kalerkantho


‘তোমাকে পত্রিকার পাতায় দেখতে চাই’

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০




‘তোমাকে পত্রিকার পাতায় দেখতে চাই’

ছবি: তারেক আজিজ নিশক

ছোটবেলা থেকেই মুহসিনের বাবা তাঁকে কৃতী ছাত্রদের নিয়ে লেখা পেপার কাটিংগুলো দেখাতেন। বলতেন, ‘তোমাকে পত্রিকার পাতায় দেখতে চাই, এভাবেই নিজেকে গড়ে তোলো। ’ সেই থেকে শুরু। তারপর মুহসিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তি হলেন।   তাঁর বাবা তাঁর কোনো এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪.০০ রাখতে হয়, সিজিপি। সিজিপি কী জানতেন না। তবু ছেলের কাছে এই দাবি ছিল তাঁর। মধ্যবিত্ত পরিবারের মুহসিনকে বাবা টিউশন করতে পর্যন্ত দেননি সিজিপি ৪ ধরে রাখবার আশায়। এখানেও তাই একটা প্রতিদানের ব্যাপার ছিল। প্রতিজ্ঞায় ছিল, বাবাকে কিছু ফেরত দেবেন। ক্লাস শুরু হওয়ার দিন মুহসিনকে অল্প পরিচয়েই তাঁর সহপাঠিরা ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য মনোনীত করেছিলেন, মুহসিন সেই দিন-ই প্রতিজ্ঞা করে ফেললেন, বিভাগে এমন ফলাফল করবেন, যা আগে কেউ করতে পারেনি।

আর সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করার জন্য নিজের ঘরের ছাদে, দেয়ালে, এখানে-ওখানে লিখে রাখলেন, ‘মাস্ট সিকিউর ৪’। যাতে সব সময় মাথায় এ ব্যাপারটাই ঘোরে। ঘরে শোলার একটি আইডিয়া বোর্ড টাঙালেন। সেখানে কোর্সভিত্তিক ভালো করার আইডিয়া, যখন যা মাথায় আসত, লিখে রাখতেন। প্রতিটি কোর্সের পড়া নিজে নোট করতেন । স্যারদের বারবার করে দেখাতেন। এভাবেই চলল। এবারে ভাবলেন, বিভাগের কোন কোন কোর্সে ছেলেরা সাধারণত খারাপ করে, তাতে ভালো করতে হবে। সপ্তম এবং অষ্টম সেমিস্টারের দুটি কোর্স পড়ানো হয়, যা গতানুগতিক আরবি সিলেবাসের বাইরের। ছেলেরা এই পরীক্ষাগুলো বাংলায় দেয় এবং সাধারণত খারাপ করে। মুহসিন এই দুটি কোর্সকে টার্গেট করলেন। ইংরেজিতে পরীক্ষা দেবেন স্থির করলেন। ক্লাস শুরু হওয়ার পর তাই ইংরেজিতে নোট করে স্যারকে দেখাতে নিয়ে গেলেন। স্যার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন নোট। তাঁর পরদিন আবার নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন স্যার বললেন, ‘শুধু শুধু কেন কষ্ট করছ, তুমি পারবে না!  সবার চেয়ে আলাদা হতে চেও না। ’ তৃতীয় দিন আবার নিয়ে গিয়ে স্যারকে বললেন, ‘স্যার আমি চেষ্টা করতে চাই’। স্যার তখন তাঁকে দেখলেন ভালো করে। বেশ কয়টা বইয়ের নাম বলে দিলেন। কোর্সে এগুলোকে বাইবেলের মতো চোখে রাখতে বললেন। তিনি তাই করলেন। ওই কোর্সের মিডে সবার চেয়ে সাড়ে তিন নম্বর বেশি পেলেন। কোর্সের ফাইনাল পরীক্ষার আগে টেনশনে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। হতাশ হয়ে ভেবেছিলেন, আর হচ্ছে না! এবার আবার বাবা ত্রাণকর্তার ভূমিকায় এগিয়ে এলেন। পরীক্ষার আগের রাতে একত্রে বসে দুজন মিলে পড়লেন। পরদিন জীবনের সবচেয়ে সেরা পরীক্ষা দিয়েছিলেন মুহসিন। ফোর এসেছিল। এভাবেই মুহসিন এগোচ্ছিলেন। ফলাফল অনার্সে সিজিপি ৩.৯৮। আরবি বিভাগের ইতিহাসে অনার্সে এর চেয়ে ভালো সিজিপি কেউ তুলতে পারেনি। তারপর মাস্টার্স । এবারে দেয়ালে নতুন করে লিখলেন ‘আই ওয়ান্ট টু ব্রেক মাই পার্সোনাল বেস্ট’। শুরু হলো নতুন আরেক সংগ্রাম। এবারে সিজিপি এলো চার-এ চার।

মুহসিনের পরিশ্রমের ফলও এসেছে । অনার্সে কলা অনুষদে সর্বোচ্চ রেজাল্টের জন্য পেয়েছেন ‘কুদরাত-এ-খুদা বৃত্তি’, ‘ডিন অ্যাওয়ার্ড অব অনার’। মাস্টার্সের জন্য পাবেন ‘ডিন অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স’। এবং কলা অনুষদে সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’।

শুধু একাডেমিক পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত নন মুহসিন। টেকনোলজি নিয়ে তাঁর বেজায় আগ্রহ। ছেলেবেলা থেকেই গ্যাজেটের পোকা। ট্রাবলশুটার। টাকার বিনিময়ে কম্পিউটার সারাই করেন। আইটিতে তাঁর বেশ কিছু প্রফেশনাল কোর্সও করা আছ। তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরিচালনা ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আয়োজিত ফাউন্ডেশন স্কিলস ডেভেলপমেন্ট কোর্স করেছেন। গ্রাফিক্স এবং সফট স্কিলসের ওপর। তাতে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সনদ পেয়েছেন। লিড পরিচালিত ‘সার্টিফিকেট প্রোগ্রাম ইন লিডারশিপ এক্সিলেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ কোর্স করেছেন। তাতে পিয়ারসন ইউকে-র সার্টিফিকেট পেয়েছেন।

এ ছাড়াও সামাজিক কাজে তাঁর দায়বোধ আছে। নবম থেকে ইন্টার পড়ুয়া ছাত্রদের তিনি নিজ উদ্যোগে কাউনসেলিং করেন  এবং ইংরেজি শেখান। মুহসিন এখন আরবি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. ইউসুফের অধীনে এমফিল করছেন। ভবিষ্যতে উচ্চতর গবেষণায় আগ্রহী মুহসিন আরবিকে পাঠকবান্ধব করার জন্য নিজেকে সঁপে দিতে চান।      -মীর হুযাইফা আল-মামদুহ


মন্তব্য