kalerkantho


জুবায়েরের যত অ্যাপস

জুবায়ের হোসেনের তৈরি অ্যাপস এনবিআর ব্যবহার করছে। অ্যাপস আছে তাঁর সিএনজি অটোরিকশার মিটার চুরি রোধেও। শেয়ার বিক্রির সবচেয়ে ভালো সময় জানার জন্যও অ্যাপস আছে তাঁর। এই অ্যাপসগুলোর গল্প শোনাচ্ছেন মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জুবায়েরের যত অ্যাপস

ভেবেছিলেন হ্যাকার হবেন। সে জন্যই কম্পিউটারের বেসিক প্রোগ্রামিং শেখা। তবে প্রোগ্রামিং শেখার পর আর সেদিকে মন গেল না। লেখাপড়াতেই ব্যস্ত ছিলেন জুবায়ের। তখন তিনি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির [এমআইএসটি] বিমান প্রকৌশল বিভাগের প্রথম বর্ষে পড়েন। খবরের কাগজে ইএটিএল মোবাইল অ্যাপস প্রতিযোগিতার কথা জেনে একটি আইডিয়া পাঠালেন ইএটিএলের মেইলে। তবে পরীক্ষা এসে গেল বলে আর অংশ নিতে পারলেন না। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে পরে আয়োজকরাই যোগাযোগ করলেন। এমআইএসটির ল্যাবে বানানো হলো ল সাপোর্ট [LAW SUPPORT] নামের মোবাইল অ্যাপস। যেকোনো ধরনের আইনি সহায়তার জন্য তৈরি এই অ্যাপসে আছে আইনজীবী, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নাম-ঠিকানা ও মেইল অ্যাড্রেস। এ ছাড়া অ্যাপসটির মাধ্যমে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ আশপাশের থানার খোঁজও পেয়ে যাবেন।

দারুণ এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৪ সালের ডিইউ আইটিএস ফেস্টে [ঢাকা ইউনিভার্সিটি আইটি সোসাইটি ফেস্ট] সেরা অ্যাপস নির্মাতার পুরস্কার পেয়ে যান জুবায়ের। তাতে উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। এরপর তিনি বুয়েটের এক বন্ধু আসিফ কামালকে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি ফার্ম। নাম ‘এনামেল বিডি’। তাঁদের বানানো প্রথম অ্যাপসটির নাম ছিল স্টাডি গাইড [STUDY GUIDE]। যেহেতু ছাত্ররাই ছিলেন এই ফার্মের কর্মী, চেয়েছিলেন লেখাপড়ায় কাজে লাগে এমন কিছু করতে। স্টাডি গাইডটিতে ক্লিক করে যে কেউ প্রথম থেকে দশম শ্রেণির সব পাঠ্যপুস্তক পিডিএফ আকারে পাবেন।

এ কাজ করতে করতে আবারও মানুষের কাজে লাগে এমন অ্যাপস বানানোর দিকে ঝুঁকে পড়লেন জুবায়ের। সেটির পেছনের ঘটনা ছিল, তাঁর বড় ভাই শেয়ার ধসের সময় বেশ বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েন। ছোট ভাইকে একদিন ডেকে বললেন, তুই তো অ্যাপস বানাস, দেখ তো এ নিয়ে কিছু করা যায় কি না? কিছুদিন খাটাখাটুনির পর জুবায়ের বানালেন ‘ডিএসই অ্যালার্ম [DSE ALARM]। ’ এটির মাধ্যমে শেয়ারবাজারে শেয়ারের দাম ওঠানামার খবর জানা যাবে। সে জন্য শুধু শেয়ার ক্রেতাকে তাঁর শেয়ারটি কত টাকা হলে বিক্রি করবেন, সেটি লিখে অ্যালার্ম চালু করে রাখতে হবে। সেই দামে শেয়ার পৌঁছানোর পর তাঁকে অ্যাপস জানিয়ে দেবে এখন শেয়ার বিক্রি করতে পারেন। এই অ্যাপসটি পরের বছর তাঁকে ডিইউ আইটিএস ফেস্টে রানার্সআপের পুরস্কার এনে দেয়।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এরপর বিদেশের প্রতিযোগিতায় সাফল্য আনেন জুবায়ের। নাসার ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’-এ অংশ নেন তিনি। ২০১৫ সালের সেই প্রতিযোগিতায় তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন এবং তৈরি করেছিলেন ‘নাসা মনিটর’ [NASA MONITOR]। সেই অ্যাপসটিতে আলফা, বিটা, গামা রশ্মি ইত্যাদি নিয়ে গবেষকরা যেসব গবেষণা করেন, সেই তথ্যগুলো হালনাগাদ করা থাকবে। এরপর বাংলাদেশ বিমানের জন্য কাজ করেছেন তিনি। এত দিন বিমানের কেবিন ক্রুদের শিডিউল হাতে লেখা হতো। কিন্তু তাঁর তৈরি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান ফ্লাইং সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করছে। দেশের জন্য তাঁর পরের কাজ ভ্যাট চুরি রোধের জন্য সফটওয়্যার তৈরি। এই অ্যাপসটির কাজ তিনি শুরু করেন গেল বছরের সেপ্টেম্বরে। সে জন্য কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড কমিশনার নর্থের ফেসবুক পেইজে নক করেন এবং কিভাবে কোনো সাধারণ মানুষ ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে অভিযোগ করলে তাঁরা সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবেন, সেটি জানতে চান। বিষয়টি নজরে এনে কাস্টমসের মিরপুর বিভাগের ডেপুটি কমিশনার রকিবুল হাসান জুবায়েরকে ডেকে বিস্তারিত আলাপ করেন এবং এরই ফল হলো ‘ভ্যাট চেকার’ [VAT Checker]। ২০১৫ সালের অক্টোবরের ১৫ তারিখে এই অ্যাপসটি এনবিআর [জাতীয় রাজস্ব বোর্ড] ব্যবহার করতে শুরু করে। কোনো দোকানদার যদি ভুয়া ব্যবসা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে ভ্যাট ফাঁকি দেন, তাহলে সে ব্যাপারে তখনই ক্রেতারা নিশ্চিত হতে পারবেন। এ জন্য তাঁকে শুধু বিলের রসিদে দেওয়া বিআইএন নম্বরটি তাঁর ভ্যাট চেকার অ্যাপসের মাধ্যমে চেক করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিশ্চিত হবেন তাঁর দেওয়া ভ্যাটের টাকা কোথায় জমা হচ্ছে। সরকারের কোষাগারে, না দোকানদারের পকেটে? এরপর মোবাইল ক্যামেরায় সেই রসিদের ছবি তুলে এনবিআরের ডাটাবেইসে দিয়ে দিতে হবে। কাস্টমসের ঢাকা পশ্চিম বিভাগের সঙ্গে এই অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচালিত কয়েকটি অভিযানেও অংশ নিয়েছেন জুবায়ের। তাঁর সঙ্গে এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান দেখা করেছেন এবং ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জুবায়েরের তৈরি তার পরের অ্যাপসটি ছিল সিএনজি অটোরিকশার মিটার অ্যাপস [CNG METER]। ২০১৫ সালের নভেম্বরে এটি তৈরি করেছেন তিনি। মিটারে যেতে না চাইলে এই অ্যাপসটির মাধ্যমে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো যাবে। এ ছাড়া চালক কোনোভাবে ভাড়ায় গণ্ডগোল করছেন কি না সেটি জানার জন্য অ্যাপস ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভাড়ার হিসাব রাখতে পারবেন। কানাডার একটি ডিজে প্রতিষ্ঠানের জন্য মিউজিক্যাল অ্যাপস বানানোর পাশাপাশি জুবায়ের এখন গেম বানাচ্ছেন। তিনি বিশ্বমানের মোবাইল অ্যাপস তৈরি করতে চান। সে জন্যই কাজ করে চলেছেন তিনি।

     ছবি : তারেক আজিজ নিশক


মন্তব্য