kalerkantho


সৃজনশীল পদ্ধতি

শিক্ষকদেরও শিক্ষা চাই

দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না। ফলে উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন আরো বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রায়হান আহমদ আশরাফী

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিক্ষকদেরও শিক্ষা চাই

মুখস্থ বিদ্যার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের মেধা আর মননের বিকাশের জন্য চালু করা হয় সৃজনশীল পদ্ধতি। ১৯৫৬ সালে মার্কিন শিক্ষা মনোবিদ বেঞ্জামিন এস ব্লুম দেখান যে মানুষের চিন্তা করার সহজ থেকে কঠিন ধাপগুলো হচ্ছে ক্রমান্বয়ে জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। চিন্তা করার এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। তবে প্রত্যেক দেশ এ পদ্ধতিকে নিজেদের মতো করে উপযোগী করে নিয়েছে। ২০১০ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশে কয়েকটি বিষয়ে এ পদ্ধতি চালু হয়। এখন প্রায় সব বিষয়েই সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয়।

 

অধিকাংশ শিক্ষক সৃজনশীল বোঝেন না

সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রাথমিক স্তরে এখনো অর্ধেকের বেশি শিক্ষক কার্যকরভাবে সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না। তাঁদের মধ্যে ১৩ শতাংশ একেবারেই বোঝেন না। ৪২ শতাংশ অল্পস্বল্প বোঝেন। এই পদ্ধতি বোঝেন মাত্র ৪৫ শতাংশ শিক্ষক। ‘রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশন’ বা রেসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সৃজনশীল পদ্ধতির ক্ষেত্রে ৪৭ শতাংশ শিক্ষক বাজারে প্রচলিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করেন। ৩৫ শতাংশ শিক্ষক তাঁদের সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৮ শতাংশ শিক্ষক নিজের জ্ঞান ও ধারণা থেকে শিক্ষার্থীদের পড়ান।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একটি প্রতিবেদনেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। দেশের মোট ১৮ হাজার ৫৯৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ছয় হাজার ৫৯৪টি বিদ্যালয় ঘুরে তৈরি করা হয় এ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন না। এঁদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে তাঁদের শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। আর ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাইরে থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেন।

 

প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকরী?

শিক্ষকদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম সেসিপ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম সেসিপের প্রোগ্রাম পরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ২০১৩ সাল পর্যন্ত সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে নতুন শিক্ষকরা চাকরি নিয়েছেন, তাঁরা সৃজনশীল প্রশিক্ষণ পাননি। এঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবং বিভিন্ন বোর্ডের।

সেসিপের যুগ্ম প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এবং অতিরিক্ত সচিব রতন কুমার রায় জানান, পাঁচ হাজার শিক্ষককে মাস্টার ট্রেনার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। পরে তাঁরা সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষককে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সেসিপ প্রকল্পের বাংলাদেশ এক্সামিনেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের সিনিয়র স্পেশালিস্ট (পরীক্ষণ এবং মূল্যায়ন) রবিউল কবির চৌধুরী জানান, মাস্টার ট্রেনাররা আঠারো দিনের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ সময় তারা দুই ধাপে ১২ দিন ক্লাস এবং ছয় দিন মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। প্রশিক্ষণ শেষে মাস্টার ট্রেনারদের দ্বারা অন্য শিক্ষকদের স্থানীয় পর্যায়ে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন অনেকের।

 

প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা নেন শিক্ষকরা

কোনো বেসরকারি সংস্থা নয়, খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, অধিকাংশ শিক্ষক স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় প্রশ্ন নিজেরা তৈরি করতে পারেন না। ফলে তাঁরা প্রশ্ন কিনে বা অন্যদের দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করিয়ে পরীক্ষা নেন। এ সম্পর্কে রবিউল কবির চৌধুরী বলেন, শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাতে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতি শেখানো হয়। সঙ্গে প্রত্যেক শিক্ষককে দেওয়া হয় বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল। তবুও শিক্ষকরা প্রশ্ন তৈরি করতে না পারার পেছনে কারণ হলো, তাঁদের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার অভাব। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, সব শিক্ষককে তিন দিনের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা কোনো কাজেই আসে না। প্রথম দিন এসে প্রশিক্ষণে যোগ দিতে একটা সময় চলে যায়, মাঝে দ্বিতীয় দিনে কিছুটা শিখতে পারেন, তৃতীয় দিনে থাকে ফিরে যাওয়ার চিন্তা। ফলে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণের মূল বিষয় নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করতে পারেন না।

 

গাইডনির্ভরতা কমছে না

ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ক্লাসে পড়ার পাশাপাশি গাইড বই অনুসরণ করলে বাচ্চারা সৃজনশীল প্রশ্ন সম্পর্কে বেশি ধারণা নিতে পারে। এ জন্যই গাইড বইয়ের শরণাপন্ন হতে হয়। নরসিংদীর সাটিরপাড়া কে কে ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী রাহাত আহমেদ বলেন, পাঠ্য বইগুলোতে পর্যাপ্ত নমুনা সৃজনশীল প্রশ্ন থাকে না। প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্যই গাইড বইয়ের সাহায্য নিতে হয়।

শুধু শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরাই নয়, যেসব শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না, তাঁরা গাইড বইয়ের দিকে আরো বেশি ঝুঁকছেন বলে জানান রবিউল কবির চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরাই এখন গাইড বইয়ের বড় ক্রেতা। অনেক স্কুলে দেখা যায়, গাইড বই থেকে হুবহু বা একটু পাল্টে প্রশ্ন করা হয়। তখন শিক্ষার্থীরা ওই গাইড অনুসরণ করতে থাকে। ’

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘অভিভাবক আর শিক্ষার্থীরাই গাইড বইয়ের প্রতি বেশি নির্ভরশীল। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি গাইড বইয়ের প্রতি উৎসাহ দেয়, তবে কোনোভাবেই গাইড বই বন্ধ করা সম্ভব নয়। ’

দরকার উচ্চতর প্রশিক্ষণ

রতন কুমার রায় বলেন, কমপক্ষে স্নাতক পাস ব্যক্তিরাই শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়ে থাকেন। একজন স্নাতক পাস ব্যক্তির জন্য তিন দিনের প্রশিক্ষণই যথেষ্ট। তা ছাড়া প্রত্যেক স্কুলে একজন শিক্ষক শুধু একটি বিষয়ে পড়ান না, কয়েকটি সংশ্লিষ্ট বিষয়েই তাঁকে ক্লাস নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, একজন শিক্ষক তিন বিষয়ের জন্য তিনবার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এতে একজন শিক্ষকের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন বা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদানে কোনো ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

রবিউল কবির চৌধুরী মনে করেন, সারা দেশের সব শিক্ষককে ১৮ দিন মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। এতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। সব শিক্ষককে এত দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আয়োজন করলে সে সময়টাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়বে। তাই ভবিষ্যতে শিক্ষকদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া, ভিডিও টিউটোরিয়াল তৈরি করে সৃজনশীল সম্পর্কে আরো বিস্তর ধারণা দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।

 

‘ইনহাউস’ প্রশিক্ষণ বেশ কার্যকর

অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব প্রত্যেক বোর্ড, উপজেলা এবং জেলা শিক্ষা অফিসকে দেওয়া হয়েছে। তাদের নিজেদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইনহাউস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যে যাঁরা ইনহাউস ট্রেনিং দিয়েছেন, তাঁদের এ পদ্ধতিতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। ’

রতন কুমার রায় জানান, দেশের প্রায় ৯৮ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে হস্তক্ষেপ করা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সে সুযোগ নেই। নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতাও প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে। নতুন যে শিক্ষকরা নিয়োগ পাচ্ছেন, এই অল্পসংখ্যক শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে ইনহাউস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক আগে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা নতুনদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এতে নতুনদের সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।

 

মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি

রতন কুমার রায় বলেন, ‘শিক্ষকরা একদমই সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না তা ঠিক নয়। কেননা অনেক শিক্ষকই প্রাইভেট পড়ান এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণাও দেন। সৃজনশীল পদ্ধতি না বুঝলে এ পদ্ধতিতে প্রাইভেট পড়ানো সম্ভব হতো না। ’

রবিউল কবির চৌধুরী মনে করেন, একজন শিক্ষার্থীকে ক্লাসে ভালোভাবে পড়াতে চাইলে প্রথমে শিক্ষককে সে বিষয়ে জানতে হবে। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রথমে নিজে বুঝে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই চলবে না, প্রশ্ন তৈরির জন্য চাই চর্চা এবং সৃজনশীলতা। পাঠের সঙ্গে মিল রেখে চারপাশের নানা বিষয় থেকে খুঁজে উদ্দীপক বের করতে হবে। শিক্ষক নিজে সৃজনশীল হলে তবেই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে যথাযথ পাঠদান সম্ভব।


মন্তব্য