kalerkantho


শিক্ষক কি বন্ধু হতে পারেন?

অনেকেই মনে করেন, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুত্বের। আবার অনেকের মত, এই বন্ধুত্বের মধ্যে সীমারেখা থাকা উচিত। বন্ধুর মতো, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধু নয়! শিক্ষকরা হবেন প্রথমত অভিভাবক, তারপর বন্ধু। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সুলুকসন্ধান করেছেন আরাফাত শাহরিয়ার

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষক কি বন্ধু হতে পারেন?

এক দশক আগেও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা ছিল অন্য রকম। শিক্ষকরা মোটা বেত নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করতেন।

তা দেখেই কাঁপুনি ধরে যেত ছাত্র-ছাত্রীদের। শিক্ষকের চোখে চোখ পড়লেই আত্মস্থ করা পাঠও ভুলে যেত অনেকে। তখনকার দিনে মা-বাবারা ছেলে-মেয়েকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, আমরা একে জন্ম দিয়েছি, মানুষ করার দায়িত্ব আপনার। এ যদি আপনার কথা না শুনে, তবে শুধু হাড় কয়খানা ফেরত চাই! শিক্ষকও অভিভাবকের দেওয়া দায়িত্বকে তথাস্থ মনে করে সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন। মা-বাবার পরই স্থান ছিল শিক্ষকের। ছাত্র-শিক্ষকের এ বন্ধনে যেমন ভালোবাসা-সম্মান ছিল, তেমনি স্থান ছিল ভীতির। সময় পাল্টেছে। বদলে গেছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ধরন। সময়ের প্রেক্ষাপটেই শ্রেণিকক্ষে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেশির ভাগ শিক্ষক এখন আর ছাত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটা অনুভব করেন না। ছাত্ররাও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছে।

 

মানুষ গড়ার কারিগর

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হাসিনা পারভীন মনে করেন, শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সুশিক্ষিত, সুনাগরিক, বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে একজন শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জীবনের সেরা সময়টা শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটায়। শিক্ষাঙ্গন তাই কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে স্বর্গ, পবিত্রতম স্থান। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। একজন শিক্ষক দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। শিক্ষকের সঙ্গে একজন ছাত্রের শুধু লেখাপড়ার আদান-প্রদানের সম্পর্কই মূল কথা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, যে বয়সেই শিশু প্রথম তার স্কুলে পা রাখুক না কেন, তার থাকে অনেক ভয়, বিস্ময়, উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা। একজন খুদে শিক্ষার্থীর জন্য কাজটি সহজ হয়, যখন শিক্ষক একজন বন্ধুর মতো তার সামনে এসে দাঁড়ান। একজন শিক্ষক পারেন অনিশ্চিত, উদ্বিগ্ন ও দুরুদুরু বুকের একদল শিশুকে আনন্দময় সময় উপহার দিতে। যাঁরা পারেন, তাঁদের এই শিশুরা সারা জীবন মনে রাখে। যাঁরা খুব ভালোভাবে পারেন শিশুদের উৎসাহিত করতে, নিজেদের মেলে ধরে উদ্দীপনা দিতে পারেন, তাঁরা হতে পারেন এই শিশুদের রোল মডেল।

 

সম্পর্কে চিড়

একটা সময় ছিল, যখন পণ্ডিত মশাইরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র জোগাড় করতেন, বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। কালের বিবর্তনে তা আজ আর দেখা যায় না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্বটা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক দিকটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষক ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে ব্যাচে বা কোচিংয়ে পড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগী। প্রাইভেট পড়লে বেশি নম্বর দেন, না পড়লে ব্যবহারিকে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন—এমন অভিযোগও শোনা যায় অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ছাত্ররাও ভুলতে বসেছে শিক্ষকের সম্মান। আড়ালে শিক্ষককে নিয়ে কটুকথা বলতেও দ্বিধা করে না অনেক ছাত্র-ছাত্রী। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যেখানে ভালোবাসার, আদর্শের সম্পর্ক থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে অনৈতিক, অনাদর্শের, শত্রুতার তথা বিরূপ সম্পর্ক।

 

তিনি হতে পারেন পথপ্রদর্শক

একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীর মানসিক বিকাশ, মানবিক দিকগুলোকে জাগিয়ে তোলা, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষাটাও দেওয়া উচিত। ছাত্র-ছাত্রীদের বিপথ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারেন একজন আদর্শ শিক্ষক, দেখাতে পারেন আলোর পথ। শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, একটা সাহায্যের হাত, ভালোবাসার হাত, বিশ্বাসের হাত পেলে স্কুলে, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা অনেক শিক্ষার্থীর জীবনই বদলে যায়।

শিক্ষার্থীদের বয়স বাড়ে, তাদের জীবনেও অনেক নতুন দ্বন্দ্ব্ব আর সংকট দেখা দেয়, তাদের চাহিদাও বাড়ে। কিন্তু যদি কোনো শিক্ষক তাদের পাশে এসে দাঁড়ান, তাদের পিঠে একটা হাত রেখে বন্ধুর মতো পরামর্শ, সাহায্য দেন, তাহলে সেসব দ্বন্দ্ব্ব-সংকট অনেকটাই কেটে যায়। পরিবারের আর বন্ধুবান্ধবের বাইরের কেউ যদি একজন শিক্ষার্থীর আপনজন হতে পারেন, তিনি তার শিক্ষক। যে শিক্ষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে সুন্দর, তিনি মা-বাবার বিকল্পও হতে পারেন। ’

 

দরকার মিথস্ক্রিয়া

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক মিথস্ক্রিয়া। কিন্তু দিন দিন তা কমছে বলেই বাড়ছে দূরত্ব। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আবু সায়েম মনে করেন, একজন শিক্ষককে তাঁর ক্লাসের প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে সমানভাবে ইন্টারেক্ট করতে হবে। তা না হলে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া, তাদের লেখাপড়ার খোঁজ নেওয়া ইত্যাদি কর্মকাণ্ড তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের সঙ্গে একজন শিক্ষকের যে নিবিড় ইন্টারেকশন থাকে বা হওয়ার সুযোগ রয়েছে, পর্যায়ক্রমে হাই স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে তেমনটি সম্ভব হয় না। যদিও স্কুলপর্যায়ে এর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। বয়ঃসন্ধিকালে শিক্ষকের সাহচর্য পেলে ছাত্র-ছাত্রীরা সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারে। শিক্ষকদের সঙ্গে নিবিড় অর্থপূর্ণ সম্পর্ক ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্ছন্নে যাওয়া থেকেও বিরত রাখতে পারে।

কোনো একটি ক্লাসে যদি অনেক ছাত্র-ছাত্রী থাকে, তাহলে ইন্টারেকশন সম্ভব নয় বলে মনে করেন অনেক শিক্ষক। তাঁদের অভিমত, শ্রেণিকক্ষে আদর্শ ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ৩০ঃ১। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ছাত্রের সব প্রশ্নোত্তর, লেখাপড়াজনিত সব সমস্যা শ্রেণিকক্ষেই সমাধান করা সহজ হবে।

    

কে দায়ী?

একসময় সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল সবার ওপরে। কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতা অনেকেরই পড়া। মোগল বাদশাহ আলমগীর তাঁর ছেলেকে একজন শিক্ষকের কাছে পড়াতে দিয়েছিলেন। একদিন তিনি খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, শাহজাদা পাত্র থেকে পানি ঢালছেন আর শিক্ষক নিজ হাত দিয়ে পা ধুয়ে নিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে বাদশাহ ওই শিক্ষককে ডেকে পাঠান। শিক্ষক ভয়ে মুষড়ে গেলেন। ভাবলেন, বাদশাহর সন্তানকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালিয়ে তিনি অনেক বড় স্পর্ধার কাজ করে ফেলেছেন! পরদিন মাথা উঁচু করেই বাদশাহর সামনে হাজির হন শিক্ষক। তিনি যা ভেবে গিয়েছিলেন হলো তার উল্টো।

বাদশাহ শিক্ষককে তিরস্কার করে বললেন, আপনার কাছ থেকে আমার সন্তান তো কোনো আদব-কায়দাই শিখল না! এ কেমন শিক্ষা দিলেন যে আপনার ছাত্র আপনার পায়ে পানি ঢেলে দেবে আর আপনি আপনারই হাত দিয়ে পা পরিষ্কার করবেন? আপনি তাকে এমন শিক্ষা দিলেন না কেন, যেন সে নিজেই নিজের হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দেয়?

কিন্তু দিন দিন শিক্ষকদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতাবোধ হারিয়ে ফেলছে ছাত্র-ছাত্রীরা। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর অভিমত, এর জন্য শিক্ষকরাই দায়ী। ক্লাসে তাঁরা ঠিকমতো পড়াতে পারেন না বা পাঠের বিষয়ে মনোযোগী নন। ক্লাসে খারাপ আচরণ করেন। নৈতিক, আদর্শগত দিক থেকেও তাঁদের ভাবমূর্তি খুব বেশি দৃঢ় নয়। শিক্ষক হলেই ছাত্ররা সম্মান করবে না, তাঁদের আচরণে শিক্ষণীয় কিছু থাকতে হবে।

শিক্ষকরা বলছেন উল্টো কথা। তাঁদের দাবি, ক্লাসে সেরাটা দেওয়ারই চেষ্টা করেন তাঁরা। যদিও কেউ কেউ স্বীকার করেছেন, যোগ্য শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব আছে। মেধাবীরা স্কুল-কলেজে শিক্ষকতার জন্য আসেন না, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান তুলনামূলক কম মেধাবীরা। এতেই যত গণ্ডগোল। শিক্ষকদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা বাড়লে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।

সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার এই ব্যর্থতার পেছনে শুধু ছাত্র-শিক্ষকরাই দায়ী নন। এর জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থারও দায় আছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাকে পণ্য বানানো হয়েছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ছাত্র-শিক্ষক স্বাভাবিক সম্পর্কটুকু হারিয়ে গেছে। প্রচুর অর্থ খরচ করে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ালেখা করে। শিক্ষকরাও পাঠদানকে অন্যান্য আর আট-দশটা পেশার মতো একটি পেশা মনে করেন। ফলে উভয়ের সম্পর্ক হয়ে গেছে ক্রেতা-বিক্রেতার মতো।

 

সম্পর্ক হোক বন্ধুত্বের

শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার ভিত্তি রচনা করে দেন। তাই দুনিয়ার সব বড় মানুষই তাঁদের প্রথম জীবনের শিক্ষকদের কাছে ঋণী থাকেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা-সম্মান জানান। পরিণত বয়সে গিয়েও শিক্ষকের পায়ের ধুলো মাথায় নেন। ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে শিক্ষকের এই আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যে কোনো লোভ-লালসা, সুযোগ-সুবিধা, আদান-প্রদানের হিসাব থাকতে পারে না। একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে যত বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে, শিক্ষার জন্য তা ততটাই মঙ্গলজনক হবে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, ‘সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের কারিগর যে শিক্ষক, তিনি শুধু শিক্ষক নন, বন্ধুও বটে—পথপ্রদর্শক তো বটেই। শাসন তিনিই করতে পারেন, যিনি সোহাগ করতে জানেন। তবে শাসন মানে শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়, শাসন মানে মনকে আঘাত দেওয়া নয় (এ দুটি শাসন নয়, অপরাধ); শাসন হচ্ছে কোনো শিক্ষার্থীর পা হড়কে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে শক্ত হাতে তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দেওয়া। কাজটি একজন বন্ধু করলে সেটি শাসন থাকে না। দিন শেষে সে জন্য শিক্ষার্থীর কৃতজ্ঞতাই জমা থাকে। ’

 


মন্তব্য