kalerkantho


এক দিনের রাষ্ট্রদূত

এক দিন ডেনমার্ক দূতাবাসে ছায়া রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন তালবিয়া তানভির। রাষ্ট্রদূতের সব কাজে ছায়া হয়ে থেকেছেন। জেনেছেন, দেখেছেন। কী দেখেছেন? কী করেছেন? নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রীর সেদিনের গল্পটি শোনাচ্ছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এক দিনের রাষ্ট্রদূত

২০ ফেব্রুয়ারিই ছিল প্রশ্নোত্তর জমা দেওয়ার শেষ দিন। আর সেদিন রাতেই আগের লাইক দেওয়া ডেনমার্ক দূতাবাসের অফিশিয়াল পেজটিতে চোখ পড়ল।

দ্রুত তিনটি প্রশ্নের উত্তর লিখে মেইল করলেন তালবিয়া তানভির। প্রথম প্রশ্নটি ছিল—এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে সেটি আপনার ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে? উত্তরে তিনি লিখেছিলেন—ব্যক্তিগত জীবনেই শুধু নয়, এটি আমার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এতে যেমন আমার নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হবে, তেমনি আমার দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে আমাকে পরবর্তী সময়ে সাহায্য করবে। কেবল নারী অধিকারই নয়, শিশু অধিকার, সামাজিক পরিবর্তন আনতেও এটি ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল, বাংলাদেশের মেয়েরা কী ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করেন? এ প্রশ্নের জবাবে তাঁর উত্তর ছিল, এখনো আমাদের দেশের বিশাল অংশের মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব আছে। ফলে মেয়েরা যত ভালোই হোক না কেন তারা রান্নাঘরে রান্না করবে—এমন অনেক প্রচলিত সংস্কার আছে। এগুলোর মোকাবিলার পাশাপাশি তাদের শারীরিক নিরাপত্তারও অভাব আছে। তারা একা চলাফেলা করতে পারে না, বিশেষত রাতের বেলায়। আর সর্বশেষ প্রশ্ন, ছায়া রাষ্ট্রদূত হলে আপনি কিভাবে আপনার দেশকে তুলে ধরবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরে দেশের পর্যটন শিল্পকে তুলে ধরব। এ ছাড়া আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরব এবং তাদের প্রশিক্ষিত করার জন্য অন্য দেশগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইব।

পরের সপ্তাহে ডেনমার্ক দূতাবাস থেকে ফোন এলো, আপনার পুরো নাম, সিভি, ন্যাশনাল আইডি কার্ড ইত্যাদির কপি আমাদের মেইল করুন। তালবিয়াও পাঠিয়ে দিলেন। ২ মার্চ সকালে তাঁকে দেখা করতে বলা হল। উত্তরা থেকে গুলশান ২ নম্বরের দূতাবাস চত্বরে গিয়ে তো তিনি অবাক। সেখানে একসঙ্গে চারটি দেশের দূতাবাস আছে এবং তারা একসঙ্গে কাজ করে। ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডের দূতাবাসের বিশাল চত্বরে তাঁকে রিসিভ করলেন এক বাঙালি কর্মকর্তা। নাম তাঁর নাজমুল। তিনি তালবিয়া তানভিরকে অবাক করে দিয়ে জানালেন, ২০০ প্রতিযোগীর মধ্যে আপনিই ছায়া রাষ্ট্রদূত নির্বাচিত হয়েছেন। অবিশ্বাস, গর্বের হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। দূতাবাসের ভেতরে যাওয়ার পরে তিনি জানলেন, তাঁকে কী কী করতে হবে ৭ মার্চ, পরে শুভেচ্ছা সাক্ষাতের জন্য গেলেন ডেনিশ রাষ্ট্রদূতের কাছে।

হানা ফুগল এসকয়ার খুবই নম্র, আন্তরিক ও সৌজন্যপরায়ণ মানুষ। বারকয়েক জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আসতে কোনো কষ্ট হয়নি তো? মাথা নেড়ে তালবিয়া জানালেন, না। এমনভাবে তিনি তাঁকে কাছে নিয়ে নিলেন যেন কোনো বাঙালি ভদ্রমহিলা তাঁর কোনো আপনজনের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত। দেখেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এরপর জানলেন, তিনি কোথায় পড়েন, কেমন আছেন? নিজের কথা বলবেন কি, তালবিয়ার খোঁজখবরেই সময় চলে গেল। ছায়া রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অনেকবার অভিনন্দনও জানালেন। কথার ফাঁকে বললেন, এ দেশের নারীদের তিনি আরো উন্নয়ন দেখলে খুশি হবেন। তারা যেন পরিবারের বৃত্তে আটকে না থাকে। তারা যেন সমাজে ও রাষ্ট্রে তাদের ভূমিকা রাখতে পারে। অধিকারগুলো পালন করতে পারে। ঘণ্টাদেড়েক থাকার পর চলে এলেন তিনি। এর পরও দুই পক্ষের যোগাযোগ হয়েছে। নিয়মিত নানা বিষয়ে তালবিয়াকে পরামর্শ দিয়েছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

৭ মার্চ দিনটি শুরু হয়েছিল ৮টা ৪৫ মিনিটে। ডেনিশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিতি পর্ব শেষে তিনি গেলেন সুইডেনের রাষ্ট্রদূত জোহান ফ্রিসেলের সঙ্গে দেখা করতে। ভদ্রলোক তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, তুমি যেসব কথা বলেছ, সেগুলো চোখে পড়ার মতো। এরপর তাঁরা দুজনে আলাপে মেতে উঠলেন। জোহান ফ্রিসেল চমত্কার বাংলা বলতে পারেন। তাঁর দেশের যে বাংলাদেশ সম্পর্কে খুবই ভালো ধারণা আছে, সেটিও জানা হলো তালবিয়ার। এ দেশে তাদের বেশ বড় বিনিয়োগও আছে।

এরপর নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মারলেট লুমেন্ডোর অফিসে গেলেন তালবিয়া। তিনি জানালেন, ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে উন্নতি করার জন্য চেষ্টার পাশাপাশি তোমাকে সত্য কথা বলতে হবে। নিজে যা বিশ্বাস করো, সেটিই বলবে। কে কী মনে করবে সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না, কখনো বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করবে না। সারা জীবন এই কথাগুলো কাজে লাগবে বলে মনে হলো তালবিয়ার। আমাদের দেশের সঙ্গে অনেক পার্থক্য থাকলেও এই মানুষগুলো কত আপন করে নিয়েছেন আমাদের, সেটি মনে মনে স্পষ্ট অনুভব করতে পারলেন তিনি। নরওয়ের রাষ্ট্রদূত তাঁর পোশাকেরও বেশ প্রশংসা করলেন। সেদিন সালোয়ার-কামিজ পরে গিয়েছিলেন তালবিয়া।

এরপর তাঁরা সবাই মিলে গেলেন একটি দাওয়াতে। এই অনুষ্ঠানে বিদায় দেওয়া হয়েছিল রাশিয়া ও ভুটানের রাষ্ট্রদূতদের। তাঁদের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল। আর মালয়েশিয়ার নতুন রাষ্ট্রদূত তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। তাঁকে বরণ করাও একটি উদ্দেশ্য ছিল।

মিসরের রাষ্ট্রদূতের অফিসের সেই অনুষ্ঠানে একমাত্র বাঙালি ছিলেন তালবিয়া। বাকিরা সবাই বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত—যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, ইরান, তুরস্ক, ব্রিটেন, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি দেশের রাষ্ট্রদূতরা আলাপে ব্যস্ত হলেও সবার নজর ছিল তালবিয়ার দিকে। বারবার তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁরা। সেখানে নানা ধরনের মিসরীয় খাবার ছিল। বাকলাবা নামের এক ধরনের মিষ্টি খেয়ে বেশ মজা লেগেছে। সৌদি রাষ্ট্রদূতের এ দেশ সম্পর্কে অনেক কৌতূহল।

মাত্র ছয় মাস হয় তিনি এসেছেন। কোথায় কোথায় ঘোরা যায় জানতে চাইলে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিনস, চট্টগ্রামের কথা বললেন তালবিয়া। আরো বললেন, ‘আমাদের দেশটি খুব সুন্দর। ঘুরে দেখতে খুব ভালো লাগবে। মানুষগুলোও খুব আন্তরিক। ’

আধাঘণ্টার বেশি কাটিয়ে সবাইকে বিদায় জানিয়ে গেলেন অন্য এক আয়োজনে। রানা প্লাজায় আহতদের সাহায্যের জন্য ডেনমার্ক দূতাবাসের উদ্যোগে গুলশানের নর্ডিক ক্লাবে মিনা নামের একটি এনজিও একটি শিল্প কর্মশালার আয়োজন করেছে। স্টিল আর মাটি দিয়ে ৩০-৩৫ জন নারী, যাঁরা নিজেরাও এই দুর্ঘটনার শিকার, বানিয়ে ফেললেন নারী, শিশু, মানুষের চমত্কার সব শিল্পকর্ম। পুরো আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন রাষ্ট্রদূতের মা ক্রিস্টেন ফুগল। পরে এসব শিল্পকর্ম বিক্রি করে আহতদের সাহায্য হিসেবে দেওয়া হবে।

সেসব নারীও তালবিয়ার খোঁজ নিলেন। তিনি জানালেন, হাজার সমস্যার ভিড়ে, আহত হওয়ার পরও এসব নারীর সংগ্রাম থেমে নেই। তাঁরা এখনো বিভিন্ন গার্মেন্টে কাজ করে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত।

তালবিয়া সারা দিন বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে থেকে তাঁদের মুখে বারবার বাংলাদেশের মেয়েদের এই সংগ্রামী দিকটির কথাই শুনেছেন। সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া শেষে ডেনিশ দূতাবাসের কর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন তালবিয়া। রাষ্ট্রদূত তাঁকে বিদায় জানালেন। এই একটি দিনই পুরোপুরি বদলে দিল তালবিয়াকে। এখন তিনি চান, দেশের উন্নয়নে কাজ করতে।


মন্তব্য