kalerkantho


সাইবার হয়রানি ঠেকানোর আছে যে উপায়

টেলিনরের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪৯ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী সাইবার হয়রানির শিকার। ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার আছে উপায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন নাদিম মজিদ

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সাইবার হয়রানি ঠেকানোর আছে যে উপায়

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী সেঁজুতি। ফেসবুক ব্যবহার করছে চার বছর ধরে।

কিছুদিন আগে অপরিচিত এক ছেলের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে। মাঝেমধ্যে ইনবক্সে ছেলেটি তাকে ফেসবুকে হাই-হ্যালো বলে। একদিন ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, আমাকে তুমি পছন্দ করো? উত্তর না বলায় আবার জিজ্ঞেস করল, কেন করো না? একপর্যায়ে ইনবক্সে অশ্লীল প্রস্তাব দিয়ে বসে সে। ফেসবুকে ছেলেটিকে ব্লক করে আপাত রেহাই পায় সেঁজুতি।

একই স্কুলের সুকন্যার ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘটনা ঘটত প্রথম প্রথম। পরে সচেতন হয়ে যায়। অপরিচিত ব্যক্তির ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে না। নতুন রিকোয়েস্ট এলে মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ডকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। ইতিবাচক উত্তর এলেই অ্যাকসেপ্ট করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় প্রায় সব নারীকে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থীরাও এমন ঘটনা থেকে রেহাই পায় না। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি, কমেন্ট কিংবা ইনবক্সে অশ্লীল কথাবার্তা বা অশোভন প্রস্তাবে বিব্রত হতে হয়।

ইন্টারনেট এখন সহজলভ্য। স্মার্টফোনও হাতে হাতে। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে অনেকে ফেসবুক ব্যবহার করে। নতুন বন্ধু বানাতে গেলে বা পুরনো বন্ধুদেরও অনেকে সুযোগ পেলে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো আইডি ব্লক করলে ফেইক আইডি খুলে তা থেকেও বিরক্ত করার ঘটনা ঘটছে।

 

সমাধান আছে

ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন হলে হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। সুফিয়া হকের মেয়ে পড়ে উত্তরার সাউথব্রিজ স্কুলে নবম শ্রেণিতে। তিনি বলেন, ‘মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মতো। ফেসবুকে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে আমাকে বলে। আমার কাছ থেকে পরামর্শ নেয়। দেখা যায়, আমার ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড সে জানে, তার আইডির পাসওয়ার্ডও আমি জানি। ফেসবুক ব্যবহারের শুরুতেই তাকে বলেছি, অপরিচিত ব্যক্তিকে ফ্রেন্ড বানাবে না। বানানোর দরকার হলে সে আইডির সঙ্গে তোমার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড যারা আছে তাদের জিজ্ঞেস করবে। ওরা হ্যাঁ বললে বানাবে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। পরিচিতদের মধ্য থেকেও কেউ উল্টাপাল্টা কথা বললেও তা আমাকে জানায়। ’

রহিমা আক্তার মৌয়ের মেয়ে পড়ে তেজগাঁওয়ের বটমলী হোম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের উচিত প্রতিটি বিষয়ে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা। বিশেষ করে মেয়েদের সঙ্গে। সন্তানের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে দূরত্ব কমে। ওদের জানাতে হবে কোন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত। কিছু ক্ষেত্রে নিজেই প্রতিবাদ জানাবে, কিছু ক্ষেত্রে বড়দের সাহায্য নেবে। ’ তিনি মনে করেন, সব কথার জবার দেওয়া উচিত নয়। বখাটে ছেলেরা যখন দেখে তাদের খারাপ কথার জবাব দিয়েছে তখন তারা আরো বলার সুযোগ পায়। কেউ অশোভন কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে তাকে আনফ্রেন্ড করে দেওয়া প্রয়োজন।

অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের হেড অব একাডেমিক এক্সিলেন্স জাহাঙ্গীর মাসুদ বলেন, ‘বন্ধু নির্বাচনে সচেতন হলে এ ধরনের সাইবার হয়রানি কমে যায়। অপরিচিত ব্যক্তির ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট না করাই ভালো। কোনো ব্যক্তির উপযুক্ত রেফারেন্স, বিশ্বস্ততা এবং ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। সহপাঠী বা স্কুলের কেউ কুপ্রস্তাব দিলে শিক্ষকের কাছেও অভিযোগ জানানো যেতে পারে। ’

শিশুরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে করণীয় সম্পর্কে জানান উইমেন চ্যাপ্টারের ম্যানেজিং কো-অর্ডিনেটর মারজিয়া প্রভা। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আইডি ব্লক করে দিলেই সমাধান মেলে না। এক আইডি ব্লক করলে অন্য আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। তাই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। কোনো ব্যক্তির আচরণ অসহনীয় পর্যায়ে গেলে স্ক্রিনশট নিয়ে থানায় জিডি করা যেতে পারে। সাইবার বুলিংয়ের অপরাধ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ’

ডিবি পুলিশের সাইবার ক্রাইম টিমের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে অশোভন কথা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রয়োজনে থানায় জিডি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিই। ’

টেলিনরের পরামর্শ, সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। কোনো সমস্যায় পড়লে যেন মা-বাবার সঙ্গে শেয়ার করে। কোনো ঘটনা ঘটলে যেন মা-বাবা সঙ্গে সঙ্গে সন্তানকে দায়ী না করেন। প্রথমে সমস্যা বুঝবেন, তারপর ব্যবস্থা নেবেন। সন্তান কতক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে, কোথায় আছে, খারাপ শব্দ ব্যবহার করছে কি না, কী ধরনের ছবি মেইল বা শেয়ার করছে, কন্টাক্ট লিস্টে কাদের যোগ করছে, তা জানার জন্য কিছু অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। life360, TimeAway, MamaBear, mSpy অ্যাপ উল্লেখযোগ্য। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জন্য গুগল প্লে স্টোর ও আইফোনের জন্য অ্যাপ স্টোরে পাওয়া যাবে এসব অ্যাপ।


মন্তব্য