ে আলোচিত সব ইস্যু। সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে চলতে থাকে আলোচনা। পুরনো ও নতুন সমস্যা নিয়ে যে যার মতামত তুলে ধরে। চলে আড্ডা ও গল্প; কিন্তু আলোচনাও শেষ হয় একসময়। তারা আবার ফিরে যায় মূল কাজে। একসময় যে যার মতো চলে যায়। বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে ইস্যুগুলো।

এ ছবি তৈরিতে তেমন খরচ হয়নি। সব কাজ নিজেরাই করেছিল। মোবাইল দিয়েই সেরেছে টুকটাক ছবি তোলার কাজ। ভিডিও করা ও ফুটেজ এডিটিং করেছে নিজেরাই। সঙ্গে ছিল বন্ধুদের সাহায্য ও পরিবারের সমর্থন।

 

সাইয়েদুল আবরারের ‘আয়লান কুর্দি ফ্রম হেভেন’

অবস্থান : তৃতীয়

লিংক : https://m.youtube.com/watch?v=VZxEsFX11xQ

আবরার গল্প বলতে ভালোবাসে। ভালোবাসে গল্পকে ছবিতে রূপান্তর করে সবার কাছে পৌঁছে দিতে। উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইয়েদুল আবরার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের নিয়মিত দর্শক সে। নানা দেশের সিনেমা দেখার আনন্দ আর আগ্রহ থেকে উৎসবে হাজির হতে কোনো বছরই ভুল হয় না। নতুন নতুন ছবি আর অজানা-অচেনা নির্মাতাদের চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ হয়। শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে আসা-যাওয়া থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। এমনিতে ছোটবেলা থেকে লেখালেখির অভ্যাস। নিজের গল্পগুলো মনের মধ্যে কল্পনায় দেখে ও। আর সেটাকেই দর্শকের কাছে তুলে ধরার প্রবল আগ্রহ জন্মায়। ছয় বছর ধরে এ উৎসবে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেছে। আবরার যখন ক্লাস এইটে তখন প্রথম ছবি বানায়। ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবেও অংশ নিয়েছিল। পরের দুই বছর আর কিছু বানানোর সুযোগ হয়নি। এ নিয়ে দারুণ অস্বস্তিতে ছিল।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষার পর পড়াশোনার চাপ না থাকায় ‘ছায়াবন্ধু’ নামের একটি শর্টফিল্ম বানাতে শুরু করেছিল। এদিকে সমস্যা পিছু ছাড়ে না। জটিলতার কারণে অর্ধেক পথে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। তবু থেমে থাকল না আবরার। ২০১৫ সালে তুরস্কের সাগরপাড়ে পাঁচ বছরের শিশু আয়লানের মৃতদেহ পড়ে থাকার ছবি যখন গণমাধ্যমে আসে, তখন বিষয়টি নাড়া দেয় আবরারের মনে। মনে হয়েছিল, এ মৃত্যু খুবই অন্যায়। আর এমন ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন ছবির কাজ। পুরো কাজে সঙ্গে ছিল বন্ধু শাহেদ আর ছোট ভাই সালমান। পরামর্শকের কাজ করেছে শাহেদ আর এনিমেশন ঘরানার ছবিটির ফ্রেম এঁকেছে সালমান।

আবরারের অর্জনের ঝুলিটা একটু বড়। গত বছর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউএনএওসি ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক ‘প্লুরাল প্লাস ইউথ ভিডিও ফেস্টিভাল ২০১৬’-এর পার্টনার অ্যাওয়ার্ড পায় আবরার। তা ছাড়া ২০১৬ সালে কানাডার হ্যামিলটন ফিল্ম ফেস্টিভাল এবং ১৪তম আন্তর্জাতিক শর্ট অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালেও তার ছবিটি প্রদর্শিত হয়।

 

সুমাইতা শামার ‘এনমেসড বোরডোম’

বিশেষ পুরস্কার

লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=FLacQtTyXK4

বন্ধু দ্রাহার মুখে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের কথা প্রথম শোনে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামা। তার পর থেকেই মাথায় ঘুরতে থাকে—নিজেই একটা বানিয়ে ফেললে কেমন হয়? এরপর ভাবতে ভাবতেই পেল আইডিয়া। কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে জনপ্রিয় এনিমেশন মাধ্যম—স্টপ মোশন।

 

ছবির গল্প : একটি ছোট ছেলে। বেশ উদাসীন। মা-বাবা, বন্ধু—কাউকেই তার ভালো লাগে না। একপর্যায়ে পৃথিবীটাই ভালো লাগে না তার। ঠিক করল অন্য গ্রহে চলে যাবে। এরপর কী ঘটল, তা নিয়েই এ গল্প।

শামা তার ছবির মাধ্যমে দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছে, আমাদের জীবন যেমনই হোক, কাছের সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করা ঠিক নয়।

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী শামা তার ছবি তৈরিতে ব্যবহার করেছে হোয়াইট বোর্ড মার্কার পেন। ছবি এঁকে এঁকেই হয়েছে পুরনো ছবির কাজ। তাই খরচ না হলেও খাটতে হয়েছে অনেক। প্রথম থেকেই উৎসাহ জুগিয়েছে পরিবার।

সব কাজ রুটিনমাফিক হয়েছিল। তাই পড়ালেখায় সমস্যা হয়নি। তবে বানানোর একপর্যায়ে ধৈর্য হারিয়ে মনে মনে বলেছিল—দূর! কিচ্ছু হচ্ছে না। তখন কাজও বন্ধ করে দিয়েছিল। দ্রাহাই তাকে বুঝিয়ে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ঠিক যেন তার ছবির গল্পের মতোই।

তোমরা যারা ছবি বানিয়ে উৎসবে অংশ নিতে চাও, তারা যোগাযোগ করতে পারো এই ঠিকানায়— http://www.cfsbangladesh.org/

 


মন্তব্য