kalerkantho


স্বপ্ন বিক্রি হবে মুদি দোকানে

সামান্য মুদি দোকানের মাধ্যমে কিভাবে একটি বস্তি এলাকার মানুষের প্রতিদিনের আয় দ্বিগুণ করে ফেলা যায়, সেটিই দেখিয়ে দিলেন তাঁরা। বাংলাদেশের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বখ্যাত হাল্ট প্রাইজে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর্জা তানজিব সামি, তাসনিম ওমর আভা, মোহাম্মদ সাদ ও আরাফাত আহমেদ রিফাত। তাঁদের সাফল্যের গল্প শোনাচ্ছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্বপ্ন বিক্রি হবে মুদি দোকানে

হাল্ট প্রাইজে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দল মোহাম্মদ সাদ, মীর্জা তানজিব সামি, তাসনিম ওমর আভা ও আরাফাত আহমেদ

ব্র্যাকের ছাত্রছাত্রীদের দ্বিতীয় সেমিস্টারটি সাভার ক্যাম্পাসে করতে হয়। সেটিকে তাঁরা ‘আবাসিক সেমিস্টার’ বলেন। নানা ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেন। সেখানেই একটি কোর্স ছিল ‘প্রেজেন্টেশন ১০১’। তাতে অংশ নেওয়ার জন্য মীর্জা তানজিব সামি, তাসনিম ওমর আভা এবং মোহাম্মদ সাদ মিলে গড়ে তুললেন ‘সিনারজি’। নামটির অর্থ একতা বা সমন্বয়। ২০১৪ সালে এই কোর্সটি নিয়েছিলেন হাল্ট থেকে ফিরে আসা বড় ভাইয়া-আপুরা। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন এভাবে—‘আমরা হচ্ছি হাল্ট টিম। ’ সেই প্রথম হাল্টের নাম শুনলেন সামি ও আভা। হাল্ট-ফেরত দলটি তাঁদের শেখাল কিভাবে যেকোনো বিষয়ের প্রেজেন্টেশন করতে হয়।

হাল্ট প্রাইজ

হাল্ট প্রাইজকে বলা হয় বিশ্বে ছাত্রছাত্রীদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। স্নাতক থেকে শুরু করে পিএইচডির শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। প্রতিযোগিতাটি দুবাই, সাংহাই, লন্ডন, বোস্টন ও সান ফ্রান্সিসকোর হাল্ট বিজনেস স্কুলের শাখাগুলোতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রতিষ্ঠান ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ (সিজিআই) প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেয় এবং সঙ্গে শর্ত দেয়, এই টাকা দিয়ে দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দৈনিক চার ডলার বা ৪০০ টাকার কম আয়ের অন্তত এক কোটি মানুষের প্রতিদিনের আয় দ্বিগুণ করে দিতে হবে। হাল্ট প্রাইজের সঙ্গে বিল ক্লিনটন ছাড়াও আছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া টাইম ম্যাগাজিন সেরা আইডিয়াগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শুরু হলো যাত্রা

প্রেজেন্টেশন ১০১ কোর্সে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরে আসার পর তাঁরা শুনলেন, ব্যক্তিগতভাবে নয়, প্রথমবারের মতো তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতাটিতে অংশ নেবে এবং ক্যাম্পাস রাউন্ডের চ্যাম্পিয়ন দলের যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ সব খরচ দেবে। সেখানে নাম লেখালেন তাঁরা। তিনজনের এই দলে সিনিয়র সদস্য হিসেবে আরাফাত আহমেদ রিফাত যোগ দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যাম্পাস রাউন্ডে ৪০টি দল অংশ নিয়েছিল এবং পাঁচটি দল দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে সিনারজিও ছিল। দলগুলোকে শূন্য থেকে ছয় বছরের বিত্তহীন বা নিম্নবিত্ত শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্কুল তৈরি করতে বলা হয়েছিল। সিনারজির পরিকল্পনা ছিল, বস্তির আধাপাকা বা সেমিপাকা বাড়ির ছাদে স্কুল তৈরি করে শিশুদের পড়ানো হবে। পাশাপাশি এখানকার মানুষের জীবনমান উন্নত করতে ইথানলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এই বিদ্যুৎ বস্তির নারীরাই তৈরি করবেন, কিন্তু বেশি বৈজ্ঞানিক বলে ধারণাটি বিচারকদের পছন্দ হলো না। এতে ভেঙে না পড়ে সিনারজি নতুন করে যাত্রা শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ওরিয়েন্টেশন, কনভোকেশনে বক্তা হিসেবে দলের সদস্যরা অংশ নিয়ে নিজেদের মঞ্চভীতি কাটালেন, উপস্থাপনার দক্ষতাও তৈরি করলেন। এভাবে প্রস্তুতি নিতে নিতে ২০১৫ সালের হাল্ট প্রাইজের দলগুলোর নাম নিবন্ধনের সময় এসে গেল। সেখানে তাঁরাও নাম লেখালেন।

জন্ম নিল দারুণ এক আইডিয়া

হঠাৎ করেই একদিন আইডিয়াটি পেয়ে গেলেন সামি। সেদিন তিনি নেটওয়ার্কিংয়ের ক্লাস করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো—একটি কম্পিউটার থেকে আরেকটি কম্পিউটারে নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে যেভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়, তেমনি বস্তির মুদি দোকানের মাধ্যমেও তো সেখানকার মানুষের, বিশেষত নারীদের হাতের কাজগুলো বিক্রি করা সম্ভব। তিনি ভেবেছিলেন, যেসব নারী একই ধরনের পণ্য তৈরি করেন [যেমন : মালা] তাঁদের নাম ও মোবাইল নম্বর দোকানগুলোতে থাকবে। ফলে তাঁরা প্রয়োজনে একত্র হয়ে বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এ ছাড়া দূরে না গিয়ে তাঁরা যাতে হাতের কাছে কাঁচামাল কিনতে পারেন সে জন্য দোকানগুলোতেই কাঁচামালও রাখা হবে। কোনো দোকানে কাঁচামাল কম থাকলে দোকানদার পাশের দোকান থেকে মাল ধার করে আনবেন। এভাবে পুরো বস্তি এলাকার মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়ার জন্য মুদি দোকানগুলো যোগসূত্র হিসেবে কাজ করবে। এই আইডিয়া ক্যাম্পাসের ৬৫টি দলের মধ্যে সেরা আইডিয়া হলো এবং সিনারজিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাম্পিয়ন টিম হিসেবে হাল্টের জন্য নির্বাচন করা হয়।

হাল্টের প্রস্তুতি

ধারণাটি বাস্তবায়নে চার বন্ধু ‘সিনারজি গ্লোবাল’কে কম্পানি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করালেন। মীর্জা তানজিম সামি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, তাসনিম ওমর আভা চিফ অপারেটিং অফিসার, আরাফাত আহমেদ রিফাত হেড অব মার্কেটিং এবং মোহাম্মদ সাদ হেড অব সিস্টেমস লজিস্টিকসের দায়িত্ব নিলেন। হাল্ট প্রাইজের প্রস্তুতি হিসেবে মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধের বস্তিতে চারটি মুদি দোকানে পরীক্ষামূলকভাবে আইডিয়াটি প্রয়োগ করা হলো এবং সেটি সফল হলো। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তারা মূল প্রতিযোগিতার জন্য প্রেজেন্টেশন তৈরি করা শুরু করেন।

সাংহাইয়ের দিনলিপি

সিনারজি গ্লোবাল চীনের সাংহাইয়ে পৌঁছেছিল ৯ মার্চ রাতে। পরের দিন তাদের প্রস্তুতিতেই কেটে গেল। ১১ মার্চ হাল্ট বিজনেস স্কুলে বসল মূল আসর। সেখানে ৪০টি দেশের ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা জড় হন।

ফাইনালের দিন

১২ মার্চ সকালটি ছিল অন্য রকম। চাপা টেনশন নিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে হাজির হলেন চার বন্ধু। সেখানে আছে আরো সাতটি দল। তাদের সামনে তাঁরা ছয় মিনিটের মধ্যে পুরো কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরলেন। বস্তিতে ঘুরে সেটির কেমন প্রয়োগ দেখেছেন তাও জানালেন। তারপর চার মিনিট অন্য দলগুলোর প্রশ্নের উত্তর দিলেন। হাল্টের নিয়ম অনুযায়ী, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিন রুমে ২৪টি দল নিজেদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করল। সেই দলগুলোকে বিকেলের প্রতিযোগী দলগুলো মূল্যায়ন করেছে। আর বিকেলের দলগুলোকে মূল্যায়ন করেছে সকালের দলগুলো। তবে সিনারজির উপস্থাপনা ও আইডিয়া বাস্তবায়নে অন্য দলগুলো সন্তুষ্ট হয়ে এত বেশি নম্বর দিল যে তারা অন্যদের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে গেল। দুপুরে সেরা তিনটি দলের একটি হিসেবে তাদের ১১ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিতে হলো। অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করা হলো। যেমন—তোমরা এই আইডিয়া কিভাবে বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়ন করবে? এ প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাকের যেসব কার্যক্রম দেশে আছে, সেখানে আমরা কাজ করব। আরো বলেছিলেন, ব্র্যাকের সাহায্য নিয়ে তাঁরা আগামী ছয় মাস এটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে পরিচালনা করতে চান।

সেই চরম ক্ষণ

সেদিন সন্ধ্যা ৬টা কি সাড়ে ৬টায় সেরা ছয়টি দলকে মঞ্চে ডাকা হলো। তাদের একটি ছিল সিনারজি। তারা কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন, কাজের অভিজ্ঞতা জানানোর পর বিচারকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিল। এরপর ৪০ মিনিটের বিরতি। বসে না থেকে তখন সিনারজির সদস্যরা অন্যদের কাছে এই পরিকল্পনা কেমন লেগেছে তা জানার চেষ্টা করলেন। বিরতির পর বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ১৫ জন বিচারক সেরা দল হিসেবে বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করলেন। সেই মুহূর্তে কেমন লাগছিল এ প্রশ্নের জবাবে তাসনিম শুধু বলেন—এই খুশি কোনোভাবে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এরপর দেশে ফোন করে ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক রেজাউর রাজ্জাককে ধন্যবাদ জানান সবাই। তিনি বিভিন্ন সময় দলকে নানা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।

এখন তাঁরা

এখন তাঁরা দেশে। পাইলট প্রজেক্টের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক যেতে চান। এই দিনগুলোতে কী কী করেছেন, কিভাবে মানুষের আয় দ্বিগুণ করা হয়েছে সেই সাফল্যের গল্প বলবেন বিচারক বিল ক্লিনটন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে। তখন নিশ্চয়ই স্যার ফজলে হাসান আবেদ খুশিতে হাসবেন। ব্র্যাকের প্রাণপুরুষ কথা দিয়েছেন তাঁর ছেলেমেয়েদের বিশ্ব জয় করা দেখতে তিনি তাঁদের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে উপস্থিত থাকবেন।


মন্তব্য