কলসিন্দুরের সোনার মেয়েরা-331007 | ক্যাম্পাস | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


কলসিন্দুরের সোনার মেয়েরা

বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের হ্যাটট্রিক শিরোপা জিতেছে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কলসিন্দুরের পাঁচ ফুটবলারকে নিয়ে মহিলা জাতীয় দল এবার অংশ নিয়েছে এসএ গেমসে। ধোবাউড়া ঘুরে এসে লিখেছেন নিয়ামুল কবীর সজল, ছবি তুলেছেন জাহাঙ্গীর কবীর জুয়েল

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কলসিন্দুরের সোনার মেয়েরা

বিকেলের পড়ন্ত বেলায় স্কুলের মাঠে মেয়েরা দল বেঁধে ফুটবল খেলছে। মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে কোচের নির্দেশমতো। এ দৃশ্যটি অজপাড়াগাঁয়ের এক বিদ্যালয়ের। নাম কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছোট্ট শিশুদের নজরকাড়া ফুটবল-নৈপুণ্য আর দেশসেরা হওয়ার কারণে ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরের এ বিদ্যালয়ের নাম দেশের ক্রীড়ামোদীদের মুখে মুখে। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে পরপর তিনবার দেশসেরা হয়েছে বিদ্যালয়টি।

এবারের টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল ৬৩ হাজার ৪৩১টি স্কুলের ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৭ জন খুদে খেলোয়াড়। চ্যাম্পিয়ন হয়ে দলটি জিতেছে এক লাখ টাকা।

অজপাড়াগাঁয়ের এক বিদ্যাপীঠ

এলাকায় শিক্ষাবিস্তারে কলসিন্দুর প্রাথমিক স্কুলের প্রতিষ্ঠা সেই ১৯৩৯ সালে। ১৯৭৩ সালে স্কুলটি সরকারি হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ৫০০-র মতো। এর মধ্যে মেয়ের সংখ্যাই বেশি। দেশের অন্য প্রাথমিক স্কুলের মতোই কলসিন্দুর প্রাথমিক স্কুলে খেলাধুলার চর্চা হতো। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর স্কুলের মাঠে ছেলেমেয়েদের বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। স্বপ্নের জগতের সন্ধানটি মেলে ২০১১ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার পর।  শিক্ষা বিভাগ থেকে এ খেলার চিঠি পায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। চিঠি নিয়ে আলোচনায় বসলেন প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীল ও সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিন। উদ্যমী আর খেলাধুলায় উৎসাহী এ দুই যুগপৎ মানুষ মিলে করলেন পরিকল্পনা। খেলোয়াড় বাছাইয়ে প্রথমে শুরু করলেন এক সেকশনের সঙ্গে আরেক সেকশনের খেলা। এরপর এক ক্লাসের সঙ্গে আরেক ক্লাসের। এভাবে তৈরি হলো টিম। দক্ষ কারিগরের মতো শিশুদের ফুটবলের পাঠ দিলেন মফিজ উদ্দিন। যোগ্য অভিভাবকের মতো পাশে থাকলেন মিনতি রানী শীল।

 

যাত্রা হলো শুরু

২০১১ সালে নিজ ইউনিয়নের ৯টি দলের সঙ্গে খেলে চ্যাম্পিয়ন হলো কলসিন্দুর। এরপর উপজেলা ও জেলা চ্যাম্পিয়ন। সে সময়ের জেলা প্রশাসক লোকমান হোসেন মিয়া এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের আরো ভালো করার জন্য জেলা থেকে মকবুল হোসেন ও সুলতান আহম্মেদ নামে দুজন কোচ পাঠালেন। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন গামারীতলা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ। ওই বছরই আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে ঢাকা বিভাগীয় পর্যায়ে মুন্সীগঞ্জের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয় দলটি। বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে রংপুর বিভাগের দল পালিচরার সঙ্গে খেলে ২-১ গোলে হেরে যায় কলসিন্দুর। মজার ব্যাপার হলো, দুটি গোলই ছিল আত্মঘাতী।

পরাজিত হলেও হাল ছাড়েনি কলসিন্দুর। খেলা থেকে ফিরেই প্রস্তুতি নিতে থাকে পরের বছরের জন্য। স্কুলে মাঠ আছে, নেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফুটবল। এলাকার মানুষের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া গেল ১৫-২০টি ফুটবল। এবারও আগের মতো ধাপে ধাপে দলটি পৌঁছল ঢাকা বিভাগের সেরা দলে। কিন্তু সেবারও কোয়ার্টার ফাইনালে রাজশাহীর একটি দলের সঙ্গে টাইব্রেকারে হেরে বিদায়।

 

অবশেষে বিজয়ের দেখা

এবারও থেমে গেল না কলসিন্দুর। চলল প্র্যাকটিস। কোচের তালিকায় যুক্ত হলেন বোরহান উদ্দিন। এবার আর ভাগ্যবিধাতা মুখ ফেরালেন না। পরিশ্রমের ফল পেল কলসিন্দুর। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের দল মঘাছড়িকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো গলায় ঝুলল চ্যাম্পিয়নের পদক।  জয়ের আনন্দে আত্মহারা হলেও গতিহারা হলো না কলসিন্দুর। প্র্যাকটিস চলতে থাকল সেই আগের মতোই। রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন বিকেলে মেয়েরা নিয়মিত আসতে লাগল প্র্যাকটিসে। বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে এবার কোচিংয়ে জেলা থেকে যুক্ত হলেন সাবেক ফুটবলার সালাহ উদ্দিন। এরপর বছর ঘুরে এলো ২০১৪ সাল। সেই আগের মতোই অপ্রতিরোধ্য কলসিন্দুর। এবার তাদের সামনে সেই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী রংপুর বিভাগের পালিচরা দল, যার সঙ্গে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ২০১১ সালে। তবে এবার আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এলো না। পালিচরা দল ১-০ গোলে হেরে গেল কলসিন্দুরের কাছে। পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হলো কলসিন্দুর।

২০১৫ সালের টুর্নামেন্ট। সেই আগের মতোই ধাপে ধাপে ফাইনালে কলসিন্দুর। তাদের সামনে রাজশাহীর খর্দ্দকৌড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এবার জয় এলো ৩-১ গোলে। এটি ছিল হ্যাটট্রিক বিজয়। আনন্দটা তাই ছিল একটু বেশিই।

 

সব বাধা পেরিয়ে

ফুটবলারদের প্রায় সবাই অপুষ্টির শিকার। নিত্য অভাব-অনটনের সংসারে ফলমূল, দুধ-ডিমের স্বাদ কদাচিৎ পায় ওরা। তিন বেলাই চলে ভাত দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ। নেই প্রয়োজনীয় ট্রাউজার কিংবা জার্সি। উপহার হিসেবে পাওয়া ফুটবল দিয়ে এবড়োখেবড়ো মাঠে চলে নিয়মিত প্র্যাকটিস। তবুও সব বাধা জয় করে কলসিন্দুরের জয় নিশান উড়ছে পত্পৎ করে।  কলসিন্দুরের প্রায় সব মেয়েকেই খেলার আগে বাড়ির নিষেধ শুনতে হয়েছে। কলসিন্দুর দলে দুই বছর ধরে খেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রনি। এখন মাঠে নিয়মিত হলেও শুরুতে বাবা মরম আলী তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। রনি জানায়, ‘বাবা নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু এখন আর না করেন না।’

দলের আরেক সদস্য ফাতেমা জানায়, ‘বাড়ির সবাই শুরুতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু গত বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আর কেউ তাকে বাধা দেয় না। বাবা বলেন, ‘দেখিস, আমরার ধোবাউড়ার ইজ্জত যেন থাহে। সব খেলাতেই জিতন চাই।’

 

খেলোয়াড় গড়ার কারখানা

কলসিন্দুর প্রাইমারি স্কুল এখন হয়ে উঠেছে নারী খেলোয়াড় গড়ার কারখানা। এবারের এসএ গেমসে বাংলাদেশ নারী দলে পাঁচজন খেলোয়াড় ছিল এ কলসিন্দুর প্রাথমিক স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। যারা এখন কলসিন্দুর হাই স্কুলে পড়ে। অনূর্ধ্ব এএফসি-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ দলে ছিল ১০ জন। ২০১৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ছিল তিনজন। একটি অজপাড়াগাঁর স্কুল হয়েও এমন সাফল্যের কারণ কী? উত্তরে সবাই বলেছেন, শিক্ষক মফিজ উদ্দিন ও প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীলের আন্তরিকতা আর সদিচ্ছার কথা। মেয়েদের তাঁরা বুঝিয়েছেন। মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। শুরুর দিকের বিরূপ পরিবেশ তাঁরা জয় করেছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই তাঁরা আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন।

 

তবুও সংকট

সাফল্যের পাশাপাশি এখনো নানা সমস্যা ও সংকট নিয়ে পথ চলছে কলসিন্দুরের ফুটবল। খেলার মাঠ এবড়োখেবড়ো। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পায়নি স্কুলটি। পায়নি সরকারি কোনো দপ্তর থেকে খেলাধুলার সরঞ্জাম। এলাকার বাইরে খেলতে গেলে টাকার সংকটও ভাবনায় ফেলে শিক্ষকদের। খেলার পর মেয়েদের ভালো নাশতা দিতে পারে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে সদিচ্ছা থাকলে সব বাধাই জয় সম্ভব, এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এ স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীরা।

 

তাঁরা বললেন

স্কুলের সহকারী শিক্ষক মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি। শুরুর দিকে কিছু সমস্যা ছিল। অনেক মেয়ে আসতে চাইত না। অভিভাবকরাও দিতে চাইতেন না। এখন আর সে অবস্থা নেই।’ প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীল জানান, ‘মেয়েরা খেলার পাশাপাশি লেখাপড়ায়ও বেশ ভালো। স্কুলে উপস্থিতি নিয়মিত। দুঃখকষ্টের মধ্যেও মেয়েরা এগিয়ে চলেছে, এটাই বড় আনন্দের।’

জেলার সাবেক কৃতী খেলোয়াড় ও দলের কোচ বোরহান উদ্দিন ও সালাহ উদ্দিন ময়মনসিংহ থেকে ধোবাউড়ায় গিয়ে দুই-তিন দিন অবস্থান করেন। বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘এই মেয়েরা খেলায় এত আগ্রহী তা না দেখলে বোঝা যায় না। তারা কোনো দিন প্র্যাকটিস মিস করে না।’

 

সর্বোচ্চ গোলদাতা রোজিনা

 

গতবারের দলেও ছিল রোজিনা। হয়েছিল সেরা খেলোয়াড়। এবার হয়েছে সর্বোচ্চ গোলদাতা। জাতীয় পর্যায়ের মোট তিনটি খেলায় রোজিনা গোল করেছে ৯টি। ফাইনালে করেছে দুটি। ব্যক্তিগত সাফল্যের কারণে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার পেয়েছে। বাবা পিক-আপ চালক হাবিবুর রহমান আর মা পারভীন খাতুন। খেলার আগে কখনো এলাকার বাইরে যায়নি রোজিনা। এখন খেলার সূত্র ধরে জেলা ও রাজধানী শহরে তার যাতায়াত। রোজিনার পজিশন স্ট্রাইকার। জাতীয় দলের হয়ে খেলে সে দেশের সম্মান বাড়াতে চায়।

 

সেরা খেলোয়াড় শামসুন্নাহার

 

গত বছর ছিল সেরা গোলদাতা। এবার হয়েছে সেরা খেলোয়াড়। ব্যক্তিগত সাফল্যের কারণে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার পেয়েছে শামসুন্নাহার। তিন বছর ধরে খেলাধুলায় যুক্ত। শামসুন্নাহারের বাবা নেকবর আলী কৃষক। মা আবেদা খাতুন। অভাব-অনটনের সংসারে ঠিকমতো খাওয়াও জোটে না।

মিডফিল্ডার হিসেবে খেলে শামসুন্নাহার। অনেক বড় খেলোয়াড় হতে চায় সে। খেলতে চায় দেশের হয়ে। শামসুন্নাহারের বড় গুণ হলো, সে মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে পারে। যেকোনো খেলায়ই তাই নজর কাড়ে দর্শকদের।

মন্তব্য