kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শাবাশ মাবিয়া

এসএ গেমসে সোনা জয়ের পর বিজয় মঞ্চে জাতীয় সংগীত বাজার সময় নিজে কেঁদেছেন, কাঁদিয়েছেন সারা দেশকে। টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল লেখাপড়া, ফের শুরু করেছেন নতুন করে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি দেবেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন আরাফাত শাহরিয়ার

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শাবাশ মাবিয়া

বয়স সবে ১৬। এ মেয়েটিই ভারতের গুয়াহাটিতে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের এবারের আসর থেকে এনে দিয়েছেন প্রথম সোনা।

ভারোত্তোলনে সোনা জয়ের পর বিজয় মঞ্চে জাতীয় সংগীত বাজার সময় মাবিয়া আক্তার সীমান্ত আবেগে কাঁদলেন। তিনি বলেন, ‘বিজয় মঞ্চে উঠে খুব গর্ব হচ্ছিল। আমার জন্য গেমসে প্রথম জাতীয় সংগীত বেজেছে, ভাবতেই কান্না আসছিল। যখন জাতীয় পতাকার দিকে চাইলাম তখন কান্না আটকে রাখতে পারছিলাম না। ’

অথচ তাঁর খেলা নিয়েই ছিল সংশয়! অনুশীলনে ব্যথা পেয়েছিলেন। ডাক্তার বলেছিলেন, এ ব্যথা নিয়ে খেলা ঠিক হবে না। ‘আগের রাতে হাতের ব্যথাটা অনেক বেশি ছিল। হাত ভাঁজ করতে পারছিলাম না। কনুইয়েও ব্যথা ছিল। গরম সেঁক দিয়ে ঘুমাতে যাই। খেলতে পারব না ভেবে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। সকালে উঠে দেখি, ব্যথা অনেক কমে গেছে। এর পরই খেলার সিদ্ধান্ত নিই। ’ বললেন মাবিয়া।

বাবা হারুনুর রশীদের খিলগাঁওয়ে একটি মুদির দোকান আছে। মা আক্তার বানু গৃহিণী। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মাবিয়া সবার ছোট। সংসারে নিত্য অভাব-অনটন লেগেই থাকত। সংগ্রাম করেই মাবিয়ার এগিয়ে চলা।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। এরপর বক্সার মামা কাজী শাহাদাৎ হোসেন নিয়ে আসেন খেলার জগতে। পাড়ার মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খেলতে যাওয়ার পেছনে আছে মামার অনুপ্রেরণা ও সাহস। তিনিই মাবিয়াকে প্রথম নিয়ে যান জিমনেসিয়ামে। সেখানে শরীরচর্চা ও ভারোত্তোলনের প্রতি আগ্রহ জন্মে। প্রথম কোচ শাহরিয়া সুলতানা। এরপর অনেকের কাছেই শিক্ষা নিতে থাকেন মাবিয়া। খুলে যায় ভাগ্যের দ্বার। ভার তুলেই চাকরি পেয়েছেন বাংলাদেশ আনসারে।

স্কুলে পড়ার সময় পড়ালেখায় তেমন ভালো ছিলেন না। ক্লাসে মন বসত না, মন পড়ে থাকত খেলার মাঠে। সময় কাটত ছোটাছুটি করে। পড়ালেখার মূল্য উপলব্ধি করেন ছাড়ার পর। খুব ভালো ছাত্রী না হলেও পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়াটা মানতে পারেননি মাবিয়া। তাই ভারোত্তোলন অনুশীলনের পাশাপাশি বাসায় নিয়মিত চালিয়ে গেছেন পড়ালেখা। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিরতি। পরে ভর্তি হন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। খেলার পাশাপাশি তাই মাঝেমধ্যে চোখ বুলান বইয়ের পাতায়।

পড়ালেখা আর অনুশীলনের ফাঁকে খুব একটা অবসর মেলে না। তবে যতটুকু পান গান  শোনেন, টিভি দেখেন, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যান। ভাত, ছোট মাছ খেতেই সচরাচর পছন্দ। তবে সবচেয়ে বেশি পছন্দ মায়ের হাতের রান্না করা খিচুড়ি।

একই সঙ্গে পড়ালেখা, অনুশীলন কিভাবে চালিয়ে যান? মাবিয়ার উত্তর, ‘ফেডারেশন আমাকে অনেক সাহায্য করে। পরিবারের সবাই উৎসাহ দেয়। শিক্ষক ও সহপাঠীরা নানাভাবে সহযোগিতা করেন। ফেডারেশনের সেক্রেটারি মহিউদ্দিন স্যার, কোচ শাহরিয়া সুলতানা, শহীদ স্যার, বিদ্যুৎ ভাইয়ের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই এত দূর আসতে পারতাম না। ’

এসএ গেমসে সোনা জেতার আগে জিতেছেন আরো অনেক পদক। ২০১২ সালে নেপালে দক্ষিণ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জিতেছেন ব্রোঞ্জ। মালয়েশিয়ায় ২০১৩ সালে কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে জেতেন রুপা ও ব্রোঞ্জ। উজবেকিস্তানে আফ্রো-এশিয়া কাপে রুপা জেতেন ২০১৪ সালে। ওই বছর থাইল্যান্ডে কিংস কাপে জেতেন ব্রোঞ্জ। ২০১৫ সালে পুনেতে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে পান একটি সোনা ও দুটি রুপা। ২০১৫ সালে কাতারে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পান ব্রোঞ্জ পদক।

সোনা জয়ের পর শিক্ষক-সহপাঠীরা অভিবাদন জানিয়েছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে, সংবর্ধনারও আয়োজন করেছে তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সময় দিতে পারেননি মাবিয়া। অলিম্পিকের সিলেকশন হওয়ার কথা এপ্রিলে। এর জন্যই চলছে জোর অনুশীলন। এর ফাঁকে নিতে হচ্ছে পরীক্ষার প্রস্তুতিও, সামনে যে এসএসসি পরীক্ষা!

ভারোত্তোলন নিয়েই যত স্বপ্ন মাবিয়ার। এর বাইরে আর কোনো ক্রীড়ায়ই তাঁর মন নেই। কোনো কিছুতে আগ্রহ ছিল না কখনোই। লক্ষ্য অনেক বড়। মাবিয়া এখন স্বপ্ন দেখছেন অলিম্পিক জয়ের।


মন্তব্য