kalerkantho


সফল উপাচার্য

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সফল উপাচার্য

সেশনজট দূর হওয়ার পথে। চালু করেছেন ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার, কল সেন্টার, কলেজ র্যাংকিং। শিক্ষক ডাটাবেজ, ই-ফাইলিং, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণসহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে গতিশীল করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ। তাঁর উদ্যোগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন হয়ে গেল ১৭ জানুয়ারি। লিখেছেন আরাফাত শাহরিয়ার

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। এতে পড়াশোনা করে প্রায় ২১ লাখ ছাত্র-ছাত্রী। এত ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষা, ফল প্রকাশে লেগে যেত অনেক সময়। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিভুক্ত সব কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সেশনজটকে স্রেফ অভিশাপ বলেই মনে করতেন। এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট দূর করাকে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হতো। সেই অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ।

প্রথম সমাবর্তন          

প্রায় দুই যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সমাবর্তন হয়নি।

ড. রশিদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সমাবর্তন হয়ে গেল ১৭ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বসেছিল প্রায় পাঁচ হাজার গ্র্যাজুয়েটের মিলনমেলা। আগে নিয়মিত সিনেট অধিবেশন হতো না। সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন হয় ২০০৭ সালে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিবছর দুবার সিনেট অধিবেশনের আয়োজন করা হয়।

 

সেশনজটকে টা টা     

সেশনজট নিরসনে তৈরি করেছেন ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ ও ‘একাডেমিক ক্যালেন্ডার’। এর আওতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দেশের সব কলেজে সকালে ক্লাস, বিকেলে পরীক্ষা হয়। ক্লাসের সময় ৪৫ মিনিট থেকে বাড়িয়ে এক ঘণ্টা করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রায়হান আহমদ জানান, আগে পরীক্ষার ফল প্রকাশে ছয় থেকে আট মাস লাগত, এখন তিন মাসেই হয়। একাডেমিক ক্যালেন্ডারের ফলে ক্লাস, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষার তারিখ, ফল প্রকাশ ইত্যাদি তথ্য আগেই জানা যায়।

ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘২০১৩-১৪ সেশনের ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো সেশনজট নেই। তারা ২০১৮ সালে বের হয়ে যাবে। ২০১৬ সালে ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের (সম্মান) ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা ওই বছরই হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি থেকে পুরনো শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও কোনো সেশনজট থাকবে না। চেষ্টা থাকলে কোনো কাজই দুরূহ নয়, এটা তারই প্রমাণ। ’

 

সব কিছু অনলাইনে

খুলনার সরকারি বিএল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মহসিন মিঞা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন আইটিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা যেতে পারে। সব ভর্তি কার্যক্রম, ফল প্রকাশ করা হয় অনলাইনে। কলেজ থেকে টিউটরিয়াল, ব্যবহারিক, মৌখিকসহ সব পরীক্ষার নম্বর অনলাইনে পাঠানো হয়। নিবন্ধন, বিষয় পরিবর্তনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে হয় না। পরীক্ষার প্রবেশপত্রও পাওয়া যায় ঘরে বসেই। শিক্ষকদের খাতা দেখার সম্মানীর জন্য ছুটতে হতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা হয়ে যায়। টাকা জমা হলে এসএমএস চলে যায় শিক্ষকের মোবাইলে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটকে আপটুডেট ও তথ্যসমৃদ্ধ করা হয়েছে। ম্যানুয়াল ফাইল চালাচালির পরিবর্তে চালু করেছেন ‘ই-ফাইলিং’। সব ফাইল অনুমোদন করা হচ্ছে এ ডিজিটাল পদ্ধতিতে। উপাচার্য বলেন, ‘কর্মকর্তারা ফাইল পাঠালে ল্যাপটপে পড়ে দেখি। অনুমোদন করে আবার তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিই এবং একটি চিঠি ইস্যু হয়ে যায়। এটিই ই-ফাইলিং। ই-টেন্ডারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে চালু করা সম্ভব হয়নি। ’

 

ওয়ানস্টপ সার্ভিস ও কল সেন্টার

চালু করেছেন ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার। অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সকালে ফরম পূরণ করে ফি জমা দিলে দুপুর ২টার মধ্যে সনদপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট ও নম্বরপত্র পাওয়া যায়। ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার থেকে শিক্ষার্থীরা সাময়িক সনদ, মূল সনদ, মার্কশিট, ট্রান্সক্রিপ্ট, দ্বিনকল সংগ্রহ, নাম সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা পান। প্রয়োজনীয় ফি জমা দেওয়ার জন্য রয়েছে কাউন্টার, তাই ছুটতে হয় না ব্যাংকের শাখায়। তথ্যসেবার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছেন কল সেন্টার। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ০৯৬১৪-০১৬৪২৯ নম্বরে ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য তাত্ক্ষণিকভাবে যে কেউ জানতে পারেন।

 

কলেজ র‍্যাংকিং

গত বছর প্রথমবারের মতো চালু করেছেন কলেজ র‍্যাংকিং। ৩১টি কেপিআইয়ের (কি পারফরম্যান্স ইনডিকেটরস) ভিত্তিতে ১০০ নম্বরের মানদণ্ডে করা হয় সেরা কলেজের তালিকা। সাতটি আঞ্চলিক পর্যায়ের সেরা কলেজ ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পাঁচটি এবং একটি করে সেরা মহিলা কলেজ, সেরা সরকারি কলেজ ও সেরা বেসরকারি কলেজ নির্বাচন করা হয়।

ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘এ ধরনের র‍্যাংকিং দেশে প্রথম। কলেজগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। চলতি বছরের জন্যও কলেজ র‍্যাংকিং প্রক্রিয়া চলছে। ’

 

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে গতিশীল করেছেন ড. হারুন-অর-রশিদ। পরীক্ষাসামগ্রী বিতরণ থেকে শুরু করে অনেক কাজই এখন হচ্ছে আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে। এর ফলে কমেছে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্ভোগ। উপাচার্য রশিদ জানান, নিজস্ব ভূমিতে স্থায়ীভাবে আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলেছে।

আপটুডেট করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস ও কোর্স কারিকুলাম। বাংলাদেশের ইতিহাস সব ছাত্র-ছাত্রীকে জানাতে ২০১৪ সালে চালু হয়েছেন ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ শিরোনামের ১০০ নম্বরের একটি বাধ্যতামূলক কোর্স। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বা ভালো মানের পাঠ্যপুস্তক নেই। পাঠ্যপুস্তক রচনার জন্য হাতে  নেওয়া হয়েছে একটি প্রকল্প।

 

শিক্ষক ডাটাবেজ ও প্রশিক্ষণ

শিক্ষকদের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তরপত্র পরীক্ষণ ও পরীক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সার্বক্ষণিক তদারকির আওতায় এসেছে। ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘গতানুগতিক পদ্ধতিতে খাতা বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম হতো। এখন সব শিক্ষকের তথ্য ডাটাবেজে আছে। কাকে কতটি খাতা দেওয়া হলো, এখানে আছে। এখন আর কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। ’

আগে নিয়মিত না হলেও এখন বছরে এক হাজার ২০০’র বেশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। সম্প্রতি কলেজ শিক্ষার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১০৪০ কোটি টাকার পাঁচ বছরমেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রকল্পের আওতায় কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ১৬ হাজার কলেজ শিক্ষক ও ৭০০ অধ্যক্ষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

           

শিল্প-সংস্কৃতি-ক্রীড়া  

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ তলা একাডেমিক ভবনের প্রবেশপথের দেয়ালে সম্প্রতি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে ‘স্বাধীনতা’ নামে ম্যুরালচিত্র স্থাপন করা হয়েছে। এটি তৈরি করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী হামিদুজ্জামান। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় উৎসাহিত করার জন্য দেশব্যাপী অধিভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে আন্ত কলেজ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার।

 

মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ড. হারুন-অর-রশিদের নেতৃত্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডভিত্তিক শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি দিয়েছে ইউরোপ বিজনেস অ্যাসেমবলি। তিনি নিজেও পেয়েছেন সেরা ব্যবস্থাপকের সম্মানজনক পুরস্কার। সব পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ অবশ্যপাঠ্য করার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য, আদর্শ ও ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক।


মন্তব্য