kalerkantho


দশের কেতন ওড়ে

প্রতিবছরের মতো এবারও হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তহল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে এই যজ্ঞ। মূলত দুটি পর্যায়ে আয়োজিত হয় খেলা। ইনডোর ও আউটডোর। ইনডোরে হয় ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিস আর আউটডোরে অ্যাথলেটিকসসহ অন্যান্য ইভেন্ট। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া আন্তহল খেলায় সেরা বিজয়ীদের নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। মীর হুযাইফা আল-মামদুহের লেখায়। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দশের কেতন ওড়ে

আল আমীন

দৌড়

১০০ মিটার আল আমীনের ‘নিজস্ব’ ইভেন্ট। প্র্যাকটিস শুরু করেছেন আগস্ট থেকে।

ফলও মিলেছে পরিশ্রমের। বিশ্ববিদ্যালয়ে রেকর্ড গড়েছেন ১০০ মিটারে। ২০০ আর ৪০০ মিটারেও প্রথম হন। নিয়মমাফিক অনুশীলনই আল আমীনের প্রধান অস্ত্র। জাত অ্যাথলেট তিনি। এরই মধ্যে ন্যাশনাল গেমসে নবম হয়েছেন। স্বপ্ন হলো, ১০০ মিটারে জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড গড়বেন এবং দেশের প্রতিনিধি হবেন। এসবের নেপথ্যে কৃতিত্ব দিচ্ছেন নিজের ঐকান্তিক মানসিক জোর আর হলের বড় ভাই আরিফকে। যে মানুষটা তাঁর প্রতিটি খেলার সঙ্গী। যখন যেখানে তাঁর খেলা হয়, আরিফ সেখানে যান এবং আল আমীনকে সাহস জোগান। পরিবারও সমর্থন জোগাচ্ছে। তবে তিনি চাইছেন, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর পাশে দাঁড়াক। একটা সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা নিয়মিত ন্যাশনাল গেমসে খেলত, ভালো করত। কিন্তু সেই সুসময় নেই এখন। আল আমীন সেই দিন ফিরিয়ে আনার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন নিজের সঙ্গেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্র্যাকটিসের সুযোগ-সুবিধা কম। সেমিস্টার পদ্ধতির ক্লাস-পরীক্ষার চাপে অনুশীলনের সময় বের করা কঠিন। তবু লক্ষ্যে অবিচল আল আমীন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আল আমীন স্পন্সর চাইছেন। তাতে খেলে যাওয়া সহজ হবে। জাতীয় পর্যায়ে হেরে যাওয়াটাই তাঁকে জেদি করে তোলে। ব্যর্থতার পর ফিরে আসাটাকে তাই বড় করে দেখেন। অনেকেই ভয় দেখায়—‘এত বয়সে খেলে যাওয়ার কী দরকার! এবার না হয় ক্যারিয়ারে মন দে’! আল আমীন ক্ষিপ্ত হন। উদাহরণ হিসেবে বোল্টকে দেখান। ৩১ বছর বয়সেও দিব্যি সোনা জয় করে যাচ্ছেন।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সম্মান চতুর্থ বর্ষে পড়া আল আমীন থাকেন সূর্য সেন হলে। রেজাল্টও  ভালো। কর্মজীবনে স্পোর্টস নিয়েই থাকতে চান। খেলাধুলার কোনো বিষয় নিয়ে পিএইচডি করার ইচ্ছা আছে। আপাতত ১০০ মিটারে জাতীয় রেকর্ড গড়াই ধ্যানজ্ঞান।

 

 

লাবনী ইসলাম চুমকি

দৌড়, ১০০ মিটার হার্ডলস

অল্পতেই হাসিতে ভেঙে পড়েন। চুমকিকে দেখলে বোঝাই যায় না, খেলার মাঠে তিনি কতটা প্রবল! মাস্টার্সে ওঠার পর ভেবেছিলেন আর খেলবেন না। পড়ায় মন দেবেন। প্র্যাকটিসও ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তহল খেলা শুরু হওয়ার সময় শিক্ষকরা এক প্রকার জোর করেই নামিয়ে দিয়েছিলেন মাঠে। খেলেওছিলেন প্র্যাকটিস ছাড়া। আহত হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই। ড্রেস কোড ছিল গেঞ্জির সঙ্গে থ্রিকোয়ার্টার ট্রাউজার। ফুল ট্রাউজার পরেই নেমে পড়েন চুমকি! ১০০ মিটার হার্ডলসের বাধাগুলো পেরোনোর সময় ট্রাউজার অসহযোগিতা করলেও হয়ে যান দ্বিতীয়! প্র্যাকটিসের অভাবটাকে দুষেছেন অবশ্য। দীর্ঘ লাফের আগের দিন হুজুগে বেমক্কা বেশ কয়েকবার লাফানোর পর দেখেন, পেশিতে টান পড়ছে! পা নাড়াতে পারছেন না। শেষমেশ হাই পাওয়ারের ব্যথার ওষুধ খেয়ে প্রতিযোগিতায় লাফিয়েছেন। এবারও রানার-আপ! এখানেও ঝামেলা পাকালো ট্রাউজার। লাফানোর সময় বাধা দিচ্ছিল।

লাবনী ইসলাম চুমকি পড়ছেন ইতিহাস বিভাগে। রোকেয়া হলে থাকেন। পড়ালেখায়ও বেশ ভালো। খেলার শুরুটা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে ওঠার পর থেকেই। এর আগে কখনোই খেলেননি। রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। খেলাধুলায় মেয়ে জড়িত হোক, এটায় তাঁদের অনাগ্রহ। হলে ওঠার পর সবাইকে খেলতে দেখে দেখে ক্রমেই খেলা ভালোবেসে ফেলেন। তার পর থেকেই লাবনী খেলে যাচ্ছেন। খেলাকে ভালোবেসে, নিজের হলকে চ্যাম্পিয়ন করার জন্য। পরিবারের অমত সত্ত্বেও। থ্রিকোয়ার্টার ট্রাউজারে অভ্যস্ত হতে পারেননি। তাই ফুল ট্রাউজারে খেলে যাচ্ছেন। এ জন্য সমস্যা হলেও আমলে নিচ্ছেন না। অবশ্য হলের খেলায়, যেখানে কেবল মেয়েরাই থাকে, সেখানে থ্রিকোয়ার্টারে সমস্যা হয় না তাঁর। খেলার জন্য হলের আর নিজের বিভাগের শিক্ষকদের কাছ থেকে বেশ উত্সাহ পেয়ে আসছেন বরাবর! আর এ কারণেই মাঝেমধ্যে পরিবারের চাপে হাঁপিয়ে গেলেও খেলাটা আর ছাড়া হয়নি। কৃতজ্ঞ তাই তিনি তাঁর শিক্ষকদের কাছে!

খেলায় তাঁর অর্জন অনেক। নিজের হলের খেলায় দুবার রানার-আপ হয়েছেন। কর্মজীবনে বিসিএস দেওয়ার ইচ্ছা। খেলা নিয়ে বেশিদূর এগোনোর ইচ্ছা নেই। এবারেই হয়তো শেষ! তবে লাবনী চান মেয়েরা নিজেদের ভালোবাসা থেকেই খেলায় আসুক।

 

 

জামান উল্লাহ

পাঁচ হাজার মিটার দৌড়

পাঁচ হাজার মিটারে জামান এর আগের দুই বছর আন্তহল খেলায় হেরে গিয়েছিলেন। অথচ এটা তাঁর প্রিয় ইভেন্ট। এ বছর তাই ইচ্ছাকে করেছেন দৃঢ়। অনুশীলন চালিয়ে গেছেন প্রতিদিন। পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রদক্ষিণ করেছেন দুবার করে। কিন্তু বিধিবাম! ৮০০ মিটার আর এক হাজার ৫০০ মিটারে জামান প্রথম হতে পারেননি এবারও। ইভেন্ট দুটিতেই দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এতে আত্মবিশ্বাসে খানিকটা ঘাটতি পড়ে। প্রথমে যোগ না দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। পরে স্পোর্টসম্যানশিপ প্রবল হয় তাঁর মধ্যে। নেমে পড়েন খেলায়। জিতেও যান। পাঁচ হাজার মিটার জেতার পর একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন জামান। আনন্দে প্রলাপও নাকি বকতে শুরু করেছিলেন! সামনের চার বছর দৌড়ানোর ইচ্ছা আছে জামানের। তবে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জামান চাইছেন একটা প্ল্যাটফর্ম। যেখান থেকে কিছু আয়ও হবে। এমন হলে তিনি সারাটা দিন দৌড়েই বেড়াতেন। অর্জনের চেয়ে মাঠে টিকে থাকাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন জামান। তিনি জানেন, লেগে থাকলে ফল পাবেনই। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার প্রবল ইচ্ছা তাঁর। পারিপার্শ্বিক সব ঠিক থাকলে স্বপ্নপূরণের ট্র্যাকে নামবেন অচিরেই।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের জামান হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থাকেন। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দৈনিকে সাংবাদিকতাও করছেন। কর্মজীবনে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছাও আছে তাঁর।

 

 

অনুপ দে

ব্যাডমিন্টন

জগন্নাথ হলের ট্রফির শোকেসে ব্যাডমিন্টনের কোনো ট্রফি ছিল না। অনুপ স্থির করেছিলেন, এই ট্রফিটা তিনি আনবেন। ভাবনা অনুযায়ী নেমে পড়লেন। নিয়মিত অনুশীলন করলেন। ব্যাডমিন্টনের জন্য খেলার অনুশীলন বাদেও আলাদা ব্যায়াম করতে হয় পায়ের স্টেপ ঠিক করার জন্য। অনুপ প্রতিদিন দুবার করে অনুশীলন করতে শুরু করলেন। সকালে ভার্সিটির জিম বন্ধ থাকে বলে বুয়েটের জিমে যেতেন। বিকেলে ভার্সিটির জিমে। এভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। খেলায় ফলও পেয়েছেন। সিঙ্গলসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ডাবলসে তাঁর পার্টনার সুদীপ্ত। রসায়নের ছাত্র সুদীপ্ত অনুপকে সেরা সঙ্গত দেন। আর তাই দুই সঙ্গী মিলে ডাবলসেও হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন।

অ্যাকাউন্টিংয়ে এমবিএ শুরু করেছেন অনুপ দে। তার আগে এই বিভাগ থেকেই বিবিএ করেছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অনুপ প্রথম দিকে নিজের খরচ চালানোর জন্য উপার্জনে কিছুটা মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলে সেসব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দেন। তার পর থেকে ক্রমেই ভালো ফল করতে থাকেন।

ব্যাডমিন্টন খেলাকে ভালোবাসেন অনুপ। আর এ খেলার সামগ্রী অনেক দামি। স্বাদ আর সাধ্য কখনো কখনো একত্র হয় না। অনুপের তা-ই হয়েছিল। তবু দমে যাননি। খেলে গেছেন। কখনো প্র্যাকটিস করেছেন জুতো ছাড়া, কখনো ছেঁড়া জুতোয়। অন্যের র্যাকেটে। এভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন অনুপ। তাঁর পরিশ্রম দেখে পরিচিত বাবলু ভাই তাঁর র্যাকেট দিয়েছিলেন তাঁকে। ওটা দিয়ে অনেক দিন খেলেছেন। তারপর একদিন হলের বড় ভাই ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সজীব তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে একটা র্যাকেট কিনে দিয়েছেন। এখন সেই র্যাকেট দিয়েই জয় করছেন সব!

অনুপের স্বপ্ন—একজন ভালো শিক্ষক হবেন। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে কোনো একটি কলেজে পড়াতে শুরু করবেন। মানুষ গড়বেন। আর সময় সময় শখের ব্যাডমিন্টন খেলে যাবেন।  

 

 

খাদিজা পারভিন

গোলক নিক্ষেপ, বর্শা নিক্ষেপ, দৌড়

পছন্দের ইভেন্ট গোলক নিক্ষেপ। সাত বছর ধরে আন্তহল খেলায় এই ইভেন্টের চ্যাম্পিয়ন তিনি। এবার রব উঠেছিল—অন্য কে যেন গোলক নিক্ষেপে ভালো করছে। খেলায় নেমে দেখেন, রাজত্বে নতুন কোনো ভাগীদারের আগমন ঘটেনি। এ ইভেন্টে খাদিজার অর্জন উল্লেখযোগ্য। আন্তবিশ্ববিদ্যালয় খেলায় পুরস্কার আছে। তবে আক্ষেপ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণটা পাচ্ছেন না। পেলে হয়তো আরো বড় কিছু করে দেখাতেন।

চাকতি নিক্ষেপেও সেরা খাদিজা। এখানেও ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু চাকতি নিক্ষেপের আসল কৌশল নাকি তিনি জানেনই না! বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র জানতেন, কিন্তু শেখা হয়নি তাঁর কাছ থেকে। গায়ের জোরই ছিল এত দিনের ভরসা। স্বভাবতই বর্শা নিক্ষেপও তাঁর প্রিয় আরেক ইভেন্ট। এতেও নিয়মিত। প্র্যাকটিসের সুযোগ নেই এসব খেলায়। তাই খেলা মনমতো হয়ে ওঠে না। বর্শা নিক্ষেপের সময় হাতে টান লাগে বলে এবার খেলবেন না ভেবেছিলেন। কিন্তু জাত অ্যাথলেট খাদিজা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ খেলায় অর্জন খোয়াতে চাননি, খেলেছেন। তিনবার নিক্ষেপ করার সুযোগ থাকে। নিয়ম হলো, বর্শা সবচেয়ে বেশি দূরে গেলেই হবে না। মাটিতে পড়ে কিছুটা গেঁথে যেতে হবে এবং ওটাকে খানিকটা মাটিও তুলে আনতে হবে। খাদিজার প্রথম নিক্ষেপে বর্শা মাটিতে গাঁথেনি। দ্বিতীয়বারে গাঁথে। রানার-আপ হন।

আন্তবিশ্ববিদ্যালয় খেলার চ্যাম্পিয়ন কিংবা রানার-আপ নির্ধারিত হয় ইভেন্টের আধিক্য দিয়ে, যে সবচেয়ে বেশি ইভেন্ট জিতবে সে-ই চ্যাম্পিয়ন। খাদিজা আরো একটা ইভেন্টে অংশ নেন, ১০০ মিটার দৌড়। চ্যাম্পিয়ন কিংবা রানার-আপের সম্মান রাখার জন্য। সম্প্রতি ওজন বেড়ে যাওয়ায় ভেবেছিলেন, এবার আর পারবেন না দৌড়ে। না খেলার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন। তবে স্বামী এ ক্ষেত্রে মানসিক সহায়তা দিয়ে তাঁকে আগ্রহী করে তোলেন। কিছুদিনের প্র্যাকটিসও আছে। তাই আত্মবিশ্বাস হারাননি। নেমে যান মাঠে এবং তৃতীয় হন।

খেলার মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই সরব খাদিজা। সাত বছরের হল চ্যাম্পিয়ন। পাঁচবার ফজিলাতুননেসা মুজিব হল থেকে। পরে এমফিলের জন্য হল পরিবর্তন করার পর দুবার রোকেয়া হল থেকে।

এসব ইভেন্ট ছাড়াও খাদিজা নিয়মিত খেলেন হ্যান্ডবল, ভলিবল, বাস্কেটবল, টেবিল টেনিস, ক্যারম, দাবা আর সুইমিং। খেলা যেন তাঁর রক্তে।

পরিবার থেকেও কোনো বাধার মুখে পড়েননি। সবাই তাঁর অর্জনকে সম্মান করেছে। সাহস জুগিয়েছে। বিয়ের পর মাঠে গিয়ে উত্সাহ জুগিয়েছেন স্বামীও। খাদিজা এমফিল করছেন কমিউনিকেশন ডিজ-অর্ডার বিভাগ থেকে। এর আগে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পড়াশোনায়ও চ্যাম্পিয়নদের কাতারে। প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় হয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। চতুর্থ হয়ে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে শরীরচর্চা ও খেলাধুলা প্রশিক্ষক তিনি। সঙ্গে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছেন।

 

 

তাহমিনা আফসার

দৌড়

গতবারের আন্তহল চ্যাম্পিয়ন তাহমিনা এবার খেলার আগে প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন। তাঁর কয়েক দিন আগেই বিএনসিসির ক্যাম্প করে এসেছিলেন। সেখান থেকেই অসুস্থতা। এতটাই যে কথাও বলতে পারছিলেন না ঠিকমতো। এই অসুস্থতা নিয়েই খেলায় নেমেছেন শুধু মানসিক জোর থেকে।

২০০ মিটার দৌড়েছেন এবং দ্বিতীয় হয়েছেন। আর এবার খেলায় মেয়েদের ২০০ মিটারের পরপরই আয়োজকরা ৪০০ মিটার শুরু করে দিয়েছিলেন। তাতে তাহমিনা খুব বিপদে পড়ে যান। একে তো অসুস্থ, তার ওপর ২০০ মিটারের ক্লান্তি। তবু নেমে পড়েন।

দৌড়ে এগিয়েই ছিলেন বেশ। শেষ দিকে ক্লান্তি জড়িয়ে ধরল যেন। একটা ঘোরে তাঁর মনে হয়েছিল, পৌঁছে গেছেন সীমায়। তাতেই পিছিয়ে যান। প্রতিদ্বন্দ্ব্বী তাঁকে রেখে এগিয়ে যান। বাকি সময় হেঁটে পার হয়েছেন। তবু দ্বিতীয় স্থানেই ছিলেন ।

তাহমিনা আফসার দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষে। সুফিয়া কামাল হলে থাকেন। বিভাগে মেধা তালিকায় এখনো তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছেন। এর আগের আন্তহল খেলায় রানার-আপ হয়েছেন। হলের খেলায় দুবারের চ্যাম্পিয়ন।

ছোটবেলা থেকেই খেলা যেন তাঁর রক্তে। পরিবারের উত্সাহেও ঘাটতি ছিল না কখনো। তাহমিনার আক্ষেপ—তাঁর পাশের বন্ধুরা সামনাসামনি খুব প্রশংসা করে, কিন্তু পেছনে বলে বেড়ায়—তাহমিনার এ খেলাধুলা নাকি অর্থহীন কাজ। বিদ্রূপ গায়ে মাখেন না একটুও। মানিয়ে নিতে শিখে গেছেন। তবে শিক্ষকরা সমর্থন দিয়ে গেছেন সব সময়ই। হলের শাওন্তি ম্যাডামের কথা বিশেষভাবে বলেন। খেলাধুলার পাশাপাশি ভ্রমণেও তাঁর বেজায় শখ। ইচ্ছামতো ঘুরতে পছন্দ করেন। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে সরকারি চাকরিতে থিতু হওয়ার ইচ্ছা তাঁর।

 

 

তানজীনা তানীন

ব্যাডমিন্টন

তানজীনা তানীনের এবার শেষ খেলা। এবার তাই চেয়েছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ করবেন।   কিন্তু আন্তহল ইনডোর খেলা আর তাঁর মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা প্রায় একই সময়ে পড়ে গিয়েছিল। খেলার জন্য প্র্যাকটিস আর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি—দুটোই একত্রে চালিয়ে নিতে হয়েছে। এ জন্য বেশ আগ থেকেই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন, যাতে দুটির কোনোটিতেই ব্যাঘাত না ঘটে। ব্যাডমিন্টনের জন্য প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন জানুয়ারির ৩ তারিখ থেকে। আর পরীক্ষার তারিখ পড়েছিল ডিসেম্বরের ১৮ থেকে। দুটি প্রস্তুতি একত্রে চলছিল। ব্যাডমিন্টন সিঙ্গেলসের ফাইনাল হয়েছিল ১২ জানুয়ারি।

প্রতিপক্ষ বেশ ভালো, শুনেছিলেন তানীন। প্রস্তুতিও ছিল বেশ। খেলায় নামার পর দেখলেন, তিনি এখনো সেরাই আছেন। ব্যাডমিন্টন ডাবলসে খেলার সময় ইনজুরিতে পড়ে যান তানীন। একদিকে ইনজুরি, অন্যদিকে পরীক্ষা। ডাবলসের সেমিফাইনালের পরের দিন পরীক্ষা ছিল। খুব টেনশনে ছিলেন। শেষে দুশ্চিন্তার মুক্তি ঘটে। জিতে যান। আর পরীক্ষাও বেশ ভালো হয়! ডাবলসের ফাইনাল ছিল ২১ তারিখ। অথচ একই দিনে পরীক্ষা ছিল, কিন্তু কী করে যেন পরীক্ষা দুই দিন পিছিয়ে গেল।

ডাবলসেও জিতে গেলেন। তানীন অবশ্য ডাবলসের ফাইনাল জেতার সবটুকু কৃতিত্ব দিয়েছেন তাঁর পার্টনার নুসরাত খানমকে। তিনি ছিলেন বলেই তাঁকে খেলায় সবটুকু শ্রম দিতে হয়নি। আর টেবিল টেনিস সিঙ্গলসের খেলার ফাইনাল খেলতে পারেননি ইনজুরির কারণে। তাতে রানার-আপের পুরস্কার থাকে তানীনের।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মেধাবী এ ছাত্রী থাকেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব হলে। বাবা জেলা ক্রীড়া অফিসার হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার পরিবেশ পেয়েছেন। ক্লাস সিক্সে ব্যাডমিন্টন আর ভলিবলে হাতে খড়ি। তার পর থেকে সব ধরনের খেলায়ই তাঁর অবাধ বিচরণ। আর তার আগে স্থানীয় বিভিন্ন খেলায় নিজেকে চিনিয়েছেন। তানীনের খেলার অর্জনের তালিকা বেশ লম্বা! আন্তবিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে আন্তহল কিংবা বিভাগের সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। ব্যাডমিন্টন আর টেবিল টেনিস বাদেও তাঁর পুরস্কার পাওয়া খেলাগুলোর ফিরিস্তি এমন—হ্যান্ডবল, ভলিবল, লং জাম্প, হাই জাম্প, শট পুট, ক্যারম ও বর্শা নিক্ষেপ।

বিভাগে চতুর্থ তানীন জীবনের সব বিষয়কেই খুব সিরিয়াসলি নিয়েছেন। যখন পড়াশোনা করেছেন, ভালো করেই করেছেন। নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরে কখনোই যাননি।

শুধু খেলাধুলায়ই নন, একাধারে তিনি নাচিয়ে, উপস্থাপক ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বরাবরই। ভবিষ্যতে খেলাধুলা নিয়ে এগোতে চান। তাঁর মাস্টার্সের গবেষণার বিষয়ও ছিল খেলাধুলা ও জাতীয়তাবাদ!

 

 

আছিয়া আক্তার

দৌড়

আন্তহল খেলায় নারীদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন আছিয়া আক্তার। ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী। দৌড় তাঁর প্রিয় ইভেন্ট। অথচ অ্যাজমার সমস্যা আছে তাঁর। প্রতিদিন সকালে ইনহেলার নিতে হয়!

গত বছর আন্তবিশ্ববিদ্যালয় খেলায় হেরে গিয়ে প্রচণ্ড হতাশা চেপে ধরেছিল। অবশ্য ওই সময় বিজয়ীরা ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়। তাঁরা প্রতিনিয়ত খেলা নিয়েই থাকেন। এবার তাই আছিয়া ভেবেছিলেন আর খেলবেন না। অবশ্য নিজের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলায় অন্তত তাঁকে কেউ হারাতে পারবে না। আত্মবিশ্বাসের জয় হয়। রানিং শু পরে খেলতে হয়েছে এবার। আছিয়ার জন্য যা কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। শু পরে দৌড়ে অনভ্যস্ত আছিয়ার তাই গতিও কমে গিয়েছিল অনেকটা। তবুও ১০০ মিটার দৌড়ে বিজয়ী হন। হার্ডলস কিছুটা কঠিন। বাধা পেরিয়ে দৌড়াতে হয়। আবার আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বাঁ পা দিয়ে দৌড় শুরু করতে হয়। আছিয়া অভ্যস্ত ডান পায়ে শুরু করে। এখানেও ঝামেলা। তবে খেলার বাঁশি বাজতেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন। ফার্স্ট হওয়াটাই বড় কথা। তা-ই হলেন।

২০০ মিটারে এর আগের খেলাগুলোয় লেন নির্ধারিত ছিল। এবার লেন ফ্রি। খেলা শুরুর আগে ভয় করছিলেন ধাক্কা লাগার। কিন্তু খেলা শুরুর অর্ধেক সময় পরই এগিয়ে যান আছিয়া। প্রথম হয়েই দৌড় শেষ করেন। অন্যবার দীর্ঘ লাফে একেক প্রতিযোগী তিনবার করে লাফানোর সুযোগ পেত। আছিয়ার প্রথমবারের লাফ যাচ্ছেতাই হয়। দোষটা জুতোর ঘাড়ে চাপিয়েছেন। পরের লাফ দিয়েছেন জুতো খুলে। অতিক্রম করেন সর্বোচ্চ দূরত্ব। তৃতীয় লাফেও একই দূরত্ব। এ খেলায় নিজের স্টেপে সমস্যা আছে বলে মানছেন আছিয়া। প্র্যাকটিসের অভাবই দায়ী।

আছিয়া পড়াশোনায়ও এগিয়ে। সম্মান তৃতীয় বর্ষের এ ছাত্রী বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে থাকেন। মেধাক্রমে এ পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে আছেন। খেলায় পরিবারের বেশ সাপোর্ট পান। উত্সাহ দেন শিক্ষকরাও। ‘মেয়েদের খেলা এখনো আমাদের সমাজ বেশ বাঁকা চোখে দেখে’—অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বললেন, ছোটবেলায় কোনো বাধা পাইনি। কিন্তু এখন যখন বড় হচ্ছি, মনে হচ্ছে আমি বাধা পাচ্ছি। সঙ্গের মানুষগুলো সামনে বেশ প্রশংসা করে বটে, কিন্তু পেছনে নিন্দা করতে ছাড়ে না। এটা কষ্টের। আপাতত অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য বিভাগীয় শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাঁর।

 

 

শ্রী কৃষ্ণ হালদার

দৌড়

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী কৃষ্ণ হালদারের সম্মান শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা ছিল এ বছর। সব ছেড়ে দিয়ে পড়ায়ই মন দিয়েছিলেন। তা ছাড়া খেলতে খেলতে তাঁর ট্যান্ডনে সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। এ জন্য বিশ্রামেও ছিলেন অনেক দিন। কিন্তু খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারেননি কৃষ্ণ। নেমে পড়েছেন দৌড়ের সারিতে। এক হাজার ৫০০ মিটারে নেমেই প্রথম হয়েছেন। অসুস্থ পা নিয়েও! ৮০০ মিটারের আগে বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভাবেননি কোনো পদক জুটবে। তবু দাঁত চেপে দৌড়েছেন। তৃতীয় হয়েছেন। পাঁচ হাজার মিটারে হয়েছেন দ্বিতীয়।

খেলাধুলায় তাঁর অর্জন গর্ব করার মতো। গত বছর আন্তহল খেলায় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন কৃষ্ণ। এর আগে ৮০০ মিটারে চারবার দৌড়েছেন। দুবার হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। এক হাজার ৫০০ মিটারে টানা তিন বছরের চ্যাম্পিয়ন তিনি।

কলেজজীবন থেকেই খেলা শুরু। কৃষ্ণের পরিবার খেলাধুলায় উত্সাহ জুগিয়েছে বরাবর। ছেলেবেলায় তাঁকে বিকেএসপিতে ভর্তি করানোর একটা জোরালো কথাও উঠেছিল। পরে আর তা হয়নি। মূলত ক্রিকেট ভালোবাসেন। পরে হলের প্রতিযোগিতা তাঁকে অ্যাথলেটিকসে আসতে উদ্বুদ্ধ করে। ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে ছিল। জাতীয় দলে খেলার ইচ্ছা ছিল শুরু থেকেই। বিকেএসপিতে ভর্তি হতে না পারার দুঃখ এখনো হয়। তবে সেটা আর কষ্ট দেয় না। মানিয়ে নিতে শিখে গেছেন। সায়েন্সের স্টুডেন্ট কৃষ্ণের জন্য পড়াশোনা আর খেলাধুলার মিশ্রণ ঘটানো খানিকটা কঠিন ছিল বটে। তবে পড়াশোনা নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা আছে তাঁর। খেলায়ও লেগে থাকবেন।

 

 

জীবন ত্রিপুরা

দৌড়

বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর তীরে বেড়ে উঠেছেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলেন। তবে সাঙ্গু নদীর চরে দৌড়াতে দৌড়াতে দৌড়টাকেও কখন যে ভালোবেসে ফেলেছেন টের পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকে দৌড়ে যাচ্ছেন।

আন্তহল ফুটবল খেলার বেশ কিছুদিন আগে একবার ভাড়ায় খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পান। দৌড়ানোর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরে ব্যথা কমে এলে হলের স্যাররাই তাঁকে ধরেবেঁধে আন্তহল খেলায় নামিয়ে দিয়েছিলেন হলের সম্মান বজায় রাখার জন্য! প্রতিযোগিতার আগে চার কি পাঁচ দিন অনুশীলন করতে পেরেছিলেন। মানসিক বল পাচ্ছিলেন না। তবু নেমে যান ট্র্যাকে। ১০০ মিটারে দ্বিতীয় হন। ২০০ মিটারে তিনি দৌড়াবেন না, এমন সিদ্ধান্তই ছিল। তবে দৌড়ের ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় হন। ৪০০ মিটারে তাঁর প্রস্তুতি ঠিকঠাক ছিল। এবারও হয়ে যান দ্বিতীয়। অ্যাকাউন্টিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়া জীবন ত্রিপুরা জগন্নাথ হলে থাকেন।

দৌড় নয়, ফুটবলকেই পেশা হিসেবে নিতে চান। কিন্তু পরিবার, অর্থনীতি—এসব আটকে রাখে তাঁকে। বিভাগের পড়াশোনার চাপও আছে। তবু তিনি খেলছেন, পড়ছেন।


মন্তব্য