kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্লাসরুম হোক ফার্স্ট ক্লাস

পড়া নিয়ে তো ভাবনার অন্ত নেই। কিন্তু চার দেয়ালের মধ্যে যে কক্ষটায় কাটাতে হয় অনেকটা সময়, ভাবার আছে তা নিয়েও। শ্রেণিকক্ষেরও আছে কিছু নিয়মকানুন। জানাচ্ছেন মিজানুর রহমান

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ক্লাসরুম হোক ফার্স্ট ক্লাস

অঙ্কন: মাসুম

পড়াশোনার ফাঁকে এবার স্কুল নিয়ে একটু ভাবা যাক। দেয়ালটা কেমন? মেঝেটা ঠিকঠাক আছে? জানালা দিয়ে আলো-বাতাস ঢুকছে তো? নাকি ক্লাসে বসলেই দম বন্ধ দম বন্ধ লাগে।

কোনো স্কুলে বিশাল মাঠ, কোনোটায় আবার নেই একচিলতে খেলার জায়গা। কোনো স্কুল বিশাল ভবনে, আবার কোনোটি খুব ছোট। দেয়ালগুলোও কেমন একঘেয়ে সাদা। স্কুলভবনটা রাশভারী ঠেকছে খুব? তবে কেমন হওয়া চাই আদর্শ স্কুলের নকশা?

প্রথমেই চাই খোলা মাঠ। এ দিক দিয়ে সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা ভাগ্যবান। বেসরকারি স্কুলগুলোতে মাঠ নেই বললেই চলে। দলবেঁধে মাঠের খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শরীর তো বটেই, মনটাকেও ভালো রাখে।

কক্ষের ভেতরে কী থাকে? সারি সারি বেঞ্চ আর একটি ব্ল্যাকবোর্ড। আছে জানালা আর একটি বা দুটি দরজা। নকশাবিদরা বলছেন, ভাবার আছে দেয়ালের রং নিয়েও। রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগেরই দেয়ালের রং সাদা। আর্কিডেন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ইনটেরিয়র স্থপতি সুহেলি শাইমা শানজুতি বলেছেন, দেয়ালের নকশার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায়। প্রাইমারি স্কুলের দেয়ালে মৌলিক রং তথা লাল-সবুজ-নীল থাকা প্রয়োজন। থাকতে পারে হলুদ, সবুজ, কমলা ও বেগুনিও। তবে এটা শুধু দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকলেই হবে না। চেয়ার-বেঞ্চ এমনকি বইগুলোও যদি এমন রং বেরঙের হতো তাহলে নতুন মাত্রা যোগ হতো। একটু বড় শ্রেণিতে পড়ুয়ারা অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দেয়াল রঙিন না হলেও সমস্যা নেই। তবে শানজুতি বলেন, দেয়ালটির দিকে তাকিয়ে যেন মন খারাপ না হয়ে যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যেমন একেবারে গাঢ় কোনো রং থাকলে চোখ জ্বালা করতে পারে, আর একেবারে রংচটা দেয়াল হলে মন খারাপ হতে পারে। তাই বিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত, নিয়মিত দেয়ালের রং পরিবর্তনের বিষয়ে খেয়াল রাখা।

শ্রেণিকক্ষের জানালা নিয়েও চিন্তাভাবনা জরুরি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিষয়ের শিক্ষক শেখ রুবাইয়া সুলতানা বলেন, এই বিষয়ে আপস চলবে না। স্কুলের নকশা করতে গেলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস লাগবেই। ভেনটিলেশন অবশ্যই ভালো হতে হবে। এটা দুরকম— প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম। প্রাকৃতিক ভেনটিলেশন মন ভালো রাখে।

বিদ্যালয়ের নকশার বিষয়ে রুবাইয়া আরো বলেন, উত্তরের আলো লেখাপড়ার জন্য ভালো। আলো দুদিক থেকেই আসে। তবে উত্তরের আলো মৃদু। বইপত্রের ওপরে পড়লে অস্বস্তি লাগে না। স্থপতিদের কাছে উত্তরের আলো আদর্শ। কারণ এর তীব্রতা কম। শিল্পীদেরও এই আলো পছন্দ। অপরদিকে দক্ষিণের আলোর তীব্রতা বেশি। তাই স্থপতিরা তাদের নকশায় এটাকে যতটা সম্ভব দূর করার চেষ্টা করেন।

কৃত্রিম ভেনটিলেশন করতে গেলে চাই যন্ত্রপাতি। শহরে এমন স্কুল দেখা যায় যেগুলো একটি বাড়ির মধ্যেই তৈরি হয়েছে। এমনও স্কুল আছে, যেগুলোতে জানালা রাখার সুযোগই নেই। সেখানে চাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। বাতি নিয়ে সানজুতি বলেন, শ্রেণিকক্ষের বাতির আলো কৃত্রিম হলেও এখন প্রাকৃতিক আলোর মতো দেখতে অনেক বাল্ব পাওয়া যায়। তবে তা তীব্র হওয়া যাবে না।

সমস্যার আরেক নাম এসি। এটি উপভোগ্য হলেও শরীরের জন্য কিছুটা ক্ষতিকর। বিশেষ করে যাঁদের সাইনোসাইটিসের সমস্যা আছে, এসিতে তাঁদের শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। দেখা দেবে মাথা ও চোখে ব্যথা। এ ছাড়া আর্দ্রতার অভাবে ত্বক ও মুখ শুকিয়ে আসতে পারে। ত্বক হয়ে যাবে খসখসে। এর কারণ হিসেবে ডা. সিরাজুম মনিরা বলেন, এসির কারণে বদ্ধ শ্রেণিকক্ষের আর্দ্রতা কমে যায়। যাদের ঠাণ্ডার সমস্যা আছে তাদের জন্যই এটা বড় সমস্যা।

এসির এই সমস্যা সমাধান করতে বিশেষজ্ঞরা হিউমিডিফায়ার নামে একটি যন্ত্র ব্যবহার করার উপদেশ দিয়ে থাকেন। এটি জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ায়। এর মধ্যে পানি দিতে হয় যা তাপে গরম হয়ে বাষ্প হয় এবং সেই বাষ্প কক্ষে ছড়িয়ে যায়।

নকশাবিদ সানজুতি বলেছেন, ‘শ্রেণিকক্ষের নকশা এমন হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা আরামের সঙ্গে শিখতে পারে। শিশুদের স্কুলের মেঝেতে মোটা কার্পেট থাকা চাই। চেয়ার বেঞ্চ থেকে শুরু করে শিক্ষকের টেবিল ও দরজায় থাকতে পারবে না কোনো ধারালো কোণা। মোটা কার্পেট লাগবে, কারণ শিশুরা যেকোনো সময় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে পারে। ’

বেঞ্চও তুলে দেওয়ার পক্ষে তিনি। ‘মেঝেতে বসেই তারা শিখতে পারে। রং বেরঙের ছোট ছোট চেয়ার-টেবিল রাখা যেতে পারে। যখন যার ইচ্ছা হবে বসবে। ’ তবে দেয়ালের ব্যবহারের দিকেই জোর দিয়েছেন তিনি। দেয়াল কেন? শোনা যাক একটি অন্যরকম স্কুলের গল্প।

আমেরিকায় আছে এমন এক স্কুল, যেখানে দেয়ালটাই ক্লাসের মূল আকর্ষণ। ছাত্রছাত্রীরা তাদের পাঠ দেয়াল থেকেই শেখে। যুক্তরাষ্ট্রের মেনফিস টেনেসির উইনরিডগি এলিমেন্টারি স্কুল। বেঞ্চকে বিদায় জানিয়ে দেয়ালকেই বানিয়েছে খোলা বই। শিক্ষকও সেখানে বসে থেকে পড়ান না। এই স্কুলে যখনই কিছু পড়াতে হয় শিক্ষক তা দেয়ালে সেঁটে দেন। শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সাদা বোর্ড থাকে যার মধ্যে নির্দেশনা দেওয়া থাকে। শিক্ষার্থীরা পুরো ক্লাসরুম ঘুরে ঘুরে শেখে।

স্কুলটির শিক্ষক সারওয়ানডা সিজম বলেন, যখনই আমরা শিক্ষার্থীদের কিছু শেখাতে যাই, সেটাকে দেয়ালে সেঁটে দেই। দেয়ালের সঙ্গেই লাগানো থাকে বই। ছাত্রছাত্রীরা চাইলে বইগুলো হাতেও নিতে পারে। পাশাপাশি পাঠ নিয়ে তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলাপও করতে পারে।

আমাদের দেশেও এমন স্কুল আছে। রাজধানীর অরণি বিদ্যালয়ে প্রত্যেক শ্রেণির জন্য আছে আলাদা ধরনের শ্রেণিকক্ষ। সংগীতের ক্লাসে বসার পদ্ধতি এক রকম। চিত্রকর্মের জন্য আরেক রকম। চেয়ারের সাইজেও আছে মুন্সিয়ানা। বিদ্যালয়টির ধানমণ্ডির ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেল সেখানে স্কুলের সামনে ছোট্ট মাঠ। সেখানে দোলনা ও স্লাইডার রয়েছে। বিদ্যালয়টির শিক্ষক শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘আমাদের স্কুলটি প্রচলিত স্কুল থেকে আলাদা। এখানে ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণি, বয়স ও বিষয়ের কথা মাথায় রেখে নানা সৃষ্টিশীল আয়োজন রাখা হয়েছে। ’

এ ছাড়া নকশাবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বাগান করে। জানালার পাশেই পানির বোতলে লাগিয়ে দিতে পারে পাতাবাহার। টবে লাগাতে পারে অর্কিড। সবুজ যত বেশি ততই ভালো। শ্রেণিকক্ষটি ছাদের নিচে হলে ছাদে পুরো বাগান করে ফেলারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এতে ছাদ গরম হয়ে গ্রীষ্মকালে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশকে অসহনীয় করতে পারবে না।

ব্ল্যাকবোর্ডের পরিবর্তে হোয়াইট বোর্ড ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা। কারণ খড়িমাটির দাগ মুছতে গেলে ধুলা উড়ে ছাত্রছাত্রীর নিশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যেতে পারে।

 

এক নজরে

ছোটদের জন্য থাকা চাই রঙিন শ্রেণিকক্ষ।

বড় জানালা থাকলে ভালো।

উত্তর-পূর্বের আলো পড়াশোনার জন্য উপকারী।

এসি থাকলে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের হিউমিডিফায়ারও রাখতে হবে।

ধারালো কোনা থাকা যাবে না।

দেয়াল ব্যবহারের সুযোগ থাকলে শিক্ষার্থীরা মজা নিয়ে শিখতে পারবে।

ব্ল্যাকবোর্ড না রেখে হোয়াইটবোর্ড রাখা ভালো।

শ্রেণিকক্ষে ইনডোর প্ল্যান্ট লাগানো যেতে পারে।

ছাদে বাগান করে গ্রীষ্মের গরম থেকে বাঁচা যায়।


মন্তব্য