kalerkantho


দিনটা ছিল বই পড়ার

ডিজিটাল যন্ত্রপাতি আর ইন্টারনেটের এ সময়েও যে ছাপা বইয়ের কদর একটুও কমেনি, সেটা এবার হাতেনাতে প্রমাণ করে দিল পড়ুয়ারা। ময়মনসিংহের একটি মাঠে একসঙ্গে বই পড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে একদল কিশোর-কিশোরী। এক শ-দুই শ নয়, গুনে গুনে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী বই পড়েছে একসঙ্গে। বই পড়ার এ মহা আয়োজনের বিস্তারিত জানাচ্ছেন আমাদের হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি নাসরুল আনোয়ার

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দিনটা ছিল বই পড়ার

এখন নাকি কেউ বই পড়ার সময় পায় না। আসলেই তাই? ধারণাটা ভুল প্রমাণ করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগটা নিল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা প্রশাসন।

ভাগলপুর নাজিম ভূঁইয়াবাড়ির ঈদগাহ মাঠে আয়োজন করল বই নিয়ে এক মহাযজ্ঞের।

এক মাঠে ৫০০০

২১ জানুয়ারি। উৎসব শুরুর কথা সকাল ১১টায়। কিন্তু ৯টার মধ্যে হাজির সবাই! মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হলো মাঠে। ঘোষণা শুনে স্বেচ্ছায় এসেছে সবাই। সবার হাতেই বাংলা বই। একটি গল্পের বইয়ের এত কপি জোগাড় করা কষ্টসাধ্য। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্য বইটাই সঙ্গে আনার কথা বলা হলো। একসঙ্গে সবাই বসে পড়তেই শুরু হলো পড়া।

মগ্ন হয়ে বই পড়ছে পাঁচ হাজার ছেলে-মেয়ে! একই মাঠে, পাশাপাশি। পড়ছে নিজ নিজ পাঠ্য বইয়ের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনবিষয়ক গল্প ও প্রবন্ধ। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই যেন কল্পনায় মুক্তিযুদ্ধকে এক ঝলক দেখে নিচ্ছিল। টানা এক ঘণ্টার জন্য যেন মুগ্ধতার চাদরে ঢাকা পড়ে গোটা বাজিতপুর।

আয়োজনের কমতি চোখে পড়ল না কোথাও। মাঠের চারপাশে শিক্ষামূলক স্লোগান লেখা বোর্ড ও ফেস্টুন। সব কিছু মিলে যেন ফেব্রুয়ারির আগমনী বার্তাই দিচ্ছিল।

বই পড়া শেষ হতেই দুই হাত উঁচিয়ে বছরের একটি দিনকে ‘বইপড়া দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে ছেলে-মেয়েরা। আয়োজকদের স্বপ্ন, বাজিতপুর থেকেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বইপড়া আন্দোলন।

 

কেন এ উৎসব?

বারবার একটা শব্দই উঠে আসছিল আলোচনায়—ফেসবুক! সঙ্গে ইন্টারনেটের নানা ক্ষতিকর প্রভাব তো আছেই। সেসব থেকে সরিয়ে আনতেই এ বইপড়া উৎসব। আয়োজকরা জানান, সরকার ১ জানুয়ারি উদ্‌যাপন করছে বই বিতরণ উৎসব। কিন্তু বই পড়ায় তাগিদ বাড়াতে বইপড়া দিবস নেই। বিতরণ দিবসের মতো বছরে একটি দিন বই পড়ার হলে ভালো হয়। আয়োজকদের দাবি, এখন পর্যন্ত এটিই দেশের সবচেয়ে বড় বই পড়ার আয়োজন।

বেশ আগ্রহ নিয়েই ছেলে-মেয়েরা ওই দিন দলে দলে মাঠে আসে। সকাল ১১টার মধ্যেই কানায় কানায় ভরে যায় মাঠে ফেলা বেঞ্চগুলো। কিন্তু বসার জায়গা হয় না সবার। তাই বলে বই পড়া হবে না? কয়েক শ ছাত্র-ছাত্রীকে দেখা গেল মাঠের দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাতে বই নিয়ে পড়ছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের পৌরসভা বাজিতপুর শহরের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিল এ দিন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ। পায়রা উড়িয়ে উৎসব উদ্বোধন করেন তিনি।

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘বাজিতপুরের মাঠ থেকেই বইপড়া আন্দোলন শুরু হলো। বই পড়েই জেলা প্রশাসক, ইউএনও হওয়া যায়। না পড়লে আমিও অশিক্ষিত থেকে যেতাম। ’

বই পড়া শেষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয় কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আজিমউদ্দিন বিশ্বাসের সভাপতিত্বে। বাজিতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তসলিমা নূর হোসেন ও যুব উন্নয়ন অফিসার আব্দুল কাদির ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ, বাজিতপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছারওয়ার আলম, ইউএনও ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি, পৌরসভার মেয়র আনোয়ার হোসেন আশরাফ প্রমুখ।  

মাঠজুড়ে থাকা বিলবোর্ড-ব্যানারে শোভা পায় ‘বই পড়ি, আনন্দ খুঁজি’, ‘গ্রন্থাগার বিলাসিতা নয়, জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তু’, ‘বই পড়ি, দেশ গড়ি’—এসব স্লোগান। উৎসব উপলক্ষে ওই দিনই সন্ধ্যায় আফতাবউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে পরিবেশিত হয় গীতিনাট্য আলেখ্য ‘ইতিহাস কথা কয়’। মানস কর নির্দেশিত এ আলেখ্য শিক্ষার্থী ও অতিথিরা উপভোগ করেন।

 

কী পড়ল, কেমন লাগল

‘এভাবে বই পড়ে কেমন লাগছে?’ আফতাবউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র তাহিয়াতুল ইসলাম বলে, ‘খুবই ভালো লাগছে। ’ সে পড়ছে তার বইয়ের জাহানারা ইমাম রচিত স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের দিনগুলি’। ওই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী উপমা রহমান পড়ছিল বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। উপমা জানায়, সে বই পড়েই জেনেছে, পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠোমো ভেঙে বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন। সে জন্য বঙ্গবন্ধুকে জেলে যেতে হয়েছিল।

সপ্তম শ্রেণির পাঠ্য ‘সপ্তবর্ণা’ বইয়ে থাকা আবুবকর সিদ্দিকের ভাষা দিবসের গল্প ‘লখার একুশে’ পড়ছিল আফতাবউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আলী আল আবরার রিজভী। সে জানায়, বাক্প্রতিবন্ধী লখার একুশের গান গাইতে না পারার মনোবেদনা নিয়ে গল্পটি লেখা। লখা অন্যদের সঙ্গে কেবল ‘আ...আ...’ করছে। মনে হলো, লখার হাহাকার রিজভীকেও ছুঁয়ে গেছে। হাফেজ আ. রাজ্জাক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র পরাগ হোসেন প্রান্ত জানায়, সে এর আগে এত বড় ছাত্রজমায়েত আর দেখেনি। সে আরো বলে, এ উৎসব তার পড়ায় আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নাজিরুল ইসলাম কলেজিয়েট স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মাইমুনা খান বলল, ‘এতজন মিলে একসঙ্গে বই পড়ছি! বাজিতপুরেই তা করে দেখাচ্ছি আমরা। এটা কল্পনাতীত। সরকারের কাছে আমার দাবি, যেন ২১ জানুয়ারিকে বইপড়া দিবসও ঘোষণা করা হয়। ’ রাজ্জুকুন্নেছা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী নওশিন আক্তার পড়ে শওকত ওসমানের লেখা গল্প ‘তোলপাড়’। সে জানায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলার পর এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার প্রাণপণ সংগ্রামের গল্প এটি।

নাজিরুল ইসলাম কলেজিয়েট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী অমৃতা রানী মন্দিরা বলে, ‘এতজনের সঙ্গে বই পড়তে এসে বই পড়ার প্রতি আমারও আগ্রহ বেড়েছে। ’

পড়া উৎসব শেষ হওয়ার পর ইউএনও ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, ‘তোমরা এখন থেকে প্রতিবছর এমন বইপড়া উৎসবে মিলিত হতে চাও’? তাঁর কথা শুনে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে চিত্কার দিয়ে বলে ওঠে ‘বইপড়া উৎসব’ চাই।

 

গুণীজনে কহেন

বই পড়া দেখতে এসে বিস্মিত বড়রাও। মাঠের চারধারে এমন অনেক অভিভাবক, শিক্ষককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বাজিতপুর কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ ফজলে এলাহী মো. গোলাম কাদের বলেন, ‘এ কর্মসূচি ছেলে-মেয়েদের বই পড়ায় উৎসাহী করবে। ওদের বিপথে নেওয়ার যে উপকরণগুলো আছে, এ উৎসব তাদের সে পথগুলো থেকে বাঁচাবে। ’

তাঁর মতে, শিক্ষিত বড়রাও বই পড়া থেকে দূরে। এ অনুষ্ঠান বড়দেরও বই পড়ায় উৎসাহ জোগাবে।

বাজিতপুর কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আ. কা. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এককথায় অভূতপূর্ব। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বইপড়া উৎসব। সারা দেশে এমন উৎসবের ধারণা ছড়িয়ে দিতে পারলে খুবই ভালো হয়। ’

আফতাবউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সেলিনা আখতার বলেন, ‘বইপড়া উৎসবে এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা পড়েছে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির স্বাধীনতা বিষয়ে নানা গল্প-প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা। পাঁচ হাজার শিশু বড় হয়ে এ স্মৃতি মনে করবে। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ওদের মনে প্রবেশ করেছে। ’

ভাস্কর দেবনাথ আরো জানান, মূলত সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়।

তিনি জানান, এ উদ্যোগ সফল করতে এলাকার শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সচেতন মহল বেশ পরিশ্রম করেছে, সমর্থন দিয়েছে। তারাও চায় এ উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে।

 

ছবি : প্রতিবেদক


মন্তব্য