kalerkantho


কেঁচো বদলাবে জীবন

কেঁচো চাষ করে কেবল আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বের উদ্বাস্তুদের জীবনমান বদলে দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনা করেছেন বুয়েটের চার ছাত্র-ছাত্রী। এই ভাবনা ১৭৯টি দলের মধ্যে সেরা হয়েছে। বাংলাদেশের হয়ে এবার তাঁরা লড়বেন বিশ্ব আসরে। সেই গল্প শোনাচ্ছেন ও ছবি তুলেছেন তন্ময় রায়

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কেঁচো বদলাবে জীবন

দীপ্ত সাহা, আরফ আঞ্জুম, আহমাদ রাশিক ও সঞ্জীব ভট্টাচার্য

গল্পটি শুরু হয়েছিল গত বছর। তখন চতুর্থ সেমিস্টার পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন বাকি। বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন চার বন্ধু। হঠাৎ দীপ্ত বলে উঠলেন—‘সামনে তো হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতাটি হবে। চলো, আমরাও সেখানে যাই। ’ তবে সেটি সম্পর্কে তেমন জানা ছিল না অন্যদের। ফলে বন্ধুদের প্রতিযোগিতাটি সম্পর্কে খুলে বললেন তিনি। তাঁদের মধ্যে দীপ্ত সাহা পড়েন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, আরফ আঞ্জুম নগর ও পরিকল্পনা, সঞ্জীব ভট্টাচার্য ও আহমাদ রাশিক যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়েন। তাঁরা ১৩তম ব্যাচের ছাত্রছাত্রী।

প্রতিযোগিতাটি উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল বলে আরফের পরামর্শে দলের নাম রাখা হলো ‘অস্থায়ী আশ্রয়’ বা ‘স্যাংকটাম’। চার পর্বের এই প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডের নাম ছিল ‘মেরি গো রাউন্ড’।

সেটি হয়েছিল গত বছরের ২৭ অক্টোবর। তাতে ১৭৯টি দল অংশ নিয়েছিল। প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ৮০০ জনের কাছাকাছি। এই রাউন্ডে প্রত্যেক প্রতিযোগী তাঁদের ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। এই রাউন্ডটি হয়েছিল বুয়েটের ক্যাফেটেরিয়ায়। বিচারকরা প্রতি টেবিলে ১০ জন প্রতিযোগী নিয়ে বসেছিলেন। আর তাঁরা সেই মানবিক সমস্যাটির সমাধান করছেন। এ দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই নদীভাঙনের শিকার উদ্বাস্তুরা আছেন। ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন তাঁরা ঢাকায় থাকেন। একসময়ের সচ্ছল এই পরিবারগুলোর ঠিকানা হলো বস্তি। কিভাবে তাঁদের স্বাবলস্বী করে তুলতে হবে, সেই পরিকল্পনা করেছেন তাঁরা। চার টেবিলে ছিল অস্থায়ী আশ্রয়ের চার বন্ধু। আলাদাভাবেই পরিকল্পনা করেছেন তাঁরা। কী ছিল তাঁর পরিকল্পনা—এই প্রশ্নের জবাবে আরফ বললেন, ‘চার পরিবারের চারজনকে আমরা এক হাজার টাকা করে দেব। এই ঋণের টাকা নিয়ে তাঁরা আশপাশে চায়ের দোকান দেবেন। সেই টাকার আয় থেকে দুই মাসের মধ্যে তাঁরা টাকা শোধ করে দেবেন। নিজেরাও সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করবেন। ’ সেই টাকা অন্য কোনো খাতে নয়, অন্য পরিবারগুলোর মধ্যে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। ’ সঞ্জীবের পরিকল্পনা ছিল—‘কিছুদিন আগে এক সবজিওয়ালার সঙ্গে কথায় কথায় জেনেছিলাম—প্রতিদিন সবজি বিক্রি করে তিনি প্রায় দ্বিগুণ লাভ করেন। আমার ভাবনা ছিল—ছয়টি পরিবারের প্রধানকে আমি সবজি কেনার মূলধন হিসেবে ৫০০ টাকা দেব। তাঁরা বিক্রিবাট্টা করে দৈনিক ৫০০ টাকা করে ফেরত দেবেন। পরদিন এই টাকা আবার নতুন দুটি পরিবারকে মূলধন হিসেবে দেওয়া হবে। এভাবে পুরো বস্তির মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়া হবে। ’ তাঁদের দলের আরেকজন দীপ্ত জানালেন, ‘ছয়টি পরিবারের ছয় পুরুষকে আমি চানাচুর ব্যবসার জন্য ৫০০ টাকা দেব। আর বস্তির মহিলাদের খাবারের হোটেলের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হবে। তাঁরা প্রতিদিনের আয় থেকে ঋণের টাকা শোধ করে দেবেন। শিশু শিক্ষার পেছনেও কিছু টাকা ব্যয় করা হবে। ’ রাশিকের পরিকল্পনা ছিল এমন—‘পাঁচ পরিবারকে রাস্তার পাশে খাবারের দোকানের জন্য আমি মূলধন জোগাব। সেই টাকায় তাঁরা ব্যবসা করবেন। আবার ঋণও শোধ করবেন। ’ বিচারকরা তাঁদের সবার পরিকল্পনাই গ্রহণ করেছেন। এই পর্ব থেকে তাঁরাসহ মোট ৪৭টি দল পরের পর্বে অংশ নেওয়ার টিকিট পায়।

অ্যাবস্ট্রাক্ট রাউন্ডের শুরু হয়েছিল গত বছরের ৬ নভেম্বর। এই পর্বে পাঁচ বছরের মধ্যে এক কোটি উদ্বাস্তুর কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা জমা দিতে হয়েছিল তাঁদের। সমস্যাটি অনেক বড়। ফলে আরো ভালো করে পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন তাঁরা। অনেক পরিকল্পনা আঁটলেন। কিন্তু কোনোটিই মনে ধরল না। হঠাৎ ভাবনাটি পেয়ে গেলেন দলনেতা আরফ আঞ্জুম—‘কেঁচোর চাষ করলে কেমন হয়? কেঁচোকে আমরা সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করতে পারি। আবার মাছের খাবার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে বলে চাষ করতেও খুব সুবিধা হবে। ’ পরিকল্পনাটি বিচারকদের পছন্দ হলো। তাঁরা এটি কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা জানতে চাইলেন। এই পরিকল্পনা নিয়েই শুরু হলো পরের রাউন্ড। এটির নাম ছিল পিচ পারফেক্ট রাউন্ড। এখানে ছিল ৩০টি দল। ‘অস্থায়ী আশ্রয়’-এর প্রজেক্টটির নাম ছিল ‘গ্লোবাল ওরমিং’। ওরমিং মানে কেঁচো। আর তাদের দলের স্লোগান ছিল—‘কেঁচো চাষ করে দুনিয়া বদলে দাও’। তবে সেখানে তাঁরা গবেষণা করে কিভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হবে তা-ও বলেছেন। এ জন্য তাঁরা সার ও মাছের খাবার উৎপাদন করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গিয়েছেন। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন—মাছের খাবার তৈরি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি মাসে হাজার দুয়েক মেট্রিক টন কেঁচো প্রয়োজন হয়। তবে পর্যাপ্ত কেঁচোর সরবরাহ না থাকায় কেঁচোর বদলে কম্পানিগুলো মাছের খাবার হিসেবে শুকনো খাবার ব্যবহার করছে। তবে মাছের জন্য কেঁচোই ভালো। কারণ শুকনো খাবারে প্রটিনের পরিমাণ ৬২ শতাংশ আর কেঁচোতে সেটি ৭৮ ভাগ। বৈশ্বিকভাবে কেঁচো চাষের জন্য আমাদের দেশ ছাড়াও তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন ভারতের তামিলনাড়ু ও আফ্রিকার কেনিয়া। কেন এই দেশগুলো বেছে নিলেন—এই প্রশ্নের জবাবে রাশিক বললেন, ‘আমাদের নদীমাতৃক দেশে কেঁচোর চাষ আপনা-আপনিই ভালো হবে। আর শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের ফলে ভারতের সেই প্রদেশে অসংখ্য উদ্বাস্তু বসবাস করে। আমাদের থিমই ছিল উদ্বাস্তুদের জীবনমান বদলে দেওয়া। সে জন্য ওই এলাকা বেছে নিয়েছি। এ ছাড়া কেনিয়ায়ও অনেক উদ্বাস্তুর বসবাস। ’ গত ১০ নভেম্বর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁরা যখন এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করছিলেন, সবাই সেগুলো গ্রহণ করেছেন। ফলে ‘অস্থায়ী আশ্রয়’ই সেরা দল হয়েছে।

এরপর পরিকল্পনা বাস্তবে রূপদান করতে হয়েছে তাদের। এই পর্বে তাদের মতো আরো পাঁচটি দল কাজে নেমেছিল। প্রথমে তাঁরা তিন হাজার ২০০ টাকার বাজেট দেয়। সেই টাকা হাতে আসার পর নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে কাজে নেমে পড়ে। কিভাবে কেঁচোর চাষ করতে হয়, তা জেনেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন এডুকেশন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান সরকারের কাছে। তিনি বলেছিলেন, ‘কেঁচোর বংশবৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়। এক মাস পর এক কেজি কেঁচো দুই কেজিতে পরিণত হয়। পরের মাসে সেটি হয় চার কেজি। অন্য কোনো খাবারও তাদের লাগে না। রান্নাঘরের ফেলে দেওয়া তরিতরকারি দিলেই হলো। ওরা সেগুলো খেয়ে দিব্যি থাকে। ’ ফলে বাজার থেকে দুই কেজি কেঁচো কেনা হয়। প্লাস্টিকের বালতিতে মাটি ও পানি ভরে সেগুলোর চাষ শুরু করা হলো। কিভাবে কাজ করেছেন, সেটি দেখানোর জন্য এই দলের সদস্যরা মঞ্চে সেই প্লাস্টিকের বালতি ভর্তি কেঁচো নিয়ে যান।

এই রাউন্ডটি হয়েছিল গত ৬ ডিসেম্বর। কিভাবে কাজ করেছেন, সেটি ব্যাখ্যার পর তাঁরা বিচারকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। মাঠে কাজের গল্প শোনান সবাইকে। একসময় বালতিতে কেঁচোর হয় কি না—এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সঞ্জীব হাতে কেঁচো নিয়ে বিচারকদের সামনেও চলে গিয়েছিলেন। এই দলের কাজের প্রতি এত আগ্রহ দেখে খুব অবাক হয়েছেন তাঁরা। বুয়েটের অডিটরিয়াম ভর্তি অতিথি ও শিক্ষার্থীদের সামনে বাংলাদেশ পর্বের বিজয়ী হিসেবে ‘অস্থায়ী আশ্রয়’-এর নাম ঘোষণা করা হয়। তখন তাঁরা তাঁদের মেন্টর কিবরিয়া প্রাঙ্গণের নামটি জানাতে ভোলেননি। দলনেতা আরফ বললেন, ৪৪টি দলের সঙ্গে মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য এই মাসের শেষে তাঁরা চীনে যাচ্ছেন। প্রতিযোগিতাটি আগামী ২ মার্চ থেকে শুরু হবে।  


মন্তব্য