kalerkantho


আগামীর নির্মাতা

পড়ালেখার ফাঁকে সিনেমা বানান আহমেদ সালেকীন। তাঁর তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি তুরস্কে পুরস্কার জিতেছে, নর্থ সাউথেও পুরস্কার পেয়েছে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আগামীর নির্মাতা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আহমেদ সালেকীনের বাড়ি পায়ে হাঁটা পথ। ছেলেবেলার অনেকটাই তাই ক্যাম্পাসে ঘুরেফিরে কেটেছে।

বিকেলে খেলতেও যেতেন। ছেলেমেয়েরা ফুটফুটে ছেলেটিকে কাছে ডেকে নিতেন। নাট্যকলার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এভাবেই ভাব। মহড়া কক্ষে গিয়ে কোনায় দাঁড়িয়ে অভিনয় দেখতেন। অনুশীলনের মঞ্চে একদিন ডাক পড়ল। তখন সালেকীন ফোর কি ফাইভে পড়েন। অভিনয় ভালো লেগে গেল। তারপর থেকে অভিনয় করছেন। শিশু চরিত্রে অনেকবার অভিনয় করেছেন। আরেকটু বড় হয়ে রাবি নাট্যমঞ্চে নাম লেখালেন, নিয়মিত অভিনয়ও করেছেন কিন্তু অভিনয়ের চেয়ে পর্দার পেছনটাই বেশি টানত তাঁকে। কলেজে পড়ার সময় বন্ধু ইমাম হাসানের সঙ্গে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ বানালেন। ছবিটি প্রশংসাও পেল। তবে মা-বাবা চাইতেন না ছেলে অভিনয় করুক বা সিনেমা বানাক। তাতে পড়াশোনা লাটে ওঠার আশঙ্কা আছে।

তবে অভিনয় তাঁর লেখাপড়ায় ক্ষতি করেনি। এসএসসি-এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ডি ইউনিটে মেধাতালিকায় ৪১তম হয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলেন। সালেকীন থাকেন বিজয় একাত্তর হলে। ও বলা হয়নি, কলেজে থাকতে ৫০টির বেশি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ১০টি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে হাতে-কলমে সিনেমা শেখার জন্য জলছবি ফিল্মে নাম লেখালেন। ক্লাসের পর হলে ফিরে দেশ-বিদেশের সিনেমা দেখেন, সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করেন। এই করতে করতে প্রথম বর্ষ কাটল। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ফের সিনেমা বানানো শুরু করলেন। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি তাঁর ‘প্রেক্ষাপট’ ৭ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ছবি। ছবিটি ১৫তম কিসাকা ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে সম্মানজনক অধ্যাপক ড. আলীম শরীফ ওনারান স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। এক্সপেরিমেন্টাল ক্যাটাগরিতে পুরস্কারটি জিতেছেন সালেকীন। এই ক্যাটাগরিতে ইতালি, ইরান, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বানানো মোট ১৮টি ছবি চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছিল। তিনটি ছবিকে বিচারকরা পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাঁদেরই একজন সালেকীন। প্রতিবছর তুরষ্কের কোনিয়ার সেলযুক ইউনিভার্সিটি এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এর আগে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ‘ইন্টার ইউনিভার্সিটি শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০১৫’-এ দ্বিতীয় হয়েছেন তিনি।

সালেকীনের ঝুলিতে আছে থার্ড ইন্ডিয়ান সিনেফিল্ম ফেস্টিভালে অফিশিয়াল সিলেকশনসহ অনেক পুরস্কার-স্বীকৃতি। তিনি জানালেন, প্রেক্ষাপটের চিত্রনাট্য তিতুমীর কলেজের বাংলার ছাত্র বন্ধু ইনজামাম হাসানের লেখা। ছবিতে দেখানো হয়, একজন মানুষ মরুভূমিতে অসহায় বসে আছে। তার পা শেকলে বাঁধা, খোলার চেষ্টা করেও পারছে না। একসময় গরমে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুম ভাঙলে দেখল, স্যুট-টাই পরা দুই ভদ্রলোক তার সামনে বসে খেলছে। একজন মার্কার দিয়ে আমের ছবি এঁকে ছবির পাশে লিখল ‘হাতি’। অন্যজন আমটিকে লিখল ‘সাপ’। নাম নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়াও বাঁধল। একসময় রেগে তারা শেকল পরা তরুণটিকে মেরে মনের খেদ মেটাল এবং তার দিকে ললিপপ ছুড়ে দিয়ে আবার খেলা শুরু করল। শেকল পরা তরুণের চরিত্রে সালেকীন, বাকি দুটি চরিত্রে তাঁর দুই বন্ধু অভিনয় করেছেন। প্রেক্ষাপটের শুটিং মিরপুর ডিওএইচএসে করা হয়েছে। সালেকীন বললেন, ‘রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের চিত্রই ছবিতে তুলে ধরতে চেয়েছি। ’ প্রেক্ষাপট নিয়ে স্মরণীয় স্মৃতির কথা জানতে চাইলে হেসে ফেললেন, ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ইন্টার ইউনিভার্সিটি শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতাতে ছবিটি দেখে জুরি বোর্ডের সদস্য পরিচালক গাজী রাকায়েত বলেছিলেন, ‘কয়েকবার তোমার ছবিটি দেখেছি। দুর্দান্ত বানিয়েছ। ’ তিনিই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে ছবিটি পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে পরামর্শেই প্রেক্ষাপট তুরস্কে গেল কিন্তু পরীক্ষা থাকায় সালেকীন পুরস্কার আনতে যেতে পারলেন না। তবে গেল মাসে কর্তৃপক্ষ কুরিয়ারে তাঁকে পুরস্কার ক্রেস্ট, সনদ, একটি ‘গোফ্রো হিরো ৪ ক্যামেরা’ পাঠিয়েছেন। এসব পেয়ে দারুণ খুশি তিনি, ‘নিজের একটি ক্যামেরা পেয়ে ভালোই হলো। ’ এখন আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরির কাজ শুরু করেছেন তিনি। সেখানেও সাধারণ মানুষের গল্প তুলে ধরবেন। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফিল্ম নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণ নির্মাতা।


মন্তব্য