রাখসান্দার প্রযুক্তির পৃথিবী-333695 | ক্যাম্পাস | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


মেয়েরা যাতে প্রযুক্তিবান্ধব হয়, তারাও যেন ডেভেলপার হতে পারে, নিজের দক্ষতা এই খাতে ছড়াতে পারে, সে জন্য কাজ করেন রাখসান্দা রুখাম। তিনি পড়েন হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর এই ভুবন নিয়ে লিখেছেন আরমান কামাল

রাখসান্দার প্রযুক্তির পৃথিবী

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাখসান্দার প্রযুক্তির পৃথিবী

তখন সিলেট ক্যাডেট কলেজ প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন রাখসান্দা রুখাম। অবাক হয়ে খেয়াল করতেন, টাকার অভাবে অনেক মেয়ে লেখাপড়া করতে পারে না, পরিবার থেকেও কাউকে কাউকে লেখাপড়া করতে দেওয়া হয় না। একটা মণিপুরি মেয়ের কথা কোনো দিনও ভুলতে পারবেন না। চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি মেয়ে, লেখাপড়ায়ও তুখোড়। সবাই যখন ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দিল, ও আর নেই। ধরে বিয়ে দিয়ে দিলেন মা-বাবা। আর জীবনে প্রথম মেয়ে হিসেবে জন্মানোর জন্য কথা শুনলেন নাইনে ওঠার পর। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক সাঈদ আহমেদকে তিন সহকর্মী শোনালেন, মেয়েকে আবার সায়েন্সে দিয়েছেন কেন? ওকে আর্টসে পড়ালেই পারতেন। তিনি উত্তরে বললেন, সারা দিন ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, ওর সায়েন্সে আগ্রহ আছে। মেয়েরা যে পারে, রাখসান্দা এসএসসির রেজাল্টের মাধ্যমে সেটির প্রমাণ দিলেন। গোল্ডেন ফাইভ তো পেলেনই, বোর্ড থেকে তাঁকে ট্যালেন্টপুলে মেধাবৃত্তি দেওয়া হলো।

তবে ছোটবেলায় রাখসান্দা কেবল লেখাপড়া নিয়ে পড়ে থাকেননি। অভিনয় করেছেন স্কুলে, গানও গেয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির ওস্তাদের কাছে টানা সাত বছর গান শিখেছেন। অবশ্য টনসিলের সমস্যার জন্য নিয়মিত চর্চা করা হয়নি। এরপর থেকে লেখাপড়ায় মনোযোগ দিয়েছেন।

এইচএসসি পাস করে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ালেখা করেছেন। প্রথম দিকে ক্লাসে গিয়েই আবার মেয়ে হিসেবে খোটা শুনেছেন। অন্য ছেলেদের মুখে শুনতে হয়েছে—‘মেয়েদের সঙ্গে কোনো প্রজেক্টে কাজ করব না, ওরা কিছু পারে না।’ কথাগুলো খুব লাগল। কোনো দিনও তো বাসায় বা মা-বাবার কাছে এমন কিছু শুনিনি—এই মনে হওয়ায় জেদ চেপে গেল।

প্রথম প্রজেক্টটি ছিল ই-কমার্স নিয়ে। সেই প্রজেক্টের বহিরাগত পরীক্ষক বুয়েটের এক শিক্ষক দুই মেয়ের তৈরি প্রজেক্ট খুব পছন্দ করলেন। তবে এর পরও ছেলেদের সহযোগিতা তেমন পেলেন না। তারা বলতে লাগল, তোরা তো মেয়ে। যা, বড় ভাইদের কাছ থেকে প্রজেক্ট করিয়ে নিয়ে আয়। সিনিয়র আপুরাও ভালোভাবে জানতেন না বলে সাহায্য করতে পারতেন না। ফলে নিজে নিজে গুগলে সার্চ দিয়ে কাজ করতেন। এই করতে করতে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ক্যান্সার বিষয়ে একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ বানিয়ে ফেললেন। ক্যান্সারের বিভিন্ন ধাপ, রোগের উপসর্গ, কখন কোন ওষুধ খেতে হবে ইত্যাদি নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘ক্যান্সার কেয়ার’ অ্যাপটি।

এরপর ২০১৫ সালের জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর আরেকটি অ্যাপস ‘এক্সাম স্কুল ম্যানেজমেন্ট’। এই অ্যাপে লগ ইন করে যেকোনো মা-বাবা তাঁদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার ফলাফল জানতে পারবেন।

তবে ২০১৪ সালে রাখসান্দার জীবন বদলে গেল। দিনাজপুরে গুগল ডেভেলপার গ্রুপের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গিয়েছিলেন। সেই থেকে গুগলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। সে বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গুগল ম্যাপ মেকার প্রোগ্রামের আয়োজন করেছে। এই মানচিত্রের মাধ্যমে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি কোথায় আছে, সেখানে কী কী আছে যে কেউ গুগলে সার্চ করে দেখতে পারবেন। এ ছাড়া অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, সেগুলোর এজেন্ডা তৈরি করেছেন, সফটওয়্যার বানিয়েছেন। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই মেয়ের একজন হিসেবে গুগল উইমেন টেকমেকার লিডার হিসেবে মনোনীত করা হয়। অন্যজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, নাম ফারিয়া।

গুগল উইমেন টেকমেকার লিডারের কাজ হলো কানেক্ট, ক্রিয়েট অ্যান্ড সেলিব্রেট। এই স্ল্লোগানের মানে হলো প্রযুক্তির সঙ্গে মেয়েদের জড়ানো, তাদের দিয়ে নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ করানো এবং তাদের সাফল্যের কথা সবাইকে জানানো। সারা বিশ্বের সব নারী টেকমেকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার বিনিময়ও তাঁর কাজের অংশ।

টেকমেকার লিডার হওয়ার পরে গেল বছরের মার্চ মাসজুড়ে ব্র্যাক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, শাহজালাল, বেগম রোকেয়া, হাজী দানেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা মেয়েদের নিয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক সেমিনার করেছেন। তাঁদের ক্যাম্পাসের ‘টেকটক’ সেমিনারে এসেছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণ লেখক, উদ্যোক্তা ও বক্তা সাবিরুল ইসলাম। পরে ৩০০ মেয়েকে নিয়ে তাঁরা গুগলের নতুন প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার ও সেটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য কর্মশালা করেছেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁরা মেয়েদের প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনাগ্রহের কারণ ও বাধাগুলো জেনেছেন। অনেকেই বলেছেন, পরিবার থেকে বাধা দেওয়া হয় বলে তাঁরা চাইলেও আসতে পারেন না। অনেকে আবার জানেন না কিভাবে কাজ করতে হয়।

রাখসান্দার এর পরের বড় কাজ ছিল, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পাওয়ার উইমেন প্রোগ্রামের আয়োজন। সেখানে বেসিসের পরিচালক সামিরা জুবেরি হিমিকার মতো সমাজের প্রতিষ্ঠিত নারীরা তাদের যেসব বাধা পেরোতে হয়েছে, সেগুলো বলে ছাত্রীদের উৎসাহিত করেছে। তবে রাখসান্দা সব থেকে এগিয়ে রাখবেন তাঁদের ক্যাম্পাসে গুগল অ্যান্ড্রয়েড স্টাডি জ্যামকে। সেখানে অ্যান্ড্রয়েডে হাতেখড়ির মাধ্যমে ডেভেলপার তৈরি করেছেন তাঁরা। এই কর্মশালার তিনি সমন্বয়ক ছিলেন। সেখানে তিনি পাঁচটি ক্লাসও নিয়েছেন। পরে এদের নিয়ে দিনাজপুরে প্রোগ্রামিং কনটেস্টও করেছেন তাঁরা। মেয়েরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের অ্যাপস, আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও জায়গার মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এবার তাঁরা নারী দিবসকে সামনে রেখে মার্চজুড়ে বুয়েট, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, শাহজালালসহ ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নিয়ে কর্মশালা করবেন।

এখন তিনি ব্যস্ত বেগমডটকো (begum.co) নিয়ে। নানা সময় নারীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সমস্যার কথা শুনেছেন। যেমন মোহাম্মদপুরের বস্তিতে গিয়ে জেনেছেন, তারা অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করতে পারে না। ইন্টারনেট কী, বলতে পারে না। বাসায় হাতে তৈরি পণ্য তৈরি করে, সেগুলো কোথায় বিক্রি করতে হবে বলতে পারে না। তাদের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ছোট ছোট শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করে ওয়েবসাইটটিতে দেওয়া হচ্ছে। পরে তাদের জন্য একটি মার্কেট প্লেস তৈরি করবেন তাঁরা।

মন্তব্য