kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আমরা সবাই রাজা

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, চা বাগান, জাফলংয়ের পাথরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে শেষ শিক্ষা সফর করলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের গল্প শোনাচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আমরা সবাই রাজা

এত দিনের ক্যাম্পাসজীবন শেষ হয়ে এলো বলে। প্রতিদিনের ক্লাস-পরীক্ষা-অ্যাসাইনমেন্টের পালা সাঙ্গ হতে যাচ্ছে।

কয়েক দিন পরই এই স্মৃতিগুলোতে ধুলা জমতে শুরু করবে। জব্বারের মোড়, টিএসসি, লাইব্রেরির গেট, নদীর পার, বিজয় একাত্তরের সামনে বা কেআর মার্কেটে আড্ডা দেওয়ার দিনগুলো গল্প হয়ে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে। ছাত্রী হলের সামনের হতাশার মোড়ে আর ঘোরাঘুরি হবে না, রাতভর কোনো চায়ের দোকানে গল্প জমবে না। তাই অনার্সের টানা চার বছরের বন্ধুত্বকে আরো স্মৃতিময় করে রাখতে যখন শিক্ষা সফরের কথা বলা হলো, আর কেউ না করতে পারল না। বরং একেকজনের হাসিমুখ দেখে মনে হলো, যেন খুশিতে লাফাচ্ছে। আমরা সবাই পড়ি কৃষি অনুষদে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে। যাচ্ছি সিলেটে বেড়াতে। যাওয়ার আগেই কিভাবে যাব, কোথায় থাকব আর কে কী পরিকল্পনা আঁটছে সেই গল্পগুলো শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। তারপর এক বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে হেলিপ্যাডে আস্তে আস্তে আসতে শুরু করল সবাই। রাত ১১টায় খাওয়াদাওয়া সেরে বাসে চড়ে বসলাম।

বাস একটানা ছুটছে। রাতের অন্ধকারে আধো ঘুম, আধো জাগরণে ভোরে এলাম সিলেটে। আগে থেকেই ঠিক করা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে আমাদের ব্যাগ রাখা হলো। সেখানে যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো। এরপর নাশতার জন্য ডাকাডাকি শুরু হলো। পেটপূজা সেরে চলে গেলাম জাফলংয়ের পথে। পিয়ানই নদীতীরের এই জায়গাটি অসম্ভব সুন্দর। স্তরে স্তরে বিছানো আছে পাথরের বিছানা। কেউ সেগুলোর ওপর হালকা চালে হাঁটতে লাগল, কেউ পাথরে বসে গল্প জমাল। আর আমরা কয়েকজন পাথরের ফাঁকে পানিতে হাত ডুবিয়ে বসে আছি। দূরে তাকিয়ে দেখি, পাহাড়ের টিলা দেখা যাচ্ছে। ওগুলো ভারতের। সেই পাহাড়ের নাম ডাউকি। ঝুলন্ত সেতুও দেখছি। এই নীরব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম সবাই। অনেকক্ষণ কান পেতে পাথরের বুক চিরে নদীর স্বচ্ছ জলের কলতান শুনলাম। ফিরে গিয়ে পানসিতে খাবার সারলাম। এরপর আর বিশ্রাম নয়, শহর দর্শনের পালা। ছোট ছোট টিলায় ঘেরা এই শহরকে সবুজের মায়ায় বেঁধে রেখেছে চা বাগানগুলো। একে একে বেড়ালাম চা বাগান, ক্যাডেট কলেজ, ওসমানী বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সন্ধ্যার মৃদু আলোতে ক্যাম্পাসটি সত্যিই অপরূপ লেগেছিল। সেখানে ঘুরে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার ঘুরে রাতের বিছানা পাততে আবার আমাদের গন্তব্য পল্লী উন্নয়ন একাডেমি। ততক্ষণে বৃষ্টি তার পরশ বুলিয়ে দিনের প্রচণ্ড গরমকে একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছে। ঠাণ্ডা এক পরিবেশে আমাদের গল্প জমল। প্রায় পুরো রাতই কাটিয়ে দিলাম খুনসুটি আর হাসি-গানে। মাহি, মোশাররফ, পায়েল, জনি, সোহান, মাসুম, তোহা, মারিয়া, কাদের দুষ্টুমিতে অন্যদের ছাড়িয়ে গেল। কখনো তারা প্যারোডি গায়, কখনো অভিনয় করে। তবে শেষরাতে আর পারা গেল না। ঘুমাতে চললাম। পরদিন ভোরে পেটে দানাপানি দিয়ে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক দেখাতে গাড়ি ছুটল।

মাধবকুণ্ড এক সুবিশাল পর্বতগিরি। সেখানে আছে শ্যামল বনরাজি। গাছপালা-ঝরনা ছাড়াও আছে নানা প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি, বানর ও কীটপতঙ্গ। বহুদূর থেকে কানে ভেসে আসা বিরাট পাহাড়ের ওপর থেকে অবিরাম গতিতে নামা জলরাশির প্রবল গর্জন দেখে অবাক, বিস্মিত হয়ে গেলাম। আর নিজেদের বাঁধ মানাতে পারলাম না। ঝরনায় গা ভেজাতে কার আগে কে যাবে সেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। একে অন্যকে ঠেলে আরো পানিতে নামিয়ে দিলাম। কখনো শুয়ে পড়ে পানির স্রোত আটকে দিচ্ছি। শিশুর মতো সরল খুশিতে মেতে আছি। সেলফি আর ক্যামেরার ক্লিক শেষে উঠে পড়লাম ভেজা শরীরে। ছবি তোলায় সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে সম্রাট, শিহান আর হাবিব। ফিরতি পথে আগের মতোই ছোট ছোট টিলার ওপর দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান, টিলার ভাঁজে ভাঁজে খাসিয়া পানের বরজ, জুমের জমি দেখছি। মনে রয়ে গেল—আমাদের বিভাগের আজহার স্যার খুব ভালো নাচতে পারেন, সুমন স্যারের গানের ভাণ্ডার এতই সমৃদ্ধ যে তিনি পুরো ভ্রমণেই অডিও প্লেয়ারের মতো গান গেয়ে গেছেন।

অনুলিখন : আবুল বাশার মিরাজ


মন্তব্য