kalerkantho


পড়ার বিষয়

কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার

মীর হুযাইফা আল-মামদূহ   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার

সেমিনাররুমে পড়ছেন ছাত্র-ছাত্রীরা ছবি : তারেক আজিজ নিশক

সাবিনা ইয়াসমিন পড়েন ‘কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার’ বিভাগে। তিনি এর আগে সুযোগ পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। তবে সেখানে পড়েননি তিনি। কেন মেডিক্যালে পড়া বাদ দিয়ে নতুন কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার বিভাগে ভর্তি হতে এলেন—এই প্রশ্নের জবাবে সাবিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর বললেন, ‘অনেক দিন ধরেই আমি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করি। আমি দেখেছি, তাদের অনেকেই মনের কথাটি ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগেও দক্ষ নয়। এসব বঞ্চিত ছেলেমেয়েকে সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগে দক্ষ করে তোলার বাসনা থেকেই এখানে ভর্তি হয়েছি। ’ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ড. হাকিম আরিফ বললেন, শুরুতে এটি ছিল বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে। পরে একে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে নিয়ে আসা হয়। গত বছর থেকে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা শুরু হয়।

এই বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য এসএসসি ও এইচএসসিতে বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ নম্বর পেতে হবে। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় এই দুই বিষয়ে আলাদাভাবে ১২ নম্বর করে পেতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে ৪০ জন করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি নেওয়া হয়। এখন অনার্সের দুই এবং মাস্টার্সের তিন ব্যাচ মিলিয়ে ২০০ ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করছেন। তাঁদের জন্য পূর্ণকালীন পাঁচ ও খণ্ডকালীন পাঁচজন শিক্ষক আছেন। কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার বিভাগের ক্লাস হয় কলাভবনে। ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যক্রমও অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে একেবারে আলাদা। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিই হলো তাদের মূল পাঠ্যক্রম। যেখানে হিউম্যান কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডিস-অর্ডার, অ্যানাটমি অ্যান্ড ফিজিওলজি অব স্পিচ, ভাষাতত্ত্বের মূল বিষয়গুলো, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, নিউরোলজি অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কমিউনিকেশন এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈকল্য বা বিঘ্ন ঘটায়—এমন সব উপসর্গ ও সেগুলোর ব্যবহারিক চিকিৎসাপদ্ধতি ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। বিভাগের শিক্ষাক্রমের বিষয়ে বলতে গিয়ে চেয়ারপারসন বললেন, ‘উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। আমরা খেয়াল রেখেছি, ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলে সেসব কোর্সের সঙ্গে যেন মানিয়ে নিতে পারে। ’ এ প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, ‘এই বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষে এমফিল ও পিএইচডি করা যাবে। এ ছাড়া বিদেশেও উচ্চশিক্ষার অপার সুযোগ আছে। ’ এই বিভাগ থেকে অনার্স পাসের পর ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স অন ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (বিএসএসএলটি), মাস্টার্সের পর মাস্টার্স অব সোশ্যাল সায়েন্স অন ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (এমএসএসএলটি) ডিগ্রি দেওয়া হয়।  

কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডার কেবল একটি তত্ত্বীয় বিষয় নয়, এখানে প্রায়োগিক পাঠ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে। বিভাগ ঘুরে জানা গেল—সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম বিনিময় চুক্তি হয়েছে। ফলে সেখানে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা রোগী দেখছেন। এ ছাড়া প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে বিনা মূল্যে তাঁরা থেরাপিস্ট হিসেবে রোগী দেখেন। বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগে বিকলদের জন্য স্কুল খোলা হচ্ছে, সেসব জায়গায় তাঁরা সাহায্য করছেন। অন্যদিকে শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিওলজিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্টরা এখানে এসে প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্সটি করছেন। অটিস্টিক স্কুলের শিক্ষকরাও এই কোর্স করছেন। দুই বছর মেয়াদি এই কোর্সে প্রতিবছরের এপ্রিলে ছাত্রছাত্রী ভর্তি নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হয়। কোর্স ফি এক লাখ টাকা। পাস করার পর তাঁদের প্রফেশনাল মাস্টার্স অব সোশ্যাল সায়েন্স অন ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (পিএমএসএলটি) ডিগ্রি দেওয়া হয়।   

কমিউনিকেশন ডিস-অর্ডারে লেখাপড়া করে কোথায় চাকরি পাওয়া যাবে—এই প্রশ্নের জবাবে বিভাগের প্রধান বললেন, ঢাকা মেডিক্যাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কয়ার, পপুলারসহ বিভিন্ন হাসপাতালে এ ধরনের রোগীদের জন্য আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরো বাড়বে। সেখানে ভালো বেতনে চাকরি করা যাবে। বিসিএসও করা যাবে। আলাদা চেম্বারের সুযোগও আছে। ’ এত সম্ভাবনাময় নতুন এই বিভাগটি এখনো বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলা করে চলেছে। বিভাগের জন্য আলাদা কোনো ক্লাসরুমের বরাদ্দ এখনো দেওয়া হয়নি। সেমিনার রুম থাকলেও সেখানে তেমন বই নেই। কলাভবনের স্টোররুমকে সেমিনার রুমে পরিণত করা হয়েছে। ফলে সেটি তেমন বড় নয়। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শিরিন এ বিষয়ে বলতে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, ‘কখনো এখানে, কখনো ওখানে আমাদের ক্লাস হয়। কোন দিন কোন বিভাগের ক্লাসরুম ফাঁকা আছে, সেটি জেনে সেখানে আমাদের পড়তে বসতে হয়। আমাদের নির্দিষ্ট ক্লাসরুমের খুব প্রয়োজন। ’ এ ব্যাপারে বিভাগের চেয়ারম্যান জানালেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা করলেও সেটি যথেষ্ট নয়। ’


মন্তব্য