kalerkantho


শিতিধার জয়ী মৃদুলা

শিতিধার নামের ভারতের হিমাচলের পর্বত জয় করেছেন মৃদুলা আমাতুন নূর। এই শৃঙ্গ জয় করা তিনিই সবচেয়ে কম বয়সী মেয়ে। তাঁর সেই অভিযানের গল্প শোনাচ্ছেন ও ছবি তুলেছেন হাবিবুর রহমান

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিতিধার জয়ী মৃদুলা

ছোটবেলা থেকেই তিনি দুঃসাহসী। ভয়-ডর কিছু নেই।

একমাত্র মাকড়সা ছাড়া আর কোনো কিছুকে পরোয়া করেন না। যেখানেই ঘুরতে গেছেন, বিভিন্ন ধরনের দুঃসাহসিক কাণ্ডকীর্তি করেছেন। সেই তিনিই হঠাৎ পর্বতকে ভালোবেসে ফেললেন। সেবার তাঁরা রাঙামাটিতে ঘুরতে গিয়েছিলেন। তত দিনে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছেন মৃদুলা আমাতুন নূর, মেডিক্যালে ভর্তির আরো কিছুদিন বাকি। হাতেও বেশ অবসর। সবাই মিলে বেড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ একটি পাহাড় দেখে দুঃসাহসিক মনটা নেচে উঠল। খুব ইচ্ছা হলো, পাহাড়ে চড়বেন। অথচ ট্র্যাকিংয়ের সামান্য জ্ঞানটুকুও তাঁর নেই। কাউকে কিছু না বলে সাধারণ জুতো পরা অবস্থায়ই ধীরে ধীরে উঠতে লাগলেন। কখনো পড়ে যাচ্ছিলেন, কখনো হাত ছড়ে যাচ্ছিল; কখনো পিছলে নেমে আসছিলেন কিছুটা। তবুও দমেননি। থেমেছেন একেবারে দুই হাজার ফুট ওপরে উঠে। সেদিন থেকেই পাহাড় তাঁকে ডাকতে শুরু করল।

তবে অন্য সবার মতো ছুটি বা অবসর মেলে না তাঁর। তিনি পড়েন ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে। লেখাপড়ার প্রচণ্ড চাপ তাঁর। তার পরও সময় বের করে, দিন-রাত পাগলের মতো খাটাখাটনি করে অটল বিহারি বাজপেয়ি ইনস্টিটিউশন অব মাউন্টেনিয়ারিংয়ে কাগজপত্র জমা দিলেন। টাইফয়েডে ভুগে, দুর্বল শরীরেই গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের পথে রওনা দিলেন তিনি। পরদিন দিল্লি, তার পরদিন ভোর ৬টায় হিমাচল প্রদেশের মানালির অটল বিহারি বাজপেয়ি ইনস্টিটিউটে।

আমাদের দেশ থেকে একাই ছিলেন তিনি, সবার মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী। পর্বতারোহণের বেসিক কোর্স শুরুর আগে ইনস্টিটিউটের আশপাশের সব ঘুরে দেখলেন। ১ অক্টোবর থেকে শুরু হলো তাঁর টানা ২৬ দিনের বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স। সেখানে জাপান ও ভারতের মোট ৮০ জন পর্বতারোহী ছিলেন। ভোর ৫টায় তাঁদের বিছানা থেকে তুলে দেওয়া হতো। ফ্রেশ হয়ে চা-নাশতা খেয়ে নিতেন। শুরু হতো পিটি। পর্বতের নিচ থেকে ওপরে উঠতে হতো। সাড়ে ৮টায় শুরু হতো তুষারপাত, পাহাড়ধস, ম্যাপ রিডিং ইত্যাদি পাহাড়সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের ব্রিফিং। এরপর ইনস্টিটিউশনের আশপাশের পর্বতে ব্যাগপ্যাক কাঁধে নিয়ে উঠতেন-নামতেন। টানা পরিশ্রমে ভীষণ ক্লান্ত শরীরে ৭টায় ঢুলতে ঢুলতে রুমে ফিরতেন। বিছানায় শরীর পড়ে যেত। ঘুমিয়ে পড়তেন। এভাবে টানা প্রশিক্ষণে পোক্ত হয়ে গেল শরীর, পর্বত জয়ের জন্য তৈরি হয়েছে মন।

শিতিধার জয়ের জন্য মৃদুলা রওনা দিয়েছিলেন গত ৭ অক্টোবর। তাঁদের দলটির প্রথম পরীক্ষা ছিল পাতালসু পর্বত। সাদা পাহাড়ের এবড়োখেবড়ো বুক চিরে তাদের দলটি ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে চলেছে, কখনো কেউ পড়ে গেছেন। আশপাশের সহযাত্রীরা তুলে দিয়েছেন। কখনো পাহাড়ি কুকুর কিছুটা পথে সঙ্গী হয়েছে। কখনো আঁকাবাঁকা পথ দেখে থমকে গেছেন। তাঁদের পাহাড়ি মনেও ভয় ঢুকে গেছে। তার পরও এগিয়েছেন। এভাবে বিহাস নদী পেরিয়েছেন। কখনো কোনো পাহাড়ের ধারে বসে পড়েছেন। পাহাড়ি মানুষগুলো এগিয়ে এসে তাঁদের সুরেলা ও বিষণ্ন কোনো আঞ্চলিক গান শুনিয়েছেন। এভাবে ১৩ হাজার ফুট উঠে গেলেন। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারদিক অবাক হয়ে দেখলেন, আশপাশে, ওপর-নিচে কোনো কিছুই নেই। শুধু তুলার মতো সাদা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। একা অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন মৃদুলা। পর্বতের বুক চিরে সাদা সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে, ধোঁয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছেন তিনি।

১৫ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টায় শুরু হলো মূল অভিযান। স্নো গগলস, ক্লাম্বিং স্যুট, ক্লাম্বিং বুট পরে, পেছনে ব্যাগপ্যাক নিয়ে তাঁরা তৈরি হলেন। তখনো তুষারপাত হচ্ছে। কাজুবাদাম ও কিশমিশ খেয়ে নিলেন। তাঁদের দলে আছেন মোট ৯ জন। বয়সে সবাই তাঁর দ্বিগুণ, কেবল পাটনার একটি ব্যাংকার মেয়ে আছেন বছর তিনেকের বড়। ভোর ৬টায় যাত্রা শুরু হলো। বিশাল বড় পাথরখণ্ড মাকড়সার মতো বুকে হেঁটে পেরোলেন। ছোট ছোট পাহাড়ি নদী পেরোলেন। ভয়াবহ শীতল সেই পানি। জুতো খুলে ঠাণ্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেলেন নদীতে। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। ঠাণ্ডা পানিতে পা জমে গেল। তার পরও নদী পেরিয়ে গেলেন। এরপর আবার হাঁটা শুরু হলো। একসময় পিপাসা পেয়ে গেল খুব। তবে কারো কাছেই এক ফোঁটা পানি নেই। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তখন পায়ের বুট খুলে বরফে আঘাত করতে লাগলেন। চাকা ভেঙে গেলে সেটিই মুখে পুরে দিলেন। এভাবে বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করে আস্তে আস্তে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগলেন তাঁরা। ১৫ অক্টোবর সারা দিন চেষ্টা করে ১৪ হাজার ফুট ওপরে উঠে গেলেন তাঁরা। ব্যথায়, যন্ত্রণায় কাতর মৃদুলাকে অন্যরা উৎসাহ দিতে লাগলেন, আমরা তো প্রায় পুরোটাই সামিট করে ফেলেছি। আর চিন্তা কেন?  ভুতুড়ে সেই রাতে তাঁবুতে ঘুমাতে গেলেন তাঁরা। চারদিকে কোনো শব্দ নেই। থেকে থেকে পাহাড়ি কুকুরের বীভৎস চিত্কার কানে আসছে, কোথাও অবিরত শিয়াল ডেকে চলছে। খাবারটুকু খেয়ে নিয়েছে বড় বড় পাহাড়ি ইঁদুর। ক্ষুধা পেটে, সারা দিনের ক্লান্তিতে প্রচণ্ড শীতে ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরের দিন সকালে জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন তিনি। সেই ভোরটি শুরু হলো তুষারপাতে। তার পরও সাহস নিয়ে অভিযান শুরু করলেন তাঁরা। একসময় খুব বমি পেতে লাগল তাঁর। বমির ট্যাবলেট খেয়ে নিলেন। এভাবে নানা কষ্ট সহ্য করে তখন ৮০ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৪০ জন আছেন। বাকিরা অভিযান শেষ করতে পারেননি। তবে অদম্য মৃদুলা দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে বলছিলেন, ‘শিতিধার আমি জয় করবই। ’ কিছুটা পথ হেঁটে, কিছুটা অন্যের সাহায্য নিয়ে, আর কিছুটা পথ হামাগুড়ি দিয়ে উঠেছেন তিনি। ততক্ষণে পা দুটিতে সাড়া পাচ্ছিলেন না। জায়গায় জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। হাত-পা, চোখ-মুখ—সবখানেই ক্ষত। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। তখন বাবা আবু হেনার কথাই বারবার মনে পড়ছিল তাঁর। বাবা মেয়েকে বলেছিলেন, ‘আর যা-ই করিস, জীবনটি দিয়ে দিস না মা। ’ মেয়ে উত্তরে বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে তা-ই দেব। কিন্তু আমার লক্ষ্য থেকে কখনো পিছু হটব না। ’ বিকেল সাড়ে ৩টায় ১৫ হাজার ৫০০ ফুট উঁচু শিতিধারের চূড়ায় উঠলেন বাংলাদেশের এই তরুণী। পকেট থেকে আমাদের জাতীয় পতাকা বের করে উড়িয়ে দিলেন বাতাসে। জাতীয় সংগীত গেয়ে উঠলেন তিনি।

 


মন্তব্য