নাবিদের একুশের গান-331001 | ক্যাম্পাস | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


নাবিদের একুশের গান

নাবিদের একুশের গান নিয়ে এখন খুব হইচই। ১১টি ভাষায় গাওয়া হয়েছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। কাজটির নেপথ্য নায়ক নাবিদ সালেহীন কিভাবে কাজটি করেছেন মুতাসিম বিল্লাহ নাসিরকে জানালেন

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নাবিদের একুশের গান

ভাবনাটি এসেছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে তো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়েছে, এই গানটি অনেক ভাষায় গাওয়ালে কেমন হয়? নাবিদ সালেহীন আগেও কয়েকটি দেশের শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছিলেন ‘মিত্র’ নামের একটি অ্যালবাম। সেখানে ১৩টি ব্যান্ডদলের গান ছিল, কয়েকটি বিদেশি ব্যান্ডও গেয়েছে। পরে মালয়েশিয়া ও নেপালের শিল্পীরা বলেছেন, নাবিদ, এমন কোনো কাজ যদি ভবিষ্যতে করো, অবশ্যই জানাবে। ফলে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি নিয়ে কাজ করার সাহস পেলেন। ভেবেছিলেন, এই গানটি এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি দেবেন। শুরুতে তিনটি দেশের শিল্পীদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করলেন। ভারতের আমির সাঈদ ও আতিফ সাঈদ একবাক্যে রাজি। নেপালের শিব মুখিয়াও হাসিমুখে সম্মতি দিলেন। তবে গোল বাধালেন পাকিস্তানের শিল্পীরা। তিন শিল্পীর কেউই রাজি না। হতাশ না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এরিকসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, তিনিও রাজি। সম্মতি দিলেন মালয়েশিয়ার নিকও। কাজ শুরু হলো।

নভেম্বরের মধ্যে পাঁচটি ভাষায় একুশের গানটি গাওয়া হয়ে গেল। বিভিন্ন ভাষার শিল্পীদের ইংরেজিতে গানটি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নাবিদ। শিল্পীরা নিজের নিজের ভাষায় সেটি অনুবাদ করে গেয়েছেন। তার পরই নাবিদের মাথায় এলো, এখনো তো তিন মাস বাকি আছে। বসে না থেকে আরো কয়েকটি ভাষায় গানটি করালে কেমন হয়? আবার লিস্ট করতে বসলেন। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় ওয়েবসাইটগুলো ঘাঁটলেন। সেখান থেকে শিল্পীদের নাম ও ই-মেইল ঠিকানা পেয়ে গেলেন। যাঁদের গান তাঁর মন খুশিতে ভরিয়ে দিল, তাঁদের মেইল করলেন। কিভাবে শিল্পীদের নির্বাচন করেছেন—এই প্রশ্নের জবাবে নাবিদ বলেন, ‘আমি নিজেও ছোটবেলা থেকে গান করি। সেভাবে তাঁদের বিচার করেছি এবং ফেসবুক-ইউটিউব থেকে তাঁদের গান শুনেছি। তাঁদের পোস্টগুলো দেখে জেনেছি, তাঁরা দেশের ভেতরে ও বাইরে জনপ্রিয়। আর আমার এই গানের শিল্পীদের সাতজনই পেশাদার।’

শেষ পর্যন্ত ১১ জন শিল্পী তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। তাঁদের তিনি আমাদের একুশের ইতিহাস জানালেন। বললেন, ভাষার দাবিতে কিভাবে এ দেশের মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। শহীদের রক্তে কিভাবে লাল হয়ে গিয়েছিল আমাদের বর্ণমালা। এসব শোনার পর শিল্পীদের আগ্রহ আরো বেড়ে গেল।

নাবিদ এখন স্বীকার করেছেন, ‘এই যে গানটি তাঁরা আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে গেয়েছেন, তার পেছনে আমাদের ইতিহাস জানা বেশ কাজে লেগেছে।’ এরপর ১১টি ভাষা থেকে বাছাই করে সাতজন শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানালেন। ইতালির ডেভিড, ফ্রান্সের দানিয়েল, চীনের স্টিফেন, স্পেনের আন্দ্রে, জার্মানির নোরা, লেবাননের ইয়রগো, রাশিয়ার আলেকজান্দার গানটি গেয়ে তাঁকে মেইলে পাঠিয়ে দিলেন। কাজটি করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতাও হলো। যেমন—স্পেনের দানিয়েল যে চমত্কার ইংরেজি বলতে পারেন, সেটি নাবিদ জানতেনই না। আবার ব্রাজিলের এক শিল্পী বলেছিলেন, ‘তোমার বয়স মাত্র ২২, তোমার সঙ্গে কী কাজ করব? আরো বড় হও, তখন যোগাযোগ করো।’

নাবিদ একা নন, তাঁর সঙ্গে পুরো একটি টিম কাজ করেছে। গিটার ও হারমোনিকা বাজিয়েছেন মহান ফাহিম, পিয়ানোতে ফরহাদ, বেইজে ছিলেন তিনি নিজেই, চেলো বাজিয়েছেন শিরোনামহীনের জিয়া, তবলায় অন্তর, ভায়োলিনে জার্মানির নোরা। সমন্বয়ের দায়িত্ব নাবিদ নিজের ঘাড়েই তুলে নিয়েছিলেন।

জিয়া কিভাবে যুক্ত হলেন—এ প্রশ্নের জবাবে নাবিদ বলেন, ‘চেলো আমার খুব পছন্দের বাদ্যযন্ত্র বলে জিয়া ভাইকে বাজানোর অনুরোধ করেছিলাম। তিনি গানটি শোনার পর খুশি হয়েই সময় বের করে স্টুডিওতে এসে বাজিয়ে গেলেন।’

আমাদের ভাষায় গানটি গেয়েছেন জয় শাহরিয়ার, পারভেজ, মিলি রুমনি ও রিয়াদ।আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এআইইউবি) সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র নাবিদ। তিনি পড়েন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ছেলেবেলা থেকেই গানের প্রতি ভালোবাসা। উদয়ন স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস এইটে পড়ার সময় ব্যান্ডদল গড়েছেন। ভেনোমাস নামে তাঁদের এই ব্যান্ডদলে তিনি মিউজিক কম্পোজার ও প্রডিউসার। পাশাপাশি বেইজ গিটারিস্ট হিসেবেও আছেন। তাঁর এই দারুণ কাজটি আজব রেকর্ডস অনলাইনে ছেড়েছে। অ্যালবাম করার কোনো ইচ্ছাই নাবিদের নেই। কারণ একুশ নিয়ে তো ব্যবসা চলে না।

এবার বলি বিদেশি শিল্পীদের অনুভূতি। নোরা ফেসবুকের টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের টিভিতে আমাকে দেখানো হয়েছে বলে গর্বিত।’ ২১ ফেব্রুয়ারি শিব মুখিয়া নাবিদকে মেসেজ করেছেন, ‘আজ আমার জন্য খুব আনন্দের একটি দিন।’

মন্তব্য