প্রতিবন্ধী সখা-331008 | ক্যাম্পাস | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


প্রতিবন্ধী সখা

রাজশাহীর ‘প্রয়াস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু এখন অনেকটাই সুস্থ। এসব শিশু এখন ছবি আঁকতে পারে, মঞ্চে গান গেয়ে দর্শক মাতায়। ২০০৪ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথম গড়ে ওঠে প্রতিবন্ধীদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠান। লিখেছেন জাকির হোসেন তমাল

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিবন্ধী সখা

চার বছরের শিশু নীরব। এক বছর আগেও সামনে পাওয়া সব কিছুই খেয়ে ফেলত। টুথপেস্ট কত দিন যে খেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। কারো কোনো কথার জবাব দিত না। শুধু একদিকে চেয়ে থাকত। এক বছরের মাথায় অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে নীরবের। সে এখন অন্যের কথার জবাব দিতে পারে। অখাদ্যও আর খায় না। জানালেন নীরবের মা বীথি সুলতানা।   

এমন অনেক শিশুই এখন রাজশাহীতে অবস্থিত ফাউন্ডেশন ফর উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড অ্যাসিস্ট্যান্সের ‘প্রয়াস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে অনেকটাই সুস্থ। এসব প্রতিবন্ধী শিশুর অনেকেই এখন ছবি আঁকতে পারে, গাইতে পারে গান। এমনকি তারা মঞ্চেও গান গেয়ে দর্শক মাতায়।

রাজশাহীতে ২০০৪ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথম গড়ে ওঠে প্রতিবন্ধীদের এই প্রতিষ্ঠান। বন্ধুর দুটি প্রতিবন্ধী সন্তান দেখে তিনজন শিক্ষক রেখে নগরীর রাজপাড়া থানাধীন হেলেনাবাদ এলাকায় প্রতিবন্ধী ট্রেনিং সেন্টারটি চালু করেন বাংলাদেশ ল টাইমসের গবেষণা বিভাগের প্রধান ও নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব এগদার বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট লেকচারার সাদিকুর রহমান।

প্রতিষ্ঠানটি চালুর কিছুদিনের মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরা সেখানে আসতে থাকে। এক বছরের মাথায় সরকারি অনুমোদন পায় প্রয়াস। সেখানে প্রথম থেকেই স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকেন। এরপর একে একে সেখানে সহায়তার হাত বাড়ান রাজশাহীর সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, তাঁর স্ত্রী শাহিন আক্তার রেনি, নরওয়ের নাগরিক হেন্স পিটারসহ আরো অনেকেই। এ ছাড়া নামেমাত্র খরচে একটি চারতলা বাড়ি ভাড়া দিয়ে এ কাজে সহায়তা করেন ওয়াহিদা খানম। তিনিও প্রয়াসের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানসান্দ সিটি কাউন্সিলের ফান্ড ছাড়াও সাদিকুর রহমান, হেন্স পিটার, ওয়াহিদা খানমসহ অনেকের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় চলে এ প্রতিষ্ঠান। প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবকদের কাছ থেকেও কিছু অর্থ পাওয়া যায়। তবে এ সংখ্যাটা অনেক কম।

২০১৩ সালের গেজেট অনুযায়ী প্রতিবন্ধিতার ১২টি ধরন রয়েছে। তার মধ্যে প্রয়াস পাঁচটি ধরন নিয়ে কাজ করে থাকে। সেগুলো হলো—অটিজম বা অটিজমস্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা।

সাদিকুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী শিশু ও তাদের মা-বাবাদের শিশু সক্ষমতার বিকাশ ও পুনর্বাসনে মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়া, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা সম্পর্কে কমিউনিটির ধারণা উন্নয়ন ও সচেতনতা বাড়ানোই প্রয়াসের মূল উদ্দেশ্য।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজশাহীতে হতদরিদ্র পরিবারের প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করছে প্রয়াস। এ কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়েছে পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের। শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিশুদের পড়াশোনার সামগ্রী, শারীরিক ব্যায়ামের বিভিন্ন যন্ত্রাদিসহ বিভিন্ন খরচ বহন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে।

প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা সাদিকুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত সেবা নেয় অন্তত ১৭০ জন প্রতিবন্ধী শিশু। সেন্টারে সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা—এই দুই শিফটে শিশুদের ক্লাস নেওয়া হয়। ১৭ জন শিক্ষক, সাহায্যকারীসহ স্টাফ আছেন ৩০ জন। প্রতি বৃহস্পতিবার ওই শিশুদের শেখানো হয় গান, শুক্রবার শিশুদের নিয়ে বাইরে ঘুরতে যান প্রয়াসের শিক্ষকরা। সপ্তাহে এক দিন শিশুদের মায়েদের দেওয়া হয় কাউন্সেলিং।

প্রয়াসে গিয়ে দেখা গেল, নিচতলার একটি ঘরে একজন বিশেষজ্ঞ প্রতিবন্ধী সন্তানদের মায়েদের কাউন্সেলিং করছেন। সেখানে শেখানো হচ্ছে বাড়িতে কিভাবে সন্তানদের দেখাশোনা করবেন, সন্তানদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন। প্রতিবন্ধী সন্তানরা যে সমাজের বোঝা নয়, তা-ই সেখানে গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে। তার পাশেই একটি কক্ষে অন্তত ৩০ জন শিশুকে শেখানো হচ্ছে গান। একে একে চারতলা ভবনের সবগুলো কক্ষ ঘুরে দেখা হলো। প্রতিটি কক্ষেই আলাদা চেয়ার-বেঞ্চ, খেলার সামগ্রীসহ রয়েছে অনেক কিছুই। নিচতলার একটি কক্ষে ব্যায়াম করার জন্য রয়েছে বেশ কিছু সামগ্রী।

সাদিক বলছিলেন, ‘উন্নত দেশে এমনও দেখা গেছে, একটি অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য একজন করে শিক্ষক দেওয়া হয়। প্রয়াসে প্রায় ১৭০ জন শিশু থাকলেও তাদের জন্য শিক্ষক ও সাহায্যকারী রয়েছেন মাত্র ১৭ জন। এ ছাড়া শিশুদের খোলামেলা জায়গার অভাবে সঠিকভাবে পরিচর্যা করা যাচ্ছে না। নানা সমস্যা নিয়েই চলছে প্রয়াস। বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’

মন্তব্য