kalerkantho


পড়ার ফাঁকে লেখালেখি

ক্লাস, খেলা, অলিম্পিয়াড—এত কিছুর মধ্যেও চাই গল্পের বই। বই পড়ার মজা অন্য কিছুতে মিটবার নয়। আর যদি দেখ তোমার লেখা বইটাই পড়ছে সহপাঠীরা! দারুণ এ অভিজ্ঞতার স্বাদ যারা পেয়েছ তাদের নিয়েই আজকের আয়োজন। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া খুদে লেখকদের কথা জানাচ্ছেন শায়েখ হাসান ও মাসুদ আনসারী

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পড়ার ফাঁকে লেখালেখি

অগ্নিশ বিশ্বাস দিব্য

সেন্ট পলস মিশন স্কুল, দ্বিতীয় শ্রেণি

এবার গ্রন্থমেলায় একই প্রকাশনী থেকে বাবা এবং ছেলের বই প্রকাশ হয়েছে একসঙ্গে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা।

আগে থেকেই লেখক। কিন্তু ছেলে এখনো প্রাথমিকের গণ্ডিই পেরোয়নি! সেন্ট পলস মিশন স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে অগ্নিশ বিশ্বাস দিব্য। আর এইটুকুন বয়সেই প্রকাশ হয়েছে তার প্রথম বই ‘বন্ধু মশা’। বইটি প্রকাশ করেছে ঝিঙেফুল প্রকাশনী।

দিব্যর বড় ভাই অনিকেত বিশ্বাস কাব্যের প্রথম যেদিন বই বেরোল, সেই দিনই দিব্য লিখে ফেলল একটি গল্প—তানিমের বাগান। তা ছাপাও হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। কী ভেবে বলল, আমারও বই চাই, নিজের লেখা। অমনি খাতা-পেনসিল নিয়ে বসে গেল টেবিলে। টানা তিন ঘণ্টায় লিখে মশার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিল।

গল্পের মশা নাকি ওর সঙ্গে হাতও মিলিয়েছে।

দিব্যর প্রিয় লেখক বাবা অরুণ কুমার বিশ্বাস। তবে এর বাইরে সুকুমার রায় আর উপেন্দ্র কিশোরও তার প্রিয়। বড় হয়ে কী হতে চাও? দিব্যর সোজাসাপটা উত্তর ‘বিজ্ঞানী হব, আর লেখক হব। ’ তোমার লেখা পড়ে বন্ধুরা কী বলল? ‘ওরা ভীষণ খুশি। এক বন্ধু তো বলল, সে-ও আমার মতো লিখতে চায়। ’ কেমন সাড়া পাচ্ছ—জানতে চাইলে দিব্য বলে ‘টিভিতেও আমাকে দেখিয়েছে। বই নিয়ে কথা বলেছি। ’

এখন কী লিখছ? দিব্য বলল, ‘ভূতের গল্প। তবে ভূতটা ভালো। সে মানুষের উপকার করে বেড়ায়। ’ তবে শুধু লেখালেখি নয়। বই বের হওয়ার পর দিব্য এখন পড়ছেও বেশ। কারণ সে জানে, লিখতে হলে আগে বেশি বেশি পড়তেও হবে।

 

 

যাইফ মাসরুর

তামিরুল মিল্লাত স্কুল, নবম শ্রেণি

লেখালেখির হাতেখড়ি ছোটবেলা থেকে। শুরুটা বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লিখে। ঢাকা তামিরুল মিল্লাত স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ফেসবুকেও রীতিমতো তারকা লেখক সে। এবারই তার প্রথম বই বের হলো। নাম ‘কুকুর কাহিনি’। প্রকাশ করেছে সালাউদ্দিন বইঘর। পাওয়া যাচ্ছে  ৫৯৩-৫৯৪ স্টলে। নিজের প্রথম বই নিয়ে মাসরুর বলল, ‘টুকটাক লেখালেখি করি। তবে বই প্রকাশের চিন্তাটা হুট করেই আসে। প্রকাশকও রাজি ছিল। শৈশবের ঘটনাগুলোকে ফোকাস করে পাণ্ডুলিপি সাজিয়ে পাঠিয়ে দিই। মেলায় গত শুক্রবার বইটি আসছে। আমি খুব উত্তেজিত। বন্ধুবান্ধবরাও যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছিল মেলায় বই নিয়ে আসার জন্য। শিক্ষকদেরও পরামর্শ ছিল। পড়ালেখার শিডিউল ঠিক রেখে ছেলের বই প্রকাশ হওয়ায় মা-বাবাও যথেষ্ট খুশি। ভবিষ্যত্ ভাবনা নিয়ে এই খুদে লেখিয়ে বলল, নিয়মিত লিখব এখন থেকে। ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু দিতে চাই।

 

 

মীম নৌশিন নাওয়াল খান

ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, এসএসসি পরীক্ষার্থী

এবার ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে মীম। কদিন পরে কলেজে পা রাখবে। এরই মধ্যে সাহিত্যাঙ্গনে নিজের আগমন জানান দিয়েছে। চারবার মীনা অ্যাওয়ার্ড জয়ী মীম গল্প, ছড়া, কিশোর উপন্যাস লিখে ইতিমধ্যে পাঠকসমাজে কুড়িয়েছে খ্যাতি। নিয়মিত জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লিখছে। এ পর্যন্ত ১২টি বই বেরিয়েছে তার। এবারের বইমেলায় আছে দুটি। প্রকাশের অপেক্ষায় আরো একটি।

লেখালেখির হাতেখড়ি ছোটবেলায়। লিখতে শেখার আগেই বসে বসে ছড়া বানিয়ে মাকে শোনাত। মা সে ছড়া পাঠাতেন পত্রিকায়। লেখা শিখে গেলে নিজেই লিখত।

মীম বলে, মা-বাবার কাছ থেকে সব সময় উত্সাহ পেয়ে আসছি। কোনো বিষয় নিয়ে লেখার জন্য কোথাও যেতে চাইলে মা-বাবা সেখানে নিয়েও যান। তখন পিএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। সেদিন সময় শেষ হওয়ার একটু আগেই খাতা জমা দিয়ে দিয়েছি। হলে বসে আছি। হঠাত্ মাথায় একটি ছড়া মনে এলো। লেখার জন্য কাগজ নেই সামনে। ম্যাডামের কাছে এক্সট্রা কাগজ চাইলে তিনি বললেন, ‘তোমার না পরীক্ষা শেষ। কাগজ লাগবে কেন?’ ছড়া লেখার কথা জানালে ম্যাডাম কাগজ দিয়ে বলেন, ‘এখানে লিখতে পারো। কিন্তু যাওয়ার সময় কাগজখানা জমা দিয়ে যাবে। এর ভেতরে ছড়া লিখে তা মুখস্থ করে ফেলো। ’

২০১৪ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল হে ফেস্টিভালে সেরা শিশু লেখকের পুরস্কারও পেয়েছে মীম। এ বইমেলায় বিদ্যাপ্রকাশ থেকে এসেছে শিশুতোষ বই ‘পড়শি’ এবং শিশু-কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘পুতুলের ইস্কুলব্যাগ’।

মেলার প্রথম দিন থেকে ৩৭০, ৩৭১, ৩৭২ নম্বর বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে পড়শি। পুতুলের ইস্কুলব্যাগ প্রকাশ করেছে সাহস প্রকাশনী। এতে আছে ১৪টি গল্প।

 

 

মোসার্রত মেহ্জাবীন মীম

রাজশাহী কলেজ, দ্বাদশ শ্রেণি

‘প্রথম বই হিসেবে অনেক তাড়াতাড়ি করে বের করা হয়েছে। গল্পগুলো একেক সময়ে লেখা। এগুলো বই আকারে প্রকাশ করার কথা ভাবিনি। মা-বাবা এবং কলেজের শিক্ষকদের সহযোগিতায় এটা সম্ভব হয়েছে। ’ বললেন মোসার্রত মেহ্জাবীন মীম। তিনি পড়ছেন রাজশাহী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ ও স্কলারশিপ পেয়েছেন। পাশপাশি পুরোদমে চলছে লেখালেখি। পরিলেখ প্রকাশনী থেকে বের হওয়া মীমের বইটির নাম ‘অন্তহীন পথে’। আছে ছোট-বড় ১৩টি গল্প। ভূতের গল্প, রূপকথা, সায়েন্স ফিকশন, রহস্য গল্প, ভ্রমণ কাহিনি ও সত্য ঘটনা অবলম্বনে। সবই এক মলাটে। কিশোর বয়সীদের জন্য লেখা বইটি পাওয়া যাবে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১১২ নম্বর স্টলে। মেহ্জাবীন আরো বললেন, পাণ্ডুলিপি জমা, বই ছাপানো, বাইন্ডিং, প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলা—সব কিছুই মা-বাবা করেছেন। তাঁদের কারণেই এই বই বের করা সম্ভব হয়েছে। বন্ধুবান্ধবও সবাই সব সময় লিখতে উত্সাহ দেয়। তাঁর লেখার প্রশংসা গোটা কলেজ ক্যাম্পাসে।

বইয়ের নাম ‘অন্তহীন পথে’ কেন? জবাবে মীম জানালেন, ‘সাহিত্যের অন্তহীন পথে আমার যাত্রা শুরু। সাহিত্য ভালোবাসি। তাই সাহিত্য চর্চায় নিজেকে আগলে রাখি সব সময়। এ নিয়েই থাকতে চাই সারা জীবন। পাঠক আমাকে কতটা ভালোবাসবে জানি না। তবে পাঠকদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই বহু দূর।

 

 

আজমাইন ফাইয়াজ মানসিব

গ্রিনল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, দ্বিতীয় শ্রেণি

আজমাইন ফাইয়াজ মানসিবের বয়স ১১ বছর ৫ মাস। পড়ছে স্ট্যান্ডার্ড ফাইভে। এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তার একটি কমিক বই প্রকাশ হয়েছে। নাম গুলুগুলু। ছোটদের জীবনে ঘটা মজার মজার ঘটনা নিয়েই এ বই। তবে পড়বে বড়রাও। মানসিব বলল, সে তার নিজের জীবন থেকে গল্পগুলোই নিয়েছে। মানে যাকে বলে সত্য ঘটনা অবলম্বনে!

ভালো রেজাল্টের পাশাপাশি স্কুলে তার অনেক কৃতিত্ব। খেলাধুলার পাশাপাশি কম্পিউটার বিষয়ক প্রতিযোগিতাতেও পুরস্কার জিতেছে। ইংরেজি মাধ্যমের পড়াশোনায় ব্যস্ত সময় কাটে তার। এর মাঝে অবসর পেলে ইউটিউব-এ নিজের চ্যানেলের জন্য ভিডিও বানায়। মজার সব কাণ্ড করে মানুষকে আনন্দ দেওয়া, কম্পিউটারে গেইম খেলা, বই পড়া ও টুকটাক লেখালেখিতেই সময় কাটে তার।

গুলুগুলু প্রকাশের পর সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষকরাও বাহবা দিয়েছেন। মানসিবের ইচ্ছা, লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া। তবে সময় বের করা কষ্ট। তাই বলল, ‘অবসর সময়টা নষ্ট করতে চাই না। তখনো লিখব। ’

২০১৮ সালের বইমেলায় গুলুগুলু-২ লেখার ইচ্ছা রয়েছে মানসিবের। এরই মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের গল্পটাও ভেবে রেখেছে। বড় হয়ে গবেষক হতে চায়। নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি একজন সফল ইউটিউবারও হতে চায় মানসিব।

 

 

হাসান ইনাম

দারুন নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, দশম শ্রেণি

এবার খড় প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে হাসানের দ্বিতীয় বই সুলতান’স টি স্টল। পাওয়া যাবে লিটল ম্যাগ চত্বরের ১৩ নম্বর স্টলে। জেডিসিতে জিপিএ ৫সহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে হাসান। দশম শ্রেণিতে পড়লেও তার লেখার হাত বেশ পোক্ত বলা চলে। চেষ্টা করছে নিজের একটা গদ্যশৈলী রপ্ত করার। বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও অনলাইনভিত্তিক গল্পবিষয়ক পোর্টালে লিখছে নিয়মিত। লেখালেখিতে গল্পই তার প্রথম পছন্দের। তবে শুধু গল্পে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। সাহিত্যের সব শাখাতেই ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা।

‘সুলতান’স টি স্টল’-এ নানা স্বাদের ১২টি গল্প আছে। ছোট-বড় সবার কথা মাথায় রেখেই নাকি লেখা। হাসান ইনাম বলল, বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পাই। তাই কখনো আমার গল্পের প্লট তাদের নিয়েও হয়ে যায়। মা-বাবার অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাসান জানাল, মাদ্রাসার শিক্ষকরাও অনুপ্রেরণা জোগান। তবে কখনো পড়ালেখার সময় নষ্ট করে লেখালেখি করে না সে। ছুটির দিন আর অবসরেই চলে কলম। তবে গল্পের প্লট মস্তিষ্কে হানা দেয় যখন তখন।


মন্তব্য