kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অনেক গুণের মাসুমা

হলের সর্বোচ্চ সিজিপিএ এবং খেলাধুলায় সাফল্যের জন্য মাসুমা পেয়েছেন ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীকে নিয়ে লিখেছেন তাওহিদা তাসমিন। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অনেক গুণের মাসুমা

৮ আগস্ট ২০১৬। অনুষ্ঠানটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব হল মিলনায়তনে।

অতিথিদের মধ্যে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। হঠাৎ মঞ্চে ডাক পড়ল মাসুমার। তিনি এই হলের আবাসিক ছাত্রী। মাইকে ঘোষণা করা হলো, ‘এবারের বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেসা মুজিব মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক পেয়েছেন মাসুমা। ’ উপাচার্য যখন গলায় স্বর্ণপদকটি পরিয়ে দিলেন, তিনি কোনো কথা বলতে পারছিলেন না, তাঁর চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

ছোটবেলা থেকেই মাসুমা মেধাবী। ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছেন। এলাকার মাদ্রাসা থেকে দাখিল আর আলিম পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছেন। ইন্টারমিডিয়েট সমমানের আলিম পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সব মেয়ের মধ্যে প্রথম হয়েছেন। ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পছন্দের বিষয় আরবিতে সুযোগও হয়ে গেল। অন্য বিষয়গুলো বাদ দিয়ে কেন আরবি পড়লেন—এ প্রশ্নের জবাবে মাসুমা বললেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে আরবিতে পড়ব। তাতে আগে যা লেখাপড়া করেছি, সেটির ধারাবাহিকতা থাকবে। এখানে ভালো করব, এই বিশ্বাসও ছিল। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই সিটের জন্য আবেদন করলেন। তবে সিট পেতে পেতে তিন মাস। তখন ফার্মগেটের এক মহিলা হোস্টেলে থাকতেন। লোকাল বাসে চড়ে ক্যাম্পাসে আসতেন। সারা দিন নানা কাজে ব্যস্ত থেকে বাড়ির কথা ভুলে থাকতেন। তবে রাতে রুমে ফিরেই মা-বাবার কথা মনে পড়ত। বসে বসে কাঁদতেন। তাই প্রতি সপ্তাহেই গাজীপুরে মা-বাবার কাছে চলে যেতেন আদরের ছোট মেয়েটি। বাসা-ক্যাম্পাস করতে করতে রেজাল্টও ভালো হলো না। প্রথম সেমিস্টারে সিজিপিএ ছিল ৩.৩৩। তবে তাতে দমে যাননি। দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে লেখাপড়ায় আরো মনোযোগ দিলেন। চতুর্থ সেমিস্টারে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৪-এ ৪। অনার্সের আট সেমিস্টার শেষে তাঁর গড় সিজিপিএ ছিল ৩.৭১। হলের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে তিনি ফজিলাতুননেসা মুজিব স্বর্ণপদক পেয়েছেন। এই দারুণ সাফল্যের পেছনে সবার আগে মাসুমা তাঁর শিক্ষকদের অবদানের কথা বললেন, ‘আমাদের স্যাররা সব সময়ই তাঁদের জীবন-অভিজ্ঞতা আমাদের বলেন। সেগুলো থেকে অনেক কিছু শিখি। শিক্ষকরা কখনো কোনো কিছু বুঝতে গেলে না করেননি। ’ খেলাধুলায়ও ভালো করেছেন মাসুমা। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো নারী ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট ভালো লাগে বলে মাসুমাও প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। টানা এক মাস অন্যদের সঙ্গে বিসিবির প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিলেন। ১ মার্চ শামসুন্নাহার হলের সঙ্গে ফজিলাতুননেসা মুজিব হলের খেলায় ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হলেন। সে বছরের আন্তহল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় তাঁর হল রানার্স আপ হলো। আর এ বছরের প্রতিযোগিতায় তিনি হয়েছেন ‘ওম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’। এখনো শখের বসে ক্রিকেট খেলেন তিনি। সপ্তাহে তিন দিন হলের মাঠে প্র্যাকটিস করেন।

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায়ও সাফল্য পেয়েছেন মাসুমা। গেল বছর তাঁদের হলের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় হামদ-নাতে অংশ নিয়ে প্রথম হয়েছেন। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় জিটিভির রিয়ালিটি শো ‘কিউট স্পোর্ট মাস্টার ক্রিকফ্রিক শো’তে অংশ নিয়েছেন। সেখানে তিনি ও পপি নামের হলের আরেক ছাত্রী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলে। ক্রিকেট নিয়ে ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল তাঁদের। ৩৭টি পর্বের এই শোর ফাইনাল পর্বে উঠেছিলেন মোট চারজন। তাঁদের একজন ছিলেন মাসুমা। সেখানে খুব অল্প সময়ে ১০০টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। শোতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পেয়েছিলেন এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং একটি সার্টিফিকেট।

মাসুমা জড়িয়ে আছেন হল ইউনিটের বাঁধনেও। কিভাবে জড়ালেন এতে—এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, “একবার চাচাতো ভাই খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। তাঁর জন্য দুই ব্যাগ রক্তের দরকার হলো। কিন্তু ডাক্তার আমার রক্ত নিলেন না। বললেন, ‘তোমার ওজন কম। রক্ত দিতে পারবে না। ’ সেই থেকে বাঁধনে কাজ করি। কারো রক্তের প্রয়োজন হলে সাহায্য করি। ”

এখন তিনি মাস্টার্সের দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়েন। লেখাপড়া শেষে তিনি শিক্ষকতায় যোগ দিতে চান। তাঁর স্বপ্ন, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি স্কুল গড়বেন।


মন্তব্য