kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেডিক্যাল স্মৃতি

সন্ধানীই ছিল আমার প্রেম

পড়েছেন তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে। নাটক ও গান করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। সন্ধানীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। আতাউর রহমান কাবুলকে রঙিন সেই দিনগুলোর গল্প শোনালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক কামরুল হাসান খান। তাঁর ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সন্ধানীই ছিল আমার প্রেম

১৯৭৬ সালের মাঝামাঝিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলাম। আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল ৮ নভেম্বর।

তার আগের দিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে পৌঁছলাম। সম্ভবত সেদিন সাংস্কৃতিক সপ্তাহের শেষ দিন ছিল। আলোঝলমল চারদিক। অডিটরিয়ামে ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’ নাটকটি দেখলাম।

আমাদের ক্যাম্পাসটি ছিল চমৎকার। প্রচুর ফাঁকা জায়গা, গাছগাছালি, বাগান আর নতুন নতুন ভবন ছিল। তবে হোস্টেলে সিট সংকট ছিল। ফলে বাগমারা হোস্টেলে ডাবলিং করে থাকতে হতো। হোস্টেলের মধ্যখানে পুকুর, চারদিকে নতুন-পুরনো ভবন। বর্ষাকালে পুকুরে থই থই পানি, বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ পড়ত! 

প্রথম থেকেই ব্যাচমেটরা সবাই বন্ধু হয়ে গেছি। প্রথম বর্ষ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সবাই মিলে গিয়েছিলাম রাজেন্দ্রপুরে। দিনটি ছিল ১৯৭৮ সালের ৮ জানুয়ারি। গিয়েই হইচই শুরু করে দিলাম। হঠাৎ দেখি একটি গরুর গাড়ি যাচ্ছে। লাফিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। সাত-আটজনের গাড়িতে উঠে গেছি ২০-২৫ জন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। গরু দুটি আর সামাল দিতে পারল না। একটি গেল ছুটে, অন্যটি একাই গাড়িটি কিছু দূর টেনে নিয়ে গেল। ততক্ষণে গাড়ি উল্টে গেছে। লাফ দিতে গিয়ে আমি সরু ড্রেনের মতো এক খালে পড়ে গেলাম। বন্ধুরা হাত তালি দিতে লাগল, কিন্তু আমি তো আর উঠে দাঁড়াতে পারছি না। একটু পর হুঁশ হলো ওদের। সবাই এসে দেখে আমার পা ভেঙে গেছে। সন্ধ্যায় ময়মনসিংহে পৌঁছে এক্স-রের পর চিকিৎসা শুরু হলো। ওই দুর্ঘটনায় টানা সাড়ে তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হলো। এরপর বাড়িতে ছিলাম ১৫-২০ দিন। তবে চার মাস ক্লাশ না করেও প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় ভালোভাবেই পাস করেছি।

প্রথম বর্ষেই আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছি। স্কুলে থাকতে গান-নাটক করতাম বলে এগুলোয় আমার আগ্রহ বেশিই ছিল। আমাদের একটা গ্রুপ ছিল। কিছু হলেই বলতাম, চল, নাটক করি।

মনে আছে, থার্ড ইয়ারে ‘চারদিকে যুদ্ধ’ নাটকে হিরোর রোল করেছি। আইল্যান্ড, ক্যান্টিনে আড্ডা দিতাম। দুপুর-বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদ, জয়নুল সংগ্রহশালায় ঘুরতাম। মাসে এক দিন ও বছরে এক দিন হলে ফিস্ট হতো। যে যত খুশি ডাল-ভাত, মাছ-মাংস খেতাম।

মেডিক্যাল লাইফের প্রথম থ্রিলটা পেয়েছি অ্যানাটমি ক্লাসে। প্রথম বর্ষের অ্যানাটমি প্রাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য ডিসেকশন রুমে (লাশকাটা ঘরে) যেতে হলো। প্রথম দিন রুমে ঢুকেই ফরমালিনের উত্কট গন্ধ পেলাম। দেখি, জাদুঘরের মতো বিশাল এক রুম, প্রতিটি টেবিলে একটি করে লাশ। তাতে অবশ্য ভয় পাইনি। ছয়টি ভাগ করা লাশের হাত নিয়ে প্রাকটিক্যাল শুরু হলো। খালি হাতে প্রাকটিক্যাল করতে গিয়ে হাতে যে চর্বি লেগে গেছে টেরও পেলাম না। পরে দুপুরে খাওয়ার সময় সে কি বিব্রতকর পরিস্থিতি! তবে দুই-এক দিনের মধ্যেই সয়ে গেল সব। ফ্রি টাইমে কাজ করতে হতো বলে ডিসেকশন রুমে আড্ডা, গল্প জমত। আস্তে আস্তে সেটি আমাদের ক্লাবঘরের মতোই হয়ে গেল।  

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে সন্ধানীর প্রতিষ্ঠাতাদের  আমিও একজন। সন্ধানীর কার্যক্রম মূলত ঢাকা মেডিক্যালে শুরু হলেও আমাদের কলেজে অল্প দিনেই সন্ধানীকে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। সন্ধানীর আজকের যে অগ্রগতি, তার সূত্রপাত কিন্তু ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে। আমি ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

সন্ধানীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বলতে পারি, সেনাবাহিনীর মতো নিয়মকানুন মেনে চলেছি আমরা। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল এটি একটি ইনস্টিটিউশন হবে। সন্ধানীর গঠনতন্ত্রও আমাদের হাতেই তৈরি। সন্ধানীই ছিল আমার প্রেম। সন্ধানী না করলে হয়তো কোনো রক্ত-মাংসের মানবীর সঙ্গে প্রেম করতাম। আজও তাই সন্ধানীর সঙ্গে আছি।

শিক্ষকদের নিয়েও আমার অনেক স্মৃতি। আমাদের অধ্যক্ষ ছিলেন ফিজিওলজির প্রফেসর ফজলুল করিম। তিনি নিজেও সংস্কৃতমনা ছিলেন। ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। অ্যানাটমির প্রফেসর আব্দুল হাই ফকির ছিলেন খুব রাশভারি টাইপের, হাসতেনই না। আমরা ঠিকমতো পড়ছি কি না, ডিসেকশন করছি কি না—এসব দেখতে সব সময় রাউন্ড দিতেন। তাঁকে দেখলেই আমাদের ভয়ে থরথর অবস্থা হতো, দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিতাম। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই গম্ভীর, জাঁদরেল ফকির স্যার পরীক্ষার হলে ছিলেন খুবই নরম। কিভাবে ভালোভাবে পরীক্ষা দিয়ে পাস করব সে ব্যাপারে তাঁর দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। আর যেকোনো পরীক্ষা দিয়েই দল বেঁধে সিনেমা দেখতে চলে যেতাম। তখন এটিই ছিল আমাদের বিনোদন।

এমবিবিএস পাস করেছি ১৯৮২ সালে, ১৯৮৩ সালে ইন্টার্ন। সহপাঠীরা সবাই পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছে, ভালো ভালো অবস্থানে আছে। মাঝেমধ্যে রি-ইউনিয়ন করি। সামনে আমাদের এম-১৪ ব্যাচের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হবে।

আমি এখনো সেই ক্যাম্পাস লাইফকে মারাত্মক মিস করি। তবে খারাপ লাগে, এখনকার প্রজন্ম আমাদের সময়ের সেই পরিবেশ পাচ্ছে না। আমাদের সময় রাজনৈতিক কারণে যারা মারামারি করত, পর দিনই তারা আবার একসঙ্গে বসে চা খেত, গল্প করত।

এখন তো এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে হলেই থাকতে দেয় না। পড়াশোনার চাপ, শত ব্যস্ততায়ও আমাদের সময় সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার যে চর্চা ছিল, সামগ্রিকভাবে সেটি এখন আর নেই।


মন্তব্য