kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মূকাভিনেতা লোকমান

নাম তাঁর মীর লোকমান। সেই কিশোরবেলায় ভালোবেসে ফেলেছিলেন মূকাভিনয়। তারপর থেকে এই তাঁর ভুবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মূকাভিনয়ের সংগঠন তৈরি করেছেন। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন মহিউদ্দিন

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মূকাভিনেতা লোকমান

একটি লোক রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ টয়লেট চেপে গেল তাঁর। আশপাশে অনেক জায়গা খুঁজলেন। কোথাও প্রাকৃতিক কর্ম সারার মতো জায়গা পেলেন না। এদিকে তাঁর অবস্থাও বেশ খারাপ। টেনশনে, চাপে চেহারা বদলে যাচ্ছে। একসময় খুঁজে পেলেন একটি পাবলিক টয়লেট। বদনায় পানি নিয়ে যেই হন্তদন্ত হয়ে টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়েছেন, দেখেন সেটি বন্ধ আছে। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেন। আস্তে আস্তে টোকা দিলেন, দরজা খুলল না। এরপর লাথি মারতে শুরু করলেন। স্টেজে এই দৃশ্যাভিনয় যখন চলছে, অনেক দূরে বসে এক কিশোর গোগ্রাসে গিলছে সে অভিনয়। তার কাছে বিষয়টি খুব জীবন্ত, অন্য রকম মনে হচ্ছে।

অথচ এত দিন সে ছিল নাটকের পোকা। নিজে নিজে টিভিতে দেখে রাজা-রানির অভিনয় করত। বন্ধুদের নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে হাসিয়ে মারত। আজ থেকে ঠিক ১৩ বছর আগের সেই ‘টয়লেট প্রবলেম’ দেখার পর থেকে মূকাভিনয় নামের নতুন চেনা এই জগেক ভালোবেসে ফেললেন মীর লোকমান।

এরপর থেকে একা একা প্র্যাকটিস করেন তিনি। ঠিক বছর তিনেক পরে, ২০০৬ সালে কলেজের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন লোকমান। একক অভিনয়ে প্রথম পুরস্কার জেতার পর সেদিনই লোকমান সিদ্ধান্ত নিলেন—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার নন, বড় হয়ে তিনি মূকাভিনেতা হবেন। তবে নরসিংদীর গ্রামে তা শেখার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। লেখাপড়ার পাশাপাশি মূকাভিনয় শেখার জন্য গ্রাম ছাড়লেন তিনি, ২০০৯ সালে ভর্তি হলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে নতুন একটি গল্প নিয়ে মূকাভিনয় দেখলেন। তখনই তাঁর মনে হলো, আলাদা আলাদা বিষয়েও তো অভিনয় হতে পারে। এর পর থেকে নিজে নিজে গল্প বানিয়ে তিনি অভিনয় করা শুরু করলেন। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন তিনি। বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তির পর নবীনবরণে সবাইকে আবারও তাক লাগিয়ে দিলেন মূকাভিনয় করে। সেটি ছিল তাঁর নিজের গল্পের অভিনয়, অনেক দিন পরে দুই বন্ধুর দেখা হলো। তাঁদের অনুভূতিগুলো অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। আর মূকাভিনয়ে তাঁর প্রথম ক্লাসটি নিয়েছিলেন মূকাভিনেতা কাজী মাশহুরুল হুদা। ২০১১ সালে টানা ১৫ দিন শিল্পকলা একাডেমিতে যে কর্মশালাটি পরিচালনা করেছিলেন তিনি, সেখানে লোকমানও একজন প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। কর্মশালার পরে অভিনয় করে প্রশংসা জুটল লোকমানের কপালে। আর সেই সাহসে সে বছরেরই ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উদ্যোগে যাত্রা শুরু করল ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন [ডুমা]।

ডুমার প্রাণপুরুষ লোকমান, যিনি সময় পেলেই সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের বারান্দায়, রুমের ভেতরে বা মাঠের মধ্যে মাইম বা মূকাভিনয় অনুশীলন করেন। সারা রাত না ঘুমিয়ে প্র্যাকটিস করেছেন এমন বহু দিন কেটে গেছে তাঁর। তাঁর গায়ের ঘাম আর সবুজ ঘাসের শিশির মিলেমিশে যেত। সেসবের ফলাফলে সে বছরের জুলাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে একটি স্ট্রিট শো করেন তিনি। নাম ছিল ‘এই সময়ে’। তারপর থেকে আস্তে আস্তে ক্যাস্পাসে জনপ্রিয় হয়ে গেলেন মীর লোকমান। কোনোদিন হয়তো টিএসসিতে শো করতে যাচ্ছেন, সারা গায়ে মাইমের কস্টিউম, মুখে মেকআপ। তাঁর পেছন পেছন কয়েকজন লোক হেঁটে আসছেন। লোকমান ভেবেছিলেন, তাঁরা হয়তো তাঁর এই অদ্ভুত পোশাক দেখে পেছন পেছন চলেছেন। পরে তাঁরা টিএসসিতে ঢুকে পড়ার পর বুঝতে পারলেন, শো দেখার জন্য এসেছেন এসব দর্শক।

ঢাকার বাইরেও তিনি অনেক শো করেছেন। নোয়াখালীতে একটি শোর ঠিক আগে আগে কারেন্ট চলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে হতাশ দর্শকদের চিৎকার শুরু হলো। তবে আয়োজকরা মুখ শুকনো করে বললেন, আজকে আর বিদ্যুৎ আসবে না। বুদ্ধি করে লোকমান বললেন, যাঁদের মোবাইলে টর্চ আছে, তাঁদের স্টেজে চলে আসতে বলেন। সেই আলোয় চারপাশের অন্ধকারে অভিনয় করলেন তিনি। তাঁর জীবনে এ এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তাঁর উদ্যোগে ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের ব্যানারে ১৩-১৬ মার্চ হয়ে গেল ‘প্রথম জাতীয় মূকাভিনয় উৎসব-২০১৬’।   স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত এ উৎসবে মূকাভিনয়ের   ওপর কর্মশালা-সেমিনার ছাড়াও মূকাভিনয় প্রতিযোগিতা ও পোস্টার প্রদর্শনী হয়েছে। উৎসবের মূল ভেন্যু ছিল টিএসসি। শহীদ মিনার, কার্জন হল, কলা ভবন, শাহবাগসহ পুরো ক্যাম্পাসেই ছিল স্ট্রিট শো। এ ছাড়া দলটি ব্রিটিশ কাউন্সিল, আঁলিয়স ফঁসেজ, জার্মান কালচারাল সেন্টারসহ দেশের ২৫০টিরও বেশি ভেন্যুতে প্রদর্শনী করেছে। গিয়েছে নরসিংদী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের বিভিন্ন মঞ্চে। তাঁদের প্রযোজনাগুলোর মধ্যে আছে ‘লাইট ডার্কনেস’, রাইজিং অব বাংলাদেশ, অদল-বদল, ৭১, ভালোবাসা অতঃপর, ক্রস কানেকশন ইত্যাদি।


মন্তব্য