kalerkantho


হেলা নয় হাতের লেখায়

প্রযুক্তি আমাদের দিনকে দিন বানিয়ে দিচ্ছে অলস। হাতের চেয়ে এখন স্মার্টফোনেই লেখা হয় বেশি, কলম ঘোরানোর চেয়ে বেশি চলে কিবোর্ড। কিন্তু হাতের লেখার সঙ্গে আছে মগজের সম্পর্ক। গবেষণায়ও দেখা গেছে, হাতে কলম যত বেশি চলবে, ততই বাড়বে মগজের দৌড়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিজানুর রহমান

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হেলা নয় হাতের লেখায়

হাতের লেখা কেবলই মনের ভাব প্রকাশের ‘টেক্সট’ নয়। এটি ব্যক্তির নিজস্বতার চিহ্ন। কারণ একেকজনের হাতের লেখা একেক রকম। প্রতিটি অক্ষরকে যদি আমরা রংতুলি হিসেবে চিন্তা করি, তাহলে হাতের লেখা হচ্ছে কাগজে-কলমে শিল্পচর্চা। যেখানে মিশে থাকবে তোমার নিজের একটা ছাপ। কিন্তু এর বাইরেও কথা আছে। হাতে লেখার সঙ্গে আছে মনে রাখার সম্পর্ক। আছে চিন্তাশক্তিরও!

কলমি বন্ধু বা পেন ফ্রেন্ডের কথা শুনেছ? একটা সময় ছিল, যখন দুই প্রান্তের দুই বন্ধুর মধ্যে চলত পত্র চালাচালি। তাদের আবেগ, যত্ন—সব কিছুই মিশে থাকত হাতে লেখা চিঠিতে। এখন তো চিঠিপত্র প্রায় জাদুঘরে চলে গেছে। কলমি বন্ধুরাও এখন আর নেই।

হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইমোর বদৌলতে এখন দুনিয়ার যে প্রান্তেই বন্ধু থাকুক না কেন, তারা সংযুক্তই থাকে। ডিজিটালের কারিশমায় বন্ধুর মধ্যে দূরত্ব কমেছে অনেক, তবে হারিয়ে গেছে কিছু নিজস্বতা। তবে টাইপিংয়ের কাটখোট্টা শব্দের মাঝেও আবেগ খোঁজে মানুষ। সেই ডিজিটাল আবেগ দিতে আবিষ্কার হয়েছে ‘ইমোটিকন’। কিন্তু হাতের লেখায় থাকে আবেগ। হাতের লেখা দেখে বুঝে ফেলা যায়, কে কেমন, কার চিন্তা-ভাবনাই বা কেমন। তাই পরীক্ষার খাতায় এখনো আছে সুন্দর হাতের লেখার কদর।

দেলওয়ার হোসেন, যিনি স্নাতকোত্তর পাস করেছেন, হাতের লেখার গল্প বলতে গিয়ে বলেন, আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন একটি বিষয় কোনোভাবেই আয়ত্ত করতে পারছিলাম না। ক্লাসের অনেকেই পারছিল না। শিক্ষক বললেন, কাল তোমরা এটি ১০ বার লিখে আনবে। বিশ্বাস করুন, আমার আজও মনে আছে সেই বিষয়টি। ১০ বার হাতে লেখার কারণেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ছয় হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায় যে লেখার প্রচলন শুরু হয়েছিল, তা এখন বেশ হুমকির মুখে। কারণ একটাই, কিবোর্ড। এখন কিবোর্ডে মিনিটে ৫০ শব্দ লেখার দ্রুততা সবাইকে এতটাই মোহিত করে রেখেছে যে হাতে লেখার মতো ধীর প্রক্রিয়া কেউ ঠিক মেনে নিতে পারছে না। হাতে বড়জোর মিনিটে ২০-৩০ শব্দ লেখা যায় কিনা! আর এই দ্রুততার আকর্ষণের কারণে কিবোর্ড ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে শ্রেণিকক্ষেও। আমাদের দেশে বিষয়টির প্রচলন এখনো খুব একটা বেশি না হলেও সময় থাকতে সাবধান হওয়া দরকার। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতের লেখা নিছকই হাতে লেখা একটি টেক্সট নয়। বরং এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ভাবনা, অঙ্কনশৈলী, হাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক ভারসাম্য—এসবও নির্ভর করে। যেখানে কিবোর্ডে লিখতে হলে কেবল তোমাকে বোতাম চেপে যেতে হবে। আরো সহজ করে বলতে গেলে, এক লাইন হাতে লেখার সময় একেকটি অক্ষর তোমার মস্তিষ্ক আগে নিজে আয়ত্ত করে। এরপর হাত সেটিকে কলমের মাধ্যমে কাগজে ফুটিয়ে তোলে। আর সোজা করে লেখার তাগিদ থেকে বাড়তে থাকে শারীরিক ভারসাম্য ও হাতের ওপর নিজের দখল।

অনেকে মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আমাদের নতুনকে স্বাগত জানানো দরকার। যদিও গবেষণা ও স্নায়ু বিশেষজ্ঞ, এমনকি গোয়েন্দারাও বলছেন অন্য কথা। গোয়েন্দারা বলছেন, মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে হাতের লেখা একেক রকমের হয়। সেটি থেকে বোঝা যায়, আসলে একটি মানুষ কেমন অবস্থায় ছিলেন। স্নায়ু বিশেষজ্ঞ বলছেন, হাতের লেখার মাধ্যমে প্রতিটি অক্ষর কেবল মানুষের মস্তিষ্কেই জমা হয় না, বরং সেটির তথ্য জমা থাকে হাতের চলাচলের ওপরও, যাকে বডি মেমোরি বলে। এ কারণেই স্ট্রোকের পর স্মৃতি হারানো ব্যক্তিকে অক্ষরের ওপর দিয়ে হাত বুলাতে বলা হয়, যা অক্ষরকে মনে করিয়ে মস্তিষ্কের কিছু এলাকা সচল করতে সহায়তা করে।

হাতে লেখার ফলে একটি শব্দের সঠিক বানানও ছাত্রদের মনে গেঁথে যায়। যেখানে ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যারে ভুল বানানে লিখলে সেটি নিজ দায়িত্বেই বানানটি ঠিক করে দেয় (ইংরেজিতে)। ফলে শেখার সুযোগ আর থাকছে না। হাতের লেখায় বানান ভুলের ঘটনাও তাই অহরহ। অনেকে এমনও দাবি করছেন, পরীক্ষাটা কম্পিউটারে নিলেই পারে। যদিও অ্যাক্স-মার্শেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনেটিভ নিউরোসায়েন্স ল্যাবরেটরির দুজন গবেষক মারিকে লংচ্যাম্প ও জিন-লুক ভ্যালে ৭৬ জন তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন, যারা হাতে লেখে তারা কম্পিউটারে লেখিয়েদের চেয়ে বেশি নির্ভুলভাবে অক্ষর মনে রাখতে পারে। একই পরীক্ষণ তারা বাংলা ও তামিল বর্ণ ব্যবহার করে বড়দের ওপরও চালান, ফলাফল একই এসেছিল।

এর কারণ ব্যাখ্যা করেন ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজির অধ্যাপক এডওয়ার্ড গেনতাজ। তিনি বলেন, আমাদের বডি মেমোরি আছে। আমরা শরীরের মাধ্যমেও অনেক কিছু মনে রাখতে পারি। এ কারণেই স্ট্রোকের পর আমরা স্মৃতি হারানো ব্যক্তিকে হাত দিয়ে বিভিন্ন জিনিস ধরে দেখতে বলি।

রাজধানীর মনেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল্লাহ আল আজাদ বলেন, ‘কম্পিউটারের এ যুগে হাতের লেখা শুনতে সেকেলে মনে হলেও এর গুরুত্ব কিন্তু অনেক। কারণ প্রযুক্তি দিয়ে কেউ আর্টিস্ট হতে পারে না। তুলির আঁচড়ে দক্ষতা আনতে হলে তাঁকে হাতের লেখা দিয়েই শুরু করতে হয়। তেমনি বড় হয়ে ঘর-বাড়ির নকশা যারা করবে, তাদের জন্যও হাতের লেখাটা বড় কিছু। আবার হাতের লেখা সুন্দর করতে করতেই হয়তো ছাত্র-ছাত্রীরা সংস্কৃতিমনা হয়ে উঠবে। ’

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর ওপর চালানো অপর এক গবেষণার যবনিকায় গবেষক পাম মুলার ও ড্যানিয়েল ওপেনহেইমার বলেন, শ্রেণিকক্ষে ল্যাপটপে নোট নেওয়ার চেয়ে হাতে লিখে নোট নিলে বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারে শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি স্বীকার করেছে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীরাও। কয়েকজনকে প্রশ্ন করা হয়, কিভাবে পড়লে তোমাদের বেশি মনে থাকে। সেখানে শতভাগ জবাব এসেছে—পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিখলে একটি বিষয় দ্রুত মনে গেঁথে যায়।

লেখা-পড়ার কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করেন কি না—এটা জিজ্ঞাসা করলে স্কুল-কলেজপর্যায়ের ওই শিক্ষার্থীরা জানায়, বাসায় কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়, তবে বেশি নয়। লেখাপড়ার কাজটা আমরা হাতে-কলমেই করি। আর ক্লাসে? কলেজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী জানান, ক্লাসে আমাদের সঙ্গে মোবাইল পেলে মোবাইল জব্দ করা হয়।

বিষয়টি প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার প্রতিরূপ হলেও আসলে প্রযুক্তিকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন অভিভাবকরা। রামপুরার বাসিন্দা আলতাফ আহমেদ বলেন, পেশাজীবনে কম্পিউটারের ব্যবহারটা ব্যাপক। তাই আমি চাই আমার ছেলেও কম্পিউটারে দক্ষ হোক। তবে শিক্ষাজীবনে যেন সে যতটা বেশি সম্ভব কাগজ-কলমের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকে।

যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডকমেইলের একটি গবেষণায় যা উঠে এসেছে তা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে। দুই হাজার লোকের ওপর চালানো ওই গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি তিনজনে একজন ছয় মাসে কাগজে-কলমে কিছু লেখেননি। গড়ে প্রতিজন ৪১ দিনের মধ্যে কাগজ-কলমের ধারেকাছে ঘেঁষেননি।

এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ফ্রান্সকে মডেল হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০০০ সালে একটি আইন প্রণয়ন করে, যাতে বলা হয়, ছয় বছর বয়সে একজন শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কার্সিভ তথা পেঁচানো অক্ষর লেখা শিখতে হবে।

এদিকে আশার বিষয় হচ্ছে, টাচ স্ক্রিন ও স্টাইলাসের মাধ্যমে ডিজিটাল হাতের লেখা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সবচেয়ে নতুন আইপ্যাড প্রোয়ের সঙ্গে একটি পেনসিল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে একেবারে হাতের লেখার মতো লেখা যায়, আঁকা যায়। তাই প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য আশার কথা হলো, হাতে যন্ত্র থাকলেও হাতে লেখার সুবিধা থেকে আর বঞ্চিত হতে হচ্ছে না।


মন্তব্য