kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টিফিনে কী খাবে, কী খাবে না

স্কুলের নিত্যসঙ্গী টিফিনের বাক্স। আর একে ঘিরে কতই না আনন্দ কাজ করে! তবে বাক্স যেমনই হোক, ভেতরের খাবারটা হওয়া চাই স্বাস্থ্যকর। কারণ খাবারটাই তোমাকে সারা দিন পড়াশোনার জন্য জোগাবে শক্তি। বাকিটা শোনা যাক মিজানুর রহমানের কাছ থেকে

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টিফিনে কী খাবে, কী খাবে না

টিফিন শুনলেই হালকা কোনো খাবারের কথা মনে হয়? স্কুলের টিফিন মোটেও হালকা বিষয় নয়। এই বাক্সটিই তোমাকে স্কুলের পড়াশোনায় চাঙ্গা রাখে।

তাই এই টিফিন নিয়েও কিন্তু ভাবতে হবে। হতে হবে সচেতন।

তোমাদের মধ্যে অনেকেই টিফিনের সময় বাইরের খোলা খাবার খেতে পছন্দ করো। এটা একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তাই বড়দের কথা মেনে হতে হবে যত্নশীল।

এর আগে ক্যাম্পাস পাতায় তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছ জাপানের একটি স্কুলের কথা, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই নিজেদের টিফিনের জন্য সবজি উত্পাদন করে। আবার টিফিনের পর নিজেরাই সব পরিষ্কার করে। বিশ্রামের জন্যও সময় পায় তারা।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ স্কুলই নিজেরা টিফিন সরবরাহ করে না। তাই বাসা থেকে দেওয়া খাবারই ভরসা।

একেক স্কুলের টিফিনের সময় একেক রকম। টিফিনের সময় আলাদা হলেও খাবারে খুব একটা ভিন্নতা থাকে না। টিফিনের খাবারে চাই প্রচুর পরিমাণে শর্করা তথা কার্বোহাইড্রেট, যা সরাসরি মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। আর দুপুরে ক্লাস করতে হলে ভারী কিছু তো খেতেই হবে। ভারী খাবার মানে আবার একগাদা খিচুড়ি, বিরিয়ানি নয়। এগুলো খেলে পরের ক্লাসগুলোতে দেখা যাবে খুব গড়িমসি করছ, গাটাও ম্যাজম্যাজ করবে। ঝিমুনিও আসতে পারে।

আবার টিফিনের সময় একেবারেই কিছু না খেলেও একই বিপদ। লেখাপড়ায় মন বসবে না একফোঁটা। মাথা ব্যথা ও দুর্বলতা গ্রাস করবে দ্রুত।

তোমরা যারা শহরের স্কুলে পড়ো, তারা দেখে থাকবে যে টিফিনের সময় স্কুলের গেটের বাইরে ভেলপুরি, ফুচকা, চটপটিসহ অনেক খোলা খাবারের দোকান বসে। সেগুলো খুব খেতে ইচ্ছা করলেও অন্তত টিফিন হিসেবে না খাওয়াই উত্তম। কারণ এ সময় পেটে একটু উল্টোপাল্টা খাবার পড়লেই পরের ক্লাসগুলো ভেস্তে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে পেটের অসুখও।

ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের সামনে আফসানা বেগম নামের একজন অভিভাবকের সঙ্গে দেখা হলে তিনি জানান, তাঁর মেয়ে ওই স্কুলে পড়ে। তিনি বেশ চিন্তিত থাকেন তাঁর মেয়েটি বাইরের কোনো খাবার খাচ্ছে কি না। খোলা পানি নিয়েই তাঁর চিন্তাটা বেশি। তাঁর আশঙ্কা, খোলা পানি খেয়েই বুঝি জন্ডিস বাধায়।

তোমরা যারা শহরে পড়ো, তাদের যেখানে খোলা খাবার থেকে বিরত রাখা হয়, সেখানে গ্রামের স্কুলগুলোতে নিম্নমানের খোলা খাবারই বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর ভরসা। টিফিন কী তা-ই জানে না অনেকে। যাদের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের আবার টিফিন কিসের? বললেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই সন্তানের মা বিলকিস বেগম। এর ফলে গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের স্বল্প টাকায় বেছে নিতে হয় রাস্তার খোলা খাবার, যার প্রতিক্রিয়া বেশ ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের।

শিক্ষকরাও বিষয়টি নিয়ে সচেতন। মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘খোলা খাবার খেলে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। যেমন খোলা খাবার খেলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো। আর একবার অসুস্থ হওয়া মানে তুমি বেশ কয়েক দিন স্কুলে আসতে পারবে না। আর স্কুলে আসতে না পারা মানে হচ্ছে তুমি পিছিয়ে পড়লে। তাই সুস্থ থাকাটা খুব দরকার। ’

মাইলস্টোন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের খাবারের বিষয়ে শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁরা কেবল সরকার অনুমোদিত খাবার সরবরাহকারীদের কাছ থেকেই খাবার নেন। আর আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে নিজেদের রান্না করা খাবার।

তবে তিনি এও বলেন, কিছু কিছু স্কুলে দেখা যায় অতিরিক্ত ভারী খাবার দেওয়া হয়, যেমন—খিচুড়ি, বিরিয়ানি, যা একেবারেই উচিত নয়। এতে শিক্ষার্থীর মধ্যে তন্দ্রা ও অলসতা দেখা দেয়, যা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের জন্য একেবারেই ভালো নয়।

 

পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা কী বলেন

টিফিন নিয়ে ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. খুরশীদ জাহান। টিফিনের খাবার কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।

‘একটি শিশু সকালে যে নাশতা করে, সেটি যদি যথেষ্ট ক্যালরি, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ না হয়, তাহলে স্কুলে যাওয়ার পর শিশুটি কিন্তু ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারে না। এর ফলও ভালো হয় না। ওদের পাকস্থলী তুলনামূলক ছোট। তাই ওরা একসঙ্গে বেশি খেতে পারে না। ওদের তিন-চার ঘণ্টার ব্যবধানে আরেকটি স্ন্যাকস দেওয়া উচিত। আমাদের মস্তিষ্কের জন্য অনেক বেশি চিনিজাতীয় খাবারের দরকার। তাই শিক্ষার্থীদের শরীরে যদি কার্বহাইড্রেট বা চিনিজাতীয় খাবার কমে যায়, তাহলে সে ক্লাসে মনোযোগী হতে পারে না। এটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের অবশ্যই তিন-চার ঘণ্টা পর পর এমন একটি টিফিন বা স্ন্যাকস দেওয়া চাই, যা ক্যালরিসমৃদ্ধ হবে, সেই সঙ্গে থাকবে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফ্যাটসহ অন্যান্য মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট। যাদের বিকেল পর্যন্ত ক্লাস থাকে, তাদের একটি ভালো টিফিন অবশ্যই দিতে হয়। ’

গ্রামের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি বিষয়ে উদাসীনতা দূর করতে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। সরকারি স্কুলগুলোতে স্কুল টিফিন প্রোগ্রাম থাকতে পারে। প্রাইভেট স্কুলগুলোতে মনে হয় না এমন কোনো প্রোগ্রাম আছে। তাই যাদের টিফিনের ব্যবস্থা স্কুলে নেই, তাদের বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে দেওয়া উচিত। আর খাবারের মেন্যুর ব্যাপারে মায়েদের জানতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষকদেরও ভূমিকা আছে। স্কুল শিক্ষকরা অভিভাবকদের বলতে পারেন, শিশুদের জন্য কোন টিফিনটি দিতে হবে। ’ ডা. খুরশীদ আরো বললেন, ‘আমাদের শিশুরা অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন ও দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভোগে। দেশের ৪১ শতাংশ শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের কম, তাদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হয়। এর আগে আরো গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই সমস্যা রয়ে গেছে। আমাদের দেশের শিশুরা ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট তথা কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট তো বটেই, সেই সঙ্গে মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট তথা ভিটামিন-মিনারেলও পর্যাপ্ত পায় না। এ কারণেও কিন্তু অনেকে অকালে প্রতিযোগিতা থেকে ঝরে পড়ে। ’

 

জানো ও করো

► তোমাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি চিনি (সুগার) ভোগ করে। তাই তিন-চার ঘণ্টা পর পর অল্প পরিমাণে শর্করাজাতীয় খাবার খেতে হবে।

► মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় চিনির সরবরাহ না পেলে মনোযোগ দিতে পারবে না।

► খাবার হওয়া চাই হালকা। ভারী খাবারে আলস্য ভর করবে।

► তুমি নিজেই মা-বাবাকে স্বাস্থ্যকর টিফিন সম্পর্কে জানাতে পারো।

► দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর টিফিনে স্থায়ী অপুষ্টির শিকার হতে পারো। তাই টিফিনের ব্যাপারে সাবধান!

► বন্ধুদেরও টিফিন নিয়ে সচেতন করো। তা না হলে দেখবে কেউ একজন অসুস্থতার কারণে পিছিয়ে পড়বে, এমনকি পড়াশোনা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাই বাইরের খোলা খাবারকে সবাই মিলে ‘না’ বলে দাও।

 

খাবারে যা থাকা চাই

টিফিনে জনপ্রিয় রেসিপিগুলোর মধ্যে আছে স্যান্ডউইচ, ফ্রায়েড রাইস, রুটি ও সবজি, অন্যান্য স্ন্যাকস। এর মধ্যে যা-ই খাও না কেন, মনে রাখবে কার্বোহাইড্রেট বেশি আছে চাল, আটা, ওট, পাস্তা, নুডলস ও আলুতে। প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায় ডিম, দুধ ও মাছে। সেই সঙ্গে খনিজ উপাদানও আছে এসবে। উপকারী চর্বি পাওয়া যাবে অলিভ অয়েল, বাদাম, পনিরে। সঙ্গে শাকসবজি, যেমন—গাজর, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ভুট্টা ইত্যাদি থাকলে তো কথাই নেই।


মন্তব্য